অরণ্য সৌরভ
প্রকাশ : ২৫ নভেম্বর ২০২৪ ১২:২৮ পিএম
১৯৮৫ সালে পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারকে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের স্বীকৃতি প্রদান করে
রাজনীতির উত্থান-পতনে কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে পাল সাম্রাজ্য। সেই সঙ্গে হারিয়ে গেছে সেই সমাজ, শিক্ষা, স্থাপত্য সবকিছুই। বরেন্দ্রভূমির হাজার বছরের ঐতিহ্য যেন মাথা উঁচু করে ঘোষণা করছে উপমহাদেশের অন্যতম প্রচীন বিশ্ববিদ্যালয় সোমপুর বিহার। এখন যা বিশ্ব ঐতিহ্যেরও অংশ
কার্তিকের তেইশতম সকাল। হিমেল পরশ জানান দিচ্ছে শীতের। চারদিকে সোনালি ধান কাটার উৎসব। কৃষকের মাথায় ধানের বোঝা, হাতে কাস্তে। ধানের মাঠের অপরূপ শোভা, শান্ত-স্নিগ্ধ ঐশ্বর্য হৃদয়ে দিয়ে যাচ্ছে প্রাণময় দোলা। এই দোলায় চোখে আসছে প্রশান্তি। গ্রামের পথ-ঘাট-মাঠ-প্রান্তর পেছনে ফেলে পূর্বপরিকল্পনামতো আমি ও মহিতুল ইসলাম হিরু মামা সকাল ৮টায় কালাপাহাড়িয়া থেকে রওনা হয়েছি গাবতলী বাসস্ট্যান্ডের উদ্দেশে। পরিকল্পনায় নওগাঁ গন্তব্য হলেও হানিফ পরিবহনের দুটি টিকিট নিলাম জনপ্রতি ৫৫০ টাকায়, গন্তব্য বগুড়া।
দুপুর ১২টায় বগুড়ার উদ্দেশে যাত্রা করল বাস। শহরের মানুষের ছুটে চলা, যানজট, জুমার আজান, বৃক্ষশোভিত-সৌন্দর্যমণ্ডিত আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে ছুটে চলেছি আমরা। বগুড়ার ধনকুণ্ডির ফুড ভিলেজে বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে যাত্রাবিরতি করল। বিশ মিনিট বিরতির পর পুনরায় যাত্রা করল বাস। মাগরিবের পরপর বনানী চৌরাস্তায় নেমে পড়লাম। সিএনজিযোগে ২০ টাকা ভাড়ায় পৌঁছে গেলাম সাতমাথার মোড় বা বীরশ্রেষ্ঠ স্কয়ারে। এর খুব কাছেই হোটেল মেট্রো ইনে উঠলাম।
কার্তিকের চব্বিশতম দিন সকাল সোয়া ৭টায় বিআরটিসির গেট থেকে বাসযোগে জনপ্রতি ১০০ টাকা ভাড়ায় রওনা করলাম নওগাঁ। সরকারি আজিজুল কলেজ, চান্দু স্টেডিয়াম, চারমাথা চৌরাস্তা, বিমানবন্দর পেরিয়ে চললাম নওগাঁ। শীতের সকাল, চারপাশ কুয়াশায় ঘেরা, রাস্তার দুধারে নানান বৃক্ষের সমারোহ, এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা তালগাছ যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে কী যেন! রাস্তার পাশের পাকা সোনালি ধান কুয়াশাচ্ছন্ন সূর্যের কিরণে যেন হেসে উঠছে। স্থানীয় পরিবহন হিসেবে পরিচিত ভ্যান। ভ্যানে চড়ে নানান বয়সের মানুষের যাতায়াত অন্য এলাকার মানুষকে দেবে নব আনন্দ।

সময় বাড়ার সাথে সাথে সূর্যও শক্তির জানান দিচ্ছে তাপপ্রয়োগে। সকাল ৯টা নাগাদ পৌঁছাই বালুডাঙা বাসস্ট্যান্ড বা নওগাঁ বাসস্ট্যান্ড। সেখান থেকে জনপ্রতি ৪০ টাকা ভাড়ায় সিএনজিযোগে বদলগাছি, বাসযোগেও যাওয়া যায়। বদলগাছি বাজারে ভালো মানের তেমন খাবার হোটেল নেই। অনেক খুঁজে মোটামোটি একটা হোটেল পেলাম, পরোটা-ডাল-ডিম-মিষ্টিতে সারলাম নাশতা। এখানে পেলাম ঘি বা তেলে রান্না করা খুদের ভাত। বদলগাছি থেকে ৩০ টাকা ভাড়ায় সিএনজিযোগে পাহাড়পুর বাজার। নেমেই প্রথমে দেখে নিলাম পাহাড়পুর আদিবাসী উচ্চ বিদ্যালয়।
সেখান থেকে ১০ টাকা ভাড়ায় ভ্যানযোগে সকাল সাড়ে ১০টায় পৌঁছে গেলাম কাঙ্ক্ষিত পাল বংশের দ্বিতীয় রাজা ধর্মপাল কর্তৃক খ্রিস্টীয় অষ্টম শতকের শেষের দিকে নির্মিত পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার। ৩০ টাকা মূল্যের টিকিট নিয়ে প্রবেশ করলাম ভেতরে। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনটির বিস্তৃত এলাকাজুড়ে হেঁটে হেঁটে ইতিহাসের পাতা পরখ করতে শুরু করলাম। যারা কখনও পাহাড়পুর যাননি,

তাদের কল্পনাজগতে হয়তো ভেসে বেড়াচ্ছে পাহাড়পুর পাহাড়ে ভরপুর। কিন্তু সত্য হলো, পাহাড়পুরে কোনো পাহাড় নেই। শুধু নানা ধ্বংসাবশেষের মধ্যে ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন একটি ভগ্ন মন্দির বিদ্যমান। টিকিট সংগ্রহ করে প্রবেশ করতেই বিস্তৃত এলাকাজুড়ে ধ্বংসাবশেষের লাল ইট, চারপাশে বিশাল বিশাল গাছ দেখা যাচ্ছে। খানিক হাঁটলেই দেখা মিলে মন্দিরের। একটি ছোট ব্রিজ পার হয়েই ধ্বংসাবশেষ শুরু। সেটার ওপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চতুর্দিকে চক্কর দেওয়া যায়। আর স্থাপনার কাছে যেতেই চোখ ধাঁধানো দৃশ্য। সোনালি ইটের ওপর রোদের আলো ঝলমল করছে। মন্দিরের গায়ে অসংখ্য প্রাণীর, দেবদেবীর বা প্রাচীন মিসরীয় ভাষা হায়ারোগ্লিফের মতো আঁকা ছবি রয়েছে। মন্দিরটি প্রাচীন হওয়ায় ভেতরে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

দুয়েক ঘণ্টায় মন্দিরসহ পুরো এলাকা ঘোরা যায়। পাহাড়পুর জাদুঘরে সংরক্ষিত মূর্তিগুলোর মাঝে রয়েছে- বেলে পাথরের চামুণ্ডা মূর্তি, লাল পাথরের দণ্ডায়মান শীতলা মূর্তি, কৃষ্ণ পাথরের বিষ্ণুর খণ্ডাংশ, কৃষ্ণ পাথরের দণ্ডায়মান গণেশ, বেলে পাথরের কীর্তি মূর্তি, দুবলহাটির মহারাণীর তৈলচিত্র, হরগৌরীর ক্ষতিগ্রস্ত মূর্তি, কৃষ্ণ পাথরের লক্ষ্মী নারায়ণের ভগ্ন মূর্তি, কৃষ্ণ পাথরের উমা মূর্তি, বেলে পাথরের গৌরী মূর্তি, বেলে পাথরের বিষ্ণু মূর্তি, নন্দী মূর্তি, কৃষ্ণ পাথরের বিষ্ণু মূর্তি, সূর্য মূর্তি, কৃষ্ণ পাথরের শিবলিঙ্গ, বেলে পাথরের মনসা মূর্তি। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনটিতে রয়েছে দুটি রেস্টহাউস, বাহির হওয়ার গেটের বাইরে রয়েছে খাবার হোটেল এবং বিভিন্ন আকর্ষণীয় জিনিসপাতি। রয়েছে পথের দুই পাশে বাহারি ফুলের বাগান, লতানো বৃক্ষের মাধ্যমে তৈরি হাতির পালসহ আকর্ষণীয় ডিজাইনের বাগান। যা আপনাকে মোহিত করার পাশাপাশি বহুগুণে বাড়িয়েছে পুরাকীর্তিটির সৌন্দর্য।
ইংরেজ প্রত্নতাত্ত্বিক বুকানন হামিলটন যখন পূর্ব ভারতে জরিপ কাজ পরিচালনা করেন (১৮০৭-১৮১২) তখন তিনি পাহাড়পুরের এই সূতপকে বৌদ্ধবিহার বলে অনুমান করেন। ১৯২৩ থেকে ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত এর খননকাজ চলে। খননকালে মাটির একটি সিল থেকে জানা যায় যে, এটি সোমপুর বিহার। পাল রাজবংশের রাজা ধর্মপাল (৭৮১-৮২১) অষ্টম শতকের শেষ দিকে এ বিহার নির্মাণ করেন। সোমপুর বিহার এর দৈর্ঘ্য পূর্ব-পশ্চিমে ৯১৯ ফুট এবং উত্তর-দক্ষিণে ৯২২ ফুট। মূল ভবনে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের জন্য ১৭৭টি কক্ষ ছিল। ৮০০ জন ভিক্ষুর বাসোপযোগী ছিল।

এ বিহারে ১২৫নং কক্ষে মাটির পাত্রে খলিফা হারুন-অর-রশিদের শাসনামলের রৌপ্য মুদ্রা পাওয়া যায়। কোনো সাধক বা ধর্ম প্রচারক মুদ্রাগুলো এখানে এনেছিলেন বলে অনুমান করা হয়। পিরামিড আকৃতির এ মঠের উচ্চতা ৭০ ফুট। একটি শূন্যগর্ভ চতুষ্কোণ কক্ষকে কেন্দ্র করে এর অন্য সংযোজনীসমূহ গড়ে উঠেছে। সমগ্র বিহারটি প্রাচীরবেষ্টিত। এর প্রবেশপথ এবং মূল ভবনে ওঠার সিঁড়ি ছিল উত্তর দিকে। সোমপুর বিহারে বাস করতেন মহাপণ্ডিতাচার্য বোধিভদ্র। আচার্য অতীশ দীপঙ্কর কিছু কাল এই বিহারে বাস করেন। তার গুরু রত্নাকর শামিত্ম সোমপুর বিহারের মহাস্থবির ছিলেন।
সোমপুর বিহারে অবস্থান করতেন প্রাচীন চর্যাগীতিকার কাহ্নপা ও তার গুরু জলন্দরী পা ওরওফ হাড়ি পা। স্থানীয়ভাবে পাহাড় নামে পরিচিত লাভকারী এ ধ্বংসাবশেষের অবস্থান থেকে পাহাড়পুর নামের উৎপত্তি হয়েছে। পূর্ব ভারতে জরিপকাজ পরিচালনাকালে ১৮০৭ থেকে ১৮১২ সালের মধ্যে বুকানন হ্যামিলটন সর্বপ্রথম প্রত্নস্থলটি পরিদর্শন করেন। পরে ওয়েস্টম্যাকট পাহাড়পুর পরিভ্রমণে আসেন। আলেকজান্ডার ১৮৭৯ সালে এ স্থান পরিদর্শন করেন। প্রত্নস্থলটি ১৯০৯ সালে পুরাকীর্তি আইনের আওতায় ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগ কর্তৃক ১৯১৯ সালে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষিত হয়। পাহাড়পুর থেকে বের হয়ে পৌঁছাই বালুডাঙা বাসস্ট্যান্ড। ভাবলাম, এবার গন্তব্য কোথায়? সাত-পাঁচ ভেবে জনপ্রতি ১৮০ টাকায় রেডহর্স পরিবহনের টিকিট নিলাম, গন্তব্য রাজশাহী।
যাবেন কীভাবে
দেশের যেকোনো প্রান্ত হতে নওগাঁ শহরে এসে নওগাঁ বালুডাঙা বাস টার্মিনাল থেকে সরাসরি বাসযোগে ঐতিহাসিক পাহাড়পুরে যাওয়া যায়। দূরত্ব আনুমানিক ৩২ কিলোমিটার এবং বাসভাড়া ৩০ থেকে ৪০ টাকা। অথবা দেশের যেকোনো প্রান্ত হতে জয়পুরহাট শহরে এসে বাস অথবা অটোরিকশা নিয়ে পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার চলে আসতে পারবেন। জয়পুরহাট হতে পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারের দূরত্ব মাত্র ১৩ কিলোমিটার। ট্রেনযোগে জয়পুরহাটের জামালঞ্জ স্টেশনে নামলে এখান হতে পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারে আসতে চাইলে আপনাকে ভ্যান অথবা অটোরিকশা নিতে হবে। জামালগঞ্জ হতে পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারের দূরত্ব মাত্র পাঁচ কিলোমিটার।