তুহিন ওয়াদুদ
প্রকাশ : ১৩ নভেম্বর ২০২৪ ১২:৩১ পিএম
সার্ভেয়ার মমিনুর রহমান কাজলের তৈরি নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার তিস্তার আন্তঃশাখা নদী কুমলাইয়ের মানচিত্র
নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার কুমলাই নদী স্থানীয়দের দখলের কবলে নিশ্চিহ্নপ্রায়। সরকারি মানচিত্রে অবস্থান থাকলেও বাস্তবে অনেক স্থানে চিহ্ন নেই নদীটির
নদী দখল কিংবা দূষণকারীদের বাংলাদেশে শাস্তির আওতায় আনা হয় না। ফলে দখলকারীরা নিশ্চিন্তে নদী দখল করে। এই নদী দখলে সহায়তা করে আমাদের দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এই দখল-দূষণ শহর-গ্রাম সর্বত্রই। দখলদারদের মধ্যে দলীয় ভেদাভেদ থকে না। দখলদারদের একটি সাধারণ ঐক্য হলো তারা দখলদার। দখলের বিরুদ্ধে যেকোনো প্রতিবাদ তৈরি হলেই অবৈধ দখলদারদের জোট স্থানীয় প্রশাসন কিংবা ক্ষমতাসীন সরকারের সহায়তায় প্রতিরোধ গড়ে তোলে। আর যারা নদী রক্ষায় আন্দোলন করে তাদের নানান রকম হেনস্থার শিকার হতে হয়। আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ নদীর প্রকাশ্যে দখল হওয়া নিয়ে আলোচনা করছি। যে নদীটি সরকারের মানচিত্রে আছে, বাস্তবে অনেক স্থানে নদীটির চিহ্ন অবশিষ্ট নেই।
নীলফামারী জেলার ডিমলা উপজেলার একটি নদী। নদীটি সরকারি ও বেসরকারিভাবে মেরে ফেলার আয়োজন সম্পন্ন হয়েছে। আমরা রিভারাইন পিপলের পক্ষে নদীটি উদ্ধারে আন্দোলন করছি। কুমলাই নদীটির পরিচিতি কয়েক নামে। কেউ বলে কুমলাল, কেউ বলে কুমলাই, সিএস রেকর্ডসূত্রে এ নদীর নাম কামনাই। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন ‘আপার কুমলাই’ ও ‘লোয়ার কুমলাই’ নাম দিয়ে দুটি নদী বানিয়েছে।
নদীটি নিয়ে একেক প্রতিষ্ঠান একক তথ্য দিয়েছে। যার কোনোটিকে গ্রহণ করা যায় না। পানি উন্নয়ন বোর্ড নদীটিকে ‘কুমলাল-নাউতারা’ নামে উল্লেখ করেছে। কুমলাল ও নাউতারা বাস্তবে দুটি নদী। দুটি আলাদা উৎসস্থল থেকে উৎপন্ন হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড এ দুটি নদীকে একসঙ্গে করে বলেছে এর দৈর্ঘ্য ২৫ কিলেমিটার। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন নাউতারা নামে কোনো নদীরই উল্লেখ করেনি। কুমলাইকে বলেছে ‘আপার কুমলাই’। এর দৈর্ঘ্য বলা হয়েছে ১৪ কিলোমিটার। আবার ‘লোয়ার কুমলাই’ নামে আরেকটি নদী দেখানো আছে। লোয়ার কুমলাই নদীর উৎস এবং পতনস্থল সম্পর্কে কোনো তথ্য নেই। বলা হয়েছে নদীটির দৈর্ঘ্য ৬ কিলোমিটার। পানি উন্নয়ন বোর্ড বলেছে এ নদীর উৎসস্থল নিম্নাঞ্চল। বাস্তবে এ কথাও ঠিক নয়। পানি উন্নয়ন বোর্ড, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন যেসব তথ্য হাজির করেছে সেগুলো বস্তুনিষ্ঠ নয়।
বাস্তবে কুমলাই নদী তিস্তার আন্তঃশাখা নদী। নদীটি নীলফামারী জেলার ডিমলা উপজেলার ছাতনাই ইউনিয়নের ঝাড় শিংহাসর নামক স্থানে তিস্তা থেকে উৎপন্ন হয়ে প্রায় ২০ কিলোমিটার প্রবাহিত হয়ে খালিসা-চাপানি ইউনিয়নের ছোটখাতা ও টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের পূর্ব খড়িবাড়ি নামক মৌজায় তিস্তা নদীতে আবার মিলিত হতো। বর্তমানে নদীখেকোদের কারণে নদীটি মরণাপন্ন। নদীটি পূর্বছাতনাই ইউনিয়নের বালাপাড়া মৌজা, খগাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের দহলপাড়া ও কিসামত ছাতনাই মৌজা, গয়াবাড়ি ইউনিয়নের পশ্চিম খড়িবাড়ি ও গয়াবাড়ি মৌজা, টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের দক্ষিণ খড়িবাড়ি ও পূর্বখড়িবাড়ি মৌজা এবং খালিশা চাপানি ইউনিয়নের ছোটখাতা মৌজা দিয়ে প্রবাহিত।

নদীটির ওপর প্রথম নির্যাতন করে পানি উন্নয়ন বোর্ড। সরকারি এই প্রতিষ্ঠান নদী রক্ষার দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান হলেও কুমলাই নদীর সর্বনাশ করার ক্ষেত্রে প্রথম ভূমিকা পালন করে। মূলত পানি উন্নয়ন বোর্ড যদি নদীটি মেরে ফেলার আয়োজন না করত, তাহলে হয়তো নদীটি দখলে অন্যরা এগিয়ে আসত না। পানি উন্নয়ন বোর্ড নদীটির উৎসমুখ তিস্তা থেকে আলাদা করে ফেলে। অর্থাৎ তিস্তার শাখা নদী হিসেবে যে পরিচিতি ছিল তা মুছে ফেলে। তিস্তা নদীতে এমনভাবে বাঁধ দেওয়া হয়, যাতে কুমলাই নদী আর পানি না পায়। একই সঙ্গে তিস্তার যে স্থানে কুমলাই নদী মিলিত হতো, সেই স্থানটিও বাঁধ দিয়ে বন্ধ করা হয়।
উৎস ও মিলনস্থলে বাঁধ দেওয়ার পর নদীটি তার প্রধান প্রবাহ হারিয়ে ফেলে। তিস্তা নদী থেকে পানি মাটির নিচ দিয়ে চুইয়ে চুইয়ে কুমলাই নদীতে আসতে শুরু করে। প্রবাহ আগের মতো না থাকলেও কুমলাই নদীর প্রবাহ ক্ষীণ ধারায় বেঁচে থাকে। কুমলাই নদীর ক্ষীণ ধারার পানি যখন তিস্তা নদীতে পড়ার ক্ষেত্রে বাধা দেওয়া হয়েছে, তখন সেই পানি প্রবাহিত হতে হতে একটি নতুন প্রবাহ তৈরি করে নিয়েছে। মিলনস্থলের পাশ দিয়ে সেই প্রবাহ এখন প্রায় ২০-২৫ কিলোমিটার দূরে ধুম নদীতে মিলিত হয়।
এরপর নদীটির পানিপ্রবাহ বন্ধ করা হয় শুটিবাড়ি নামক স্থানে। তখন পানি যাওয়ার আর কোনো পথ থাকে না। পানি উন্নয়ন বোর্ডের দায়িত্ব ছিল পানির প্রবাহ সচল করার। কিন্তু পানি উন্নয়ন বোর্ড সে কাজ না করে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে নাউতারা নদীর সঙ্গে এই নদীর মিলন ঘটানোর উদ্যোগ নেয়। এ কাজ করার জন্য এই প্রতিষ্ঠান দৈর্ঘ্য অনুযায়ী জমি অধিগ্রহণ করে। অর্থাৎ দখলদারদের দখল বজায় রেখে সরকারি টাকার অপচয়সাধন করে অধিগ্রহণকৃত জমিতে খাল খনন করে নদীর প্রবাহ ভিন্ন দিকে প্রবাহিত করা হয়।

বর্তমানে এ নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বন্ধ করা হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রোগ নির্ণয় কেন্দ্র, সরকারি মহিলা মার্কেট, সেতুবিহীন একাধিক সরকারি পাকা-কাঁচা সড়ক, অনেক বাড়ি, অনেকগুলো দোকান তৈরি করা হয়েছে কুমলাই নদী ভরাট করে। পুকুর ও আবাদি জমিও অনেকে বানিয়েছে। নদীটিতে বাড়ির সংখ্যা দেড় শতাধিক, দোকান ত্রিশটির বেশি, একটি মহিলা মার্কেট, একটি স’মিল, দুটি স্কুল. দুটি মাদ্রাসা, একটি ঈদগাহ মাঠ আছে। বাগান ও বাঁশঝাড় মিলে ত্রিশটির বেশি আছে। নদী এলাকার অসংখ্য মানুষের কথা বলেছি। ‘নদীটি সুরক্ষায় করণীয়’ শীর্ষক আলোচনা সভা করেছি।
নদীটি রক্ষা করতে এখন অনেকগুলো কাজ করতে হবে। সবার আগে সিএস রেকর্ডমতে সরকারি জমির খাজনা-খারিজ বন্ধ করতে হবে। এ নদীতে গড়ে ওঠা সমস্ত অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে হবে। নদীটি সিএস এবং এসএ রেকর্ডমতে সরকারি। নতুন রেকর্ডে অনেকটা অংশ ব্যক্তির নামে লিপিবদ্ধ হয়েছে। ব্যক্তির মালিকানা বাতিলকরত রেকর্ড সংশোধনের মামলা করতে হবে। আগে যদি রেকর্ড সংশোধনের মামলা করা হয়, তাহলে মালিকানা বাতিল নিয়ে কালক্ষেপণ হতে পারে। এ নদীতে গড়ে ওঠা সরকারি প্রতিষ্ঠান কিংবা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান সরকারি উদ্যোগে ত্রুটিমুক্ত জমিতে স্থাপন করতে হবে। তিস্তা নদীর উৎসস্থলে ও মিলনস্থলে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে এমন অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে, যাতে তিস্তা নদী কুমলাইপাড়ের মানুষের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে না দাঁড়ায়।
এ নদীর অনেক অংশ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা কবুলিয়াত দিয়েছে যা ভূমি আইনবিরোধী। ফলে ওই কবুলিয়াত যথাসম্ভব দ্রুত বাতিল করতে হবে। এ নদীর বুকে বেশ কয়েকটি আড়াআড়ি সড়ক দেওয়া হয়েছে। ওইসব সড়কে অবশ্যই সেতু স্থাপন করতে হবে। যেসব সেতু নদীর প্রকৃত মাপের চেয়ে ছোট আছে, সেগুলোতে অবশ্যই সেতুর মাপ বড় করতে হবে। যারা নদীটির সর্বনাশের সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।

আমরা নদীটি সুরক্ষার দাবিতে রিভারাইন পিপল কুমলাই নদী শাখার পক্ষে ১০ দফা দাবিতে নীলফামারীতে সংবাদ সম্মেলন করেছি, জেলা প্রশাসক, বিভাগীয় কমিশনার ও জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনে লিখিত দিয়েছি। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন থেকে কর্মকর্তা সরেজমিন অনুসন্ধান সাপেক্ষে নদীটি সুরক্ষায় বেশ কিছু নির্দেশনা দিয়েছেন। বিভাগীয় কমিশনার বিভাগীয় নদী রক্ষা কমিটির সভাপতি হিসেবে কুমলাই নদী রক্ষায় নির্দেশনা দিয়েছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত নদীটি রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।
কুমলাই নদী সুরক্ষায় যারা আন্দোলন করছে তাদের ওপর বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। এই নদী থেকে অবৈধ স্থাপনা যদি দ্রুত অপসারণপূর্বক দখলদারদের মালিকানা বাতিল করা না যায়, তাহলে আন্দোলনকারীদের ওপর চাপ বাড়তে থাকবে। আমাদের অভিজ্ঞতা হলো- নদীর অবৈধ দখলদার, স্থানীয় প্রশাসন-স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি মিলে একটি জোট গঠিত হয়। এই জোট ভয়াবহ হয়ে ওঠার আগেই নদীটি দখলমুক্ত করতে হবে। বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকার দেশ পরিচালনা করছে। আগে যেসব নদীতে দখল বজায় রাখতে আওয়ামী লীগের লোকজন সক্রিয় ছিল, এখন ভিন্ন কেউ সেই কাজ করতে পারে। সেজন্য দ্রুতই কুমলাই নদীকে মুক্ত করতে হবে। পরিবেশ-প্রতিবেশ-অর্থনীতি-কৃষি-জীববৈচিত্র্য সুরক্ষার স্বার্থেই এ কাজ জরুরি।
লেখক: অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, বেগম রাকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও পরিচালক, রিভারাইন পিপল