বিপ্লব বড়ুয়া
প্রকাশ : ২০ নভেম্বর ২০২৪ ১৫:৩২ পিএম
অর্ধশতাব্দীর বেশি হলো পত্রিকা বিক্রি করছেন ষাটোর্ধ্ব দুলা মিয়া। ছবি : লেখক
ঘড়ির কাঁটায় তখন বেলা সাড়ে ৩টা। বিহারের উঠানজুড়ে হাজারো নারী-পুরুষ। বৌদ্ধদের কঠিন চীবর দান উপলক্ষে ধর্মসভা চলমান। বৌদ্ধ ভিক্ষুদের ধর্মভাষণের দিকে ভক্তদের নিবিড় মনঃসংযোগ। ধর্মসভা থেকে হঠাৎ চোখ পড়ল বিহারের ভেতরে। কে যেন এদিক-সেদিক হাঁটাহাঁটি করছেন। চুল, দাড়ি, মোচ সাদা, গায়ের রঙ কালো। রোদে পোড়া, যেন শুকনো একটি কাঠ। শরীরজুড়ে লুঙ্গি ছাড়া আর কিছু অবশিষ্ট নেই। খেয়াল করলাম হাতে বেশ কিছু পত্রিকা। বিহারের সীমানা থেকে বেরিয়ে লোকটা পুরোনো মরিচা ধরা একটি বাইসাইকেল নিয়ে চলে যাওয়ার জন্য তাড়াহুড়া করছেন। সাইকেলে আরও কিছু পত্রিকা আছে। সঙ্গে পানির বোতল, পলিথিনসহ তার প্রয়োজনীয় নানান সরঞ্জাম খুব শক্ত করে বেঁধে রেখেছেন সাইকেলটিতে। দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞাসা করলামÑ আপনি কে? কী করেন? তিনি বললেন, ‘আমার নাম দুলামিয়া, আমি একজন হকার, পত্রিকা বিক্রি করি।’
সাইকেলটির অবস্থা দেখে মনে হবে আত্মভোলা টাইপের মানুষ! একজন পত্রিকা বিক্রেতার এ রকম শ্রীহীন অবস্থা দেখে মনটা মুহূর্তে খারাপ হয়ে গেল। বললাম, আপনি তো পত্রিকা বিক্রি করেন, মানুষকে জ্ঞান দান করতে সহায়তা করেন কিন্তু আপনার এ অবস্থা কেন! কিছু গায়ে দেননি কেন? বললেন, ‘প্রচণ্ড গরম, এজন্য শার্ট, গেঞ্জি পরি না। এমনি সাইকেলে রেখেছি। গ্রামে থাকি তেমন কিছু না পরলেই চলে। প্রতিদিন ভোরে চট্টগ্রাম শহরে যেতে হয় পত্রিকার জন্য। শহরের ২ নম্বর গেটে এজেন্ট থেকে পত্রিকা আনতে গেলে তখন কাপড় পরি। সাইকেল চালিয়ে মানুষের ঘরে ঘরে গিয়ে পত্রিকা পৌঁছে দিতে গেলে তখন গরম লাগে, তাই কাপড় গায়ে দিতে ইচ্ছা করে না।’
যে স্থানে হকার দুলামিয়ার সঙ্গে কথা হচ্ছিল সে গ্রামটির নাম মৈতলা। চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলা সদর থেকে অনেক গভীরে। হকার দুলামিয়া বললেন সেই ’৭১ সাল থেকে পত্রিকা বিক্রির কথা। বয়স জিজ্ঞাসা করা হয়নি তবে দেখে অনুমান ৬০-এর কম নয়। বোয়ালখালীর সারোয়াতলী ইউনিয়নের নাগরো বাড়িতে তার গ্রাম।
সেই ব্রিটিশ আমল থেকে মুসলমানের তুলনায় হিন্দু ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের বসবাস অনেকটা বেশি এ অঞ্চলে। দেশের মফস্বল এলাকা হলেও সেই তখন থেকে এ অঞ্চলগুলো ছিল শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, রাজনীতির জাগরণ ক্ষেত্র এবং স্বাধীনতাসংগ্রামীদের বিচরণভূমি। বাঙালির সবকটি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম হতো অত্যন্ত জাঁকজমক ও উৎসবমুখর পরিবেশে। নাটক, পালাগান সবকিছু হতো।
পত্রিকা বিক্রি করে কেমন আছেনÑ জানতে চাইলে চোখ ছলছল করে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। বললেন, ‘এখন তো চাকরি করছি।’ যেমন? ’৭১ সালে ১৮ টাকা ধার নিয়ে পত্রিকা বিক্রিতে নামি। দীর্ঘ ৫৩ বছর ধরে পত্রিকা বিক্রি করে চলেছি। আগে ৩ টাকা লাভ করে ১ টাকা নিজের খরচের জন্য রেখে ২ টাকা বাড়িতে দিতাম আর সে জায়গায় এখন ৫০০ টাকায়ও পোষায় না; ভালো কীভাবে থাকি আপনিই বলেন! দিনে পত্রিকা বিক্রি করি ১২০-১৩০টির মতো। স্ত্রী ও চার ছেলেসন্তান নিয়ে সংসার। সন্তানরা দিনমজুরি কাজ করে।’
তিনি বলেন, ‘পরিবার হয়েছে বড়, এ আয়ে এখন আর দিন চলে না। কাঁচাবাজারের দাম যে হারে বেড়েছে কিছু একটা কিনে নিয়ে যাব তা কুলায় না।’ তিনি বলেন, ‘এতদূর সাইকেল চালিয়ে পত্রিকা বিলি করা কষ্টকর হলেও পত্রিকা থেকে ছুটতে পারছি না। পত্রিকার সঙ্গে মায়া জড়িয়ে গেছে। একদিন বের হতে না পারলে অসুস্থ বোধ করি। রোদবৃষ্টিতেও পত্রিকার টানে বেরিয়ে যাই। কারণ পত্রিকার প্রতি আমার এক ধরনের ভালোবাসা জমে গেছে।’ তিনি বলেন, ‘কষ্ট হলেও এ পেশায় আমৃত্যু কাটাতে চাই। দীর্ঘ ৫৩ বছর ধরে পত্রিকা বিক্রি করে জীবন ধারণ করলেও ভাগ্যের চাকা একটুও বদলায়নি।’