তাহমিদ মোর্শেদ
প্রকাশ : ১১ নভেম্বর ২০২৪ ১২:৫৫ পিএম
আপডেট : ১১ নভেম্বর ২০২৪ ১২:৫৬ পিএম
পাহাড় আমার কাছে বরাবরই রহস্যময়, কিন্তু দুর্বোধ্য নয় কখনও। ইঞ্জিনচালিত নৌকায় সাঙ্গু নদের পান্না সবুজ বুক চিরে এগিয়ে চলেছি, গন্তব্য দেশের চতুর্থ সর্বোচ্চ চূড়া যোগী হাফং। লিখেছেন তাহমিদ মোর্শেদ
লম্বা ছুটি পেলে আমার কখনই ঘরে বসে থাকতে মন চায় না। পরীক্ষা শেষে ছুটিতে চেয়েছিলামÑ বাসায় না থেকে দূরে কোথাও যাই। চিন্তা না করতেই মাথায় চলে আসে বান্দরবান যাওয়ার কথা। যাত্রা শুরু হলো ‘যোগী হাফং’ নামক পর্বতের উদ্দেশে। বর্তমানে যোগী হাফং বা কংদুক পাহাড় সব ট্রেকারের জন্য অন্যতম একটি কঠিন চূড়া হিসেবে পরিচিত। অনেকে জৌ তলাং আর যোগী হাফং- এর উদ্দেশে যায়, কিন্তু প্রায়ই যোগী হাফং ভালোভাবে সামিট হয় না। চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট বাস কাউন্টার থেকে আমরা বান্দরবানের বাসের টিকিট কেটে বান্দরবান পৌঁছে যাই সকাল ১০টার দিকে। ১১টায় থানচির বাসে উঠি আমরা। চারদিকে দেখা সবুজ পাহাড় থেকে হঠাৎ করে মেঘের আনাগোনা দেখা দিচ্ছিল। প্রায় ২১০০ ফুট উঁচু সড়কটা পুরোপুরি মেঘে ঢাকা। এক পাশে শূন্য, অন্য পাশে দক্ষিণ চিম্বুক রেঞ্জ। মূলত বান্দরবান-থানচি সড়কটা চিম্বুক রেঞ্জের ওপরই, বাংলাদেশে দ্বিতীয় উঁচু সড়ক। চিম্বুক রেঞ্জ দেখতে পেরেছিলাম থানচি ব্রিজের ওপর নেমে।

না খেয়েই আমাদের সেদিন তাড়াহুড়ো করে রেমাক্রিতে চলে যেতে হয়। সাঙ্গু নদে ২ ঘণ্টার মতো সময় লেগেছিল পৌঁছাতে। সাঙ্গু বাংলাদেশের দ্বিতীয় দীর্ঘতম নদ; তার উৎপত্তি বান্দরবানের অনেক গহিনে, Sangu-Matamuhuri Reserve Forest-এর মধ্যে। এই নদ রিজার্ভ ফরেস্টের অন্তর্ভুক্ত আন্ধারমানিক থেকে লিক্রি পেরিয়ে শঙ্খ নদ (উজান) থেকে আরও দূরে মাতাদুসরি, ব্রুংক্ষিয়াং, তংক্ষিয়াং, লাগপাই, থাকব্রো ইত্যাদি ঝিরির সঙ্গে মিলেছে। রেমাক্রি থেকে এসব জায়গা পুরো একটা ভিন্ন দুনিয়ার পথ মনে হবে।
রেমাক্রি যাওয়ার পথে মাঝেমধ্যে উত্তাল ঢেউয়ের ধাক্কা আর বড় বড় পাথরের অসাধারণ আকার-আকৃতি দেখে মুহূর্তে মনটা কেড়ে নিয়েছিল। বড় পাথর এলাকায় বিভিন্ন রকমের বিরাট আকৃতির পাথর, রানি পাথর আর রাজা পাথর! বৃষ্টির ঢলে পাথরগুলো সব ডুবে আছে। নদীতে এমন স্রোত কখনও দেখিনি। পাহাড়ঘেরা এবং বর্ষার সৌন্দর্যের একমাত্র অপরূপ বাংলা হয়তো এটাই!

একদম বিকালে আমরা রেমাক্রি গিয়ে পৌঁছাই। সেখান থেকে রাতে আমাদের পিচ্ছিল কাদায় এবং রেমাইফা খালের বুকপরিমাণ পানি বারবার পার করতে খুব কষ্ট হয়েছিল। রাত যেহেতু সুবিধার্থে একটা গাইড রেখেছিলাম সঙ্গে। প্রায় ৩ ঘণ্টা লেগেছে এই পিচ্ছিল পথে অন্ধের মতো হেঁটে হেঁটে। শুকনো মৌসুম থাকলে ২ ঘণ্টার বেশি লাগত না। সকালবেলা রওনা দিতে পারলে সবুজবীথি মায়ার রূপ দেখা যেত। এক পাশে মদক রেঞ্জ। কোথাও চিম্বুক রেঞ্জের দেখা। রঙিন পাথর ভরা রেমাইফা ঝিরি, আর যাওয়ার পথে মুরংদের ‘কেউশিংপাড়া’ এবং মারমাদের ‘চংখথপাড়া’ পড়বে। সেদিন রাত ৯টায় আমরা দলিয়ানপাড়ায় পৌঁছলাম। রাতে সেখানে হেডম্যানের এক ভাতিজির বাসায় ছিলাম। পাহাড়ে গেলে আমি কখনও পাহাড়ি খাবার না খেয়ে থাকতে পারি না। সেদিন রাতেই বাঁশকোড়ল আর পাহাড়ি মুরগি দিয়ে আমাদের পেটভোজন করানো হয়। যে ঘরে রাতে ছিলাম, সেই ঘরের দাদা আমাদের যোগী হাফং যাওয়ার গল্প শোনাচ্ছেন।

এই দাদাই আমাদের পরদিন চূড়ায় নিয়ে যাবে বলেছেন। জৌ তলাং-যোগী হাফং সামিটের অলিখিত নিয়ম হচ্ছেÑ শুরু করতে হবে খুব ভোরে। কারণ দুটোÑ দীর্ঘ, বন্ধুর পথ এবং ফেরার সময় রাতে হাইকিং এড়িয়ে যাওয়া। আমরাও ভোরে না হলেও যথাসময়ে পথে নেমে যাই। আলীকদম থেকে তিন্দু পথটুকু সবাইকেই খুব ক্লান্ত করে দিয়েছিল। সবারই পায়ের অবস্থা কিঞ্চিত সঙ্গিন। যোগী সামিটের জন্য যা আসলে একটা ভালো প্রতিবন্ধকতা। তবু বান্দরবানের পাহাড়ি পথে হাঁটাচলার অভ্যাস থাকায় কেউই আমরা তেমন গা করিনি। পূর্ব অভিজ্ঞতা বলে একটু হাঁটলেই পায়ের ‘লক’ আস্তে আস্তে খুলতে থাকবে! আমরাও তাই দ্বিধাহীনভাবে যাত্রা শুরু করে দেই। পথে রান্নার জন্য যাবতীয় তৈজসপাতি (পাতিল, ছোট্ট গ্যাসের চুলা, গ্যাসের ক্যান, চামচ, খাবার বাটি, ওয়ানটাইম গ্লাস), সকালে নাশতার জন্য পাড়া থেকেই খিচুড়ি আর সিদ্ধ ডিম, রেশন হিসেবে স্যুপ, নুডলস নেওয়া হয়।

দলিয়ানপাড়া-যোগী-দলিয়ানপাড়া মোটামুটি ৮-১০ ঘণ্টার পথ। তাই পর্যাপ্ত খাবার নিয়ে নেওয়াটা ভীষণ জরুরি। পাড়া থেকে ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই ওয়াই জংশন বলে পরিচিত এক বাঁকে পৌঁছে গেলাম আমরা। ওয়াই জংশন থেকে একটু সামনে গিয়েই ডানে ঝিরি ধরে জৌ তলাং এবং বায়ে যোগীর পথ। আমাদের আজকের গন্তব্য যেহেতু শুধুই যোগী, আমরা তাই বাম দিকের পথে হাঁটা ধরলাম। যোগীর চূড়াটা দেখতে কেমন যেন আমার খুব অদ্ভুত মনে হয়। চারটা ভাঙা ভাঙা চূড়া, যার মধ্যে ‘North Peak’ টাই সবচেয়ে উঁচু।
কংদুক পাহাড় বললে সব মারমা জাতি চিনবে এই চূড়া। আবার বম জাতিদের মতে, এর নাম ‘লৌহ তলাং’, কারণ যোগীর গায়ে অনেকগুলো ‘লৌহ’ নামক ঝিরি বেয়ে নেমেছে। ত্রিপুরাদের মতে, ‘লুকু’ চূড়া নামেও বেশ খ্যাত। লুকু নামের আরও অনেকগুলো চূড়া আছে, থিন্দোলতে লাং (সপ্তম) এবং লখু তং (১২তম)। মূলত লুকু অর্থ যে চূড়াগুলো আছে, দেখতে কিছুটা টুপির মতো। ‘যোগী হাফং’ বাংলাদেশের চতুর্থ সর্বোচ্চ চূড়া, যার উচ্চতা আনুমানিক ৩২২২-৩২৫৮ ফুট। যোগী হাফংয়ের পাশেই আরেকটা চূড়া জৌ তলাং, যা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ চূড়া। এর উচ্চতা ৩৩২৮-৩৩৫৩ ফুট। দুটো চূড়ার মাঝে ২৯০০ ফুটের কাছাকাছি উচ্চতার ‘আয়ান ক্লাং’ নামের একটি চূড়া আছে। এই তিনটি চূড়াই বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু পাহাড়ের রেঞ্জ, মদক রেঞ্জে অবস্থিত। মূলত বান্দরবান জেলায় বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সীমান্তই এই মদক রেঞ্জ দিয়ে ভাগ করা হয়েছে। অন্যদিকে, বান্দরবানের সঙ্গে সংযুক্ত ভারতের বর্ডার রেং তলাং রেঞ্জের সাপেক্ষে আঁকা হয়েছে। ভোর ৬টা ৩০ মিনিটে আমরা দাদাকে নিয়ে যোগী হাফংয়ের জন্য রওনা দেই।
গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি তখন, দলিয়ানপাড়ার চারপাশে মেঘে ঢাকা। শুরুর পথটুকু খুবই পিচ্ছিল। আমাদের ট্রেকিং জুতোও ভালো কাজে দিচ্ছে না। দলিয়ানপাড়ার নিচে ঠান্ডা ‘রেমাইফা ঝিরি’ ধরেই আমাদের ট্রেকিং শুরু হয়। কোথাও কোমরসমান পানি, কোথাও পিচ্ছিল পাথর, আর কোথাও মারাত্মক পানির ঢল। প্রতি মুহূর্তেই বড় বড় টাইগার জোঁকের কামড় এবং গ্রিন ভাইপার নামক একটা বিষাক্ত সাপের প্রথম দেখা! প্রথম ২ ঘণ্টা এ রকম খাড়া পাহাড় বেয়ে ওঠার পর যোগীর খুব কাছে উঠে আসি। ত্রিপুরা জুম, সোনালি পাকা ধান যোগীর সারা গায়ে। জুমঘরে আমরা কিছুক্ষণ বিশ্রাম করে নিই। আমরা শারীরিকভাবে তখনই দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম। সারা পায়ে জোঁকের দেওয়া লাল রক্তভরা আদর, বাঁশবনের কালোশলায় চুলকাতে শুরু করে সারা গায়ে। হালকা বৃষ্টি হচ্ছিল, সোনালি জুম পুরো মেঘে ঢাকা, যা দেখে মুহূর্তে সব ঘ্লানি মুছে যাই। চারদিকে পাহাড়ের সমারোহ, মাঝে জুমের রাজ্য। মেঘে ছুঁয়ে যাওয়া স্পর্শ শরীরে এক নতুন শিহরন দিয়ে যায়। অপরদিকে শূন্য আকাশের বিশালতা সুউচ্চ পাহাড়ে গিয়ে মিশে যাওয়ার দৃশ্য, নিজ চোখে দেখলে বিশ্বাস করার মতো নয়। ডান পাশে যোগীর চারটি চূড়া খুব স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল, পিরামিডের মতো দেখতে আয়ান ক্লাং আর অনেক উঁচুতে জৌ তলাং।

জুমঘর ত্যাগ করে জুমের পাহাড়ি পথ ধরে হেঁটে যেতে থাকি, নিচের দিকে নেমে এলে ‘লৌহ ঝিরি’তে যোগীর মেইন ট্রেইল, এখান থেকে শুরু। পিচ্ছিল পাথরে পা দিয়ে দিয়ে ওপরের দিকে উঠে যাচ্ছি, খাড়া ঝিরি দেখে মনে ভয় চলে আসে। বাঁশগাছ ধরে ধরে কোনোভাবে ওপরে উঠে যাচ্ছিলাম, বড় বড় পাথর বেয়ে নেমে আসছিল ছোট-বড় ঝরনার মতো অনেকগুলো ক্যাসকেড। বৃষ্টি মাত্র শেষ হলো। ঝিরির প্রবণতা ধীরে ধীরে কমে আসছিল। ইতোমধ্যে জোঁকগুলো রক্ত খেতেই আছে। পিচ্ছিল পাথর থেকে পড়ে যাওয়ার ভয়ে টাইগার জোঁকের দিকে তাকাতেই পারছিলাম না। সারা গায়ে চুলকায় আর লাল হয়ে গেছে শরীর।
এমন ২ ঘণ্টার মতো হেঁটে আমরা ঘন একটা বাঁশবনে উঠে পড়ি। চূড়ায় ওঠার আগে এই বাঁশবনটাই আমাদের শরীরের শেষ ক্ষতি করে ছেড়েছে। ওপরে হালকা আলো দেখতে পারছিলাম, মনে শুধু একটাই আশা নিয়ে সেই ওপরে পৌঁছে যাই। এক পাশে ঝোপঝাড় আর অন্য পাশে খোলা জায়গা থেকে বিশাল দানবের মতো দেখতে জৌ তলাং এবং আয়ান ক্লাং। রিজলাইনের পাথর পুরোটায় পিচ্ছিল ছিল, আর ঝোপঝাড়ের পরিমাণ বেশি থাকায় গাছ কেটে কেটে যেতে আমাদের রিজলাইনেই প্রচুর সময় লেগেছিল। চূড়া পর্যন্ত পৌঁছতে আমাদের ৫ ঘণ্ট লাগে।

চূড়ায় পৌঁছে যে দৃশ্য আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠে, নিজেকে এক অন্য জগতে ভেসে নিয়ে যাওয়ার মতো। চূড়া থেকে ‘সাকা হাফং’ বাংলাদেশের প্রথম সর্বোচ্চ চূড়ার স্পষ্ট দেখা পেয়ে নিজেকে অনেক ভাগ্যবান মনে হয়েছিল। চূড়ার ওপর থেকে ৩৬০ ডিগ্রি ভিউ, একপাশে জৌ তলাং-আয়ান ক্লাং, উল্টোদিকে সাকা হাফং আর ঈশ্বর মুনির তিনটা চূড়া কিছুটা মেঘে ঢাকা। একপাশে ইয়াং বং-কির্স তং-রুংরাং তং-মরিফা তং আর তার উল্টোদিকে পুরোটা মিয়ানমার, চীন স্টেটের পাহাড় সারি।
চূড়া থেকে ফিরে আসার মধ্যপথে জুমঘরে ঘণ্টাখানেক বিশ্রাম নিতে চেয়েছিলাম। ত্রিপুরা জুম আর কির্স তং চূড়া দেখে দেখে লবণ-মরিচ মাখা কাঁচা ভুট্টার সিদ্ধ খেয়ে নিজের মনটা জুড়িয়ে নিয়েছি। সারা গায়ে রক্ত, শুকিয়ে গিয়েছিল আর চুলকানির ক্ষয়িষ্ণতা কমে আসতে থাকে। আকাশের কোনো এক পাশে হালকা রোদের আলো দেখা দিলে মেঘে আবার ঢেকে যায়। দলিয়ানপাড়ায় ফিরে আসার পথে রেমাইফা ঝিরিতে নিজের শরীর মনের শান্তিতে ভিজিয়ে নিয়েছি।