খোকন বিকাশ ত্রিপুরা জ্যাক
প্রকাশ : ২৫ নভেম্বর ২০২৪ ১২:৩৮ পিএম
রাঙামাটি পার্বত্য জেলার লংগদুতে অবস্থিত কাট্টলী বিল
কাট্টলী বিল কাপ্তাই লেকের সর্ববৃহৎ বিল। ভরা মৌসুমে যখন পানি কানায় কানায় পরিপূর্ণ থাকে, তখন তার অপরূপ সৌন্দর্য নৌকাযোগে ঘুরে ঘুরে অবলোকন করা যায়। বিলের দুই পাড়ে বড় বড় পাহাড়। কাপ্তাই হ্রদের আকর্ষণীয় সর্ববৃহৎ বিল ও স্থান কাট্টলী বিলের সৌন্দৰ্য নিয়ে বিশ্লেষণ করা অনেক কঠিন।
এটি মূলত রাঙামাটি জেলার লংগদু উপজেলার একটি হ্রদের নাম। কাট্টলী বিল ঘুরে এসে তার (কাট্টলি বিল) সম্পর্কে ছোট্ট আকারে সৌন্দর্যের কথা বলব। কাট্টলী বিলের গল্প মায়ায় ঘেরা এক হ্রদের বুকে আরেক বিলের সৌন্দর্য সমাচার, যার নাম ‘কাট্টলী বিল’। মায়ায় ভরা আর সৌন্দর্যের নীলা হ্রদ কাট্টলী বিলটি রাঙামাটি পার্বত্য জেলায় হলেও সেখানে প্রায় কাছাকাছি যাওয়ার মতো সহজ মূলত খাগড়াছড়ি সড়ক হয়ে। শুক্রবার সকাল সাড়ে ৭টায় আমিসহ ২৬ জনের একটি টিম খাগড়াছড়ির শহরস্থ শাপলা চত্বর থেকে দুটি পিকআপ গাড়িযোগে রওনা দিই।
খাগড়াছড়ি সদর থেকে প্রধান সড়ক হয়ে দীঘিনালায় একটি রেস্টুরেন্টে আমরা সকালের নাশতা সেরে নিই। নাশতা শেষে আমরা রওনা দিই লংগদু উপজেলার কাট্টলী বিলের উদ্দেশে। তবে সড়কপথে গাড়িযোগে লংগদু বাজার পর্যন্ত যাওয়ার সুযোগ হয়। লংগদু বাজারে নেমে সেখানকার নৌকা/বোটঘাট থেকে আমাদের টিম হ্রদের পথে বোটযোগে বিলের উদ্দেশে রওনা হই। তখন ঘড়ির কাটায় প্রায় সাড়ে ১১টা ছুঁই ছুঁই। দীর্ঘ প্রায় দেড় ঘণ্টা পর দুপুর প্রায় দেড়টায় আমরা কাট্টলী বিল মিনি বাজারে পৌঁছে যাই।
কী এক অদ্ভুত সৌন্দর্যের নীলাভূমি আমাদের এই দেশ, এই প্রকৃতি আর কাট্টলী বিলের দৃশ্য। যতই চোখ যায়, যত দূর চোখ যায় ততই বিমোহিত হই। আমরা কয়েকজন বাজারের এক পাশে হ্রদের পাড়ে এসে দেখি হ্রদ থেকে জালে ধরা সম্পূর্ণ অর্গানিক ও বিষমুক্ত শুঁটকি উৎপাদনের খামার। কাপ্তাই হ্রদের বিভিন্ন এলাকা হতে মাছ নিয়ে অসংখ্য টলার কাট্টলী বিলের বাজার ঘাটে ভিড়ছে।
এসব ট্রলারে আসা বিভিন্ন রকমের কাঁচা মাছ রোদে শুকিয়ে শুঁটকি করা হয়। এ ছাড়া মাইনী মুখ, কালাপাকুজ্জা, মাহিল্যা, গুলশাখালী, বগাচতর, ভাসাইন্যাদম, ফোরের মুখ, সাধু টিলাসহ লংগদু উপজেলার নদীপাড়ের মানুষের কয়েক হাজার বসতঘরের ছাদে ও উঠানে মাচা বানিয়ে মাছ শুকিয়ে বানানো হচ্ছে শুঁটকি। কাট্টলী বিল রাঙামাটি জেলার কাপ্তাই হ্রদের অধীনস্থ কাট্টলী নামক এলাকাটি বিগত কয়েক বছর ধরে ভ্রমণপিপাসুদের কাছে বেশ জনপ্রিয় একটি জায়গা হয়ে উঠেছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর বিলটি রাঙামাটি জেলা থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন।
কাচালং ও মাইনী নদীর কোলে বেড়ে ওঠা বিশাল এই বিলে রয়েছে সবুজের সমারোহ। সত্যি কথা বলতে গেলে লিখে কিংবা মুখে বলে এই বিলের সৌন্দর্য বোঝানো মুশকিল। যে এই কাট্টলী বিলে একবারও ঘুরতে না এসেছে, সে কখনই বুঝতে পারবে না কী সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে এই বিলে। তবে এই কাট্টলী বিল বর্তমানে দেশীয় পর্যটকদের পাশাপাশি বিদেশি পর্যটকসহ স্থানীয় ভ্রমণপিপাসুদের কাছেও বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। যেমন পটুয়াখালী জেলার সাগরকন্যা কুয়াকাটার সাথে এই বিলের দারুণ এক সাদৃশ্য রয়েছে। এই বিলে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দুটোই দেখতে পাবেন। যেমনটা দেখা যায় কুয়াকাটায়। তবে সাধারণ সূর্যের উত্থান কি পতন একটু দূরে মনে হবে কুয়াকাটার মতো এতটা নিকটে নয়। কাট্টলী বিল একজন ভ্রমণপিপাসুকে খুব সহজেই সৌন্দর্যের বাঁধনে বাঁধতে পারে। আর এজন্যই হয়তো কাপ্তাই হ্রদকে নদীর কলরবে মুখরিত অঞ্চল বলা হয়ে থাকে।
কাট্টলী বিলের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হচ্ছে- বিলের শেষে অনেকটা দূরে বিশাল পাহাড়ের ভাঁজে দেখা দেবে বনজ প্রজাতির সারি সারি সেগুনবাগান, মাইলের পর মাইল পাহাড়জুড়ে সবুজ বৃক্ষরাজি জায়গাটিকে পরিণত করেছে সবুজের সমারোহে। কাট্টলী বাজার নামক স্থানটি অবশ্যই বিলের মাঝে জেগে ওঠা একটি চরের মতো।
তা ছাড়া আশপাশে শীত মৌসুমে জেগে ওঠে অসংখ্য চর। শীত মৌসুমে হাজার হাজার অতিথি পাখির কলকাকলিতে মুখরিত থাকে এসব চরাঞ্চল। বিল যখন সম্পূর্ণ সৌন্দর্য ফিরে পায় অর্থাৎ পানি বৃদ্ধি পায়, তখন এর সৌন্দর্য ক্রমান্বয়ে আরও দৃশ্যমান হয়। বিলের কাট্টলী বাজারটি দূর থেকে কারও মনে হবে নদীর বুকে যেন ছোট একটি শহর। জল, জেলে, দ্বীপ, আর ছোটো বাজারটিই যেন কাট্টলী বিলের মূল অলংকার হিসেব বেশ পরিচিত! বিলের মধ্যে থাকা নানা প্রজাতির মাছ ধরার বিভিন্ন জেলের ভিন্ন ভিন্ন টেকনিক এবং সাথে রয়েছে ছোট-বড় নৌকাসহ অনেক ধরনের মাছ শিকারের ফাঁদ। সকাল হতে বিকাল পর্যন্ত শুধু পর্যটকরা না, স্থানীয়রাও সময় কাটাতে আসে এখানে। নদীর পানির স্রোত আর ঢেউয়ে মাঝে মাঝে আপনার বসে থাকা জায়গাটি ঢেউ খেলবে, তখন মনে হবে এই বুঝি আপনি হ্রদেই ভেসে যাচ্ছেন।

এখানে এসে আপনি সাক্ষাৎ পেতে পারেন অনেক জেলার জেলের সাথে! কারণ এই স্থানটি মূলত কাপ্তাই হ্রদের মৎস্য শিকারের মূল স্থান। পানি বৃদ্ধি কিংবা শীত মৌসুমের সময় স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, অতিথি পাখির উড়ে বেড়ানো, দলবদ্ধভাবে পাখিদের ছোটাছুটি, সুবিশাল নদীর বুক চিরে ছুটে চলা জেলে নৌকা, ঘুরে বেড়ানো নানান ধরনের ইঞ্জিনচালিত বোট আর কিছুটা দূরে আকাশছোঁয়া নানান প্রজাতির বাগান কঠিন হৃদয়ের মানুষেরও মন ছুঁয়ে যায়। চারদিকে নদীবেষ্টিত কাট্টলী বিলে ছোট বড় নৌকার ছপছপ দাঁড় টানার শব্দ আর মাঝেমধ্যে এই অঞ্চলের লঞ্চের আওয়াজসহ হুইসেলের শব্দ মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।
বিশেষ আকর্ষণ : এখানে আপনি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন নির্ভয়ে, দ্বীপ দেখার চাহিদাও মিটবে, মৌসুমি ফরমালিনমুক্ত ফলমূল ইত্যাদি পাবেন। এমনকি সংগ্রহ করতে পারবেন নানান প্রজাতির কাপ্তাই হ্রদের শুঁটকি মাছ। তবে যেহেতু কাট্টলী বিল কাপ্তাই হ্রদের একটি অংশ এবং মাছের মূল জোগানদাতা অঞ্চল, সেহেতু কাট্টলী বিলের মাছ নিয়ে যেতে ভুল করবেন না। ফরমালিনমুক্ত মাছ খাওয়ার এ এক সুবর্ণ সুযোগ।
খাগড়াছড়ি থেকে যাতায়াত ব্যবস্থা : খাগড়াছড়ি শাপলা চত্বর থেকে দীঘিনালা বাজার হয়ে লংগদু বাজার, লংগদু বাজার থেকে কাট্টলী বিলগামী বিভিন্ন লঞ্চ, বোট ও নৌকাযোগে যাওয়া যায়। সময় লাগে প্রায় ২ ঘণ্টা। লংগদু সদর থেকে নৌকাযোগে কাট্টলীর বিলে পৌঁছানো যায়। তবে যেহেতু এখানে থাকার ব্যবস্থা নেই, এমনকি রিসোর্টও নেই, তাই রাত্রিযাপনের ব্যবস্থা হিসেবে আপনি লংগদুকে বেছে নিতে পারেন।
রাঙামাটি থেকে যাতায়াত ব্যবস্থা : রাঙামাটি থেকে নৌপথে লংগদু যাওয়ার পথে কাট্টলী বিল পাওয়া যায়। রিজার্ভ বাজার লঞ্চঘাট থেকে প্রতিদিন সকাল ৭.৩০ থেকে ১০.৩০টার মধ্যে লঞ্চ ছাড়ে। সময় লাগে ৩-৪ ঘণ্টা। লংগদু সদর হতেও নৌকাযোগে কাট্টলীর বিলে পৌঁছানো যায়।
থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা : কাট্টলী বিল বাজারে খাবারের ব্যবস্থা আছে। লংগদুতেও আবাসন ও খাওয়ার সুবিধা রয়েছে।
থাকার স্থান : রাঙামাটি যেহেতু একটি পর্যটন নগরী, সেহেতু হোটেল রিসোর্ট অহরহ। লংগদুতেও রয়েছে- বনশ্রী বিশ্রামাগার, লংগদু রেস্টহাউস ও মাইনী মুখ বাজারের আরাম রেসিডেনসিয়াল হোটেল।