ইসমাইল মাহমুদ, মৌলভীবাজার
প্রকাশ : ৩০ অক্টোবর ২০২৪ ১৮:২৩ পিএম
চা শ্রমিকের সন্তান দৃষ্টিহীন হরিবল এসএসসি ও এইচএসসিতে পেয়েছেন গোল্ডেন জিপিএ-৫
জন্ম থেকেই দৃষ্টিহীন হতদরিদ্র চা শ্রমিকসন্তান হরিবল বোনার্জী। তবে লেখাপড়ার প্রতি অদম্য আগ্রহ আর মেধার কাছে পরাজিত হয়েছে তার দৃষ্টিহীনতা। হাজারো সীমাবদ্ধতা জয় করে শ্রুতিলেখকের সহায়তা নিয়ে তিনি চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষায় মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ থেকে মানবিক বিভাগে অংশ নিয়ে পেয়েছেন গোল্ডেন জিপিএ-৫। ২০২২ সালের এসএসসি পরীক্ষায়ও তিনি জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন। মেধাবী হরিবল বোনার্জী মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার সাতগাঁও ইউনিয়নের প্রত্যন্ত হুগলিছড়া চা বাগানের শ্রমিক অনিল বোনার্জী ও বিশোখা বোনার্জীর তিন সন্তানের মধ্যে একমাত্র পুত্রসন্তান। হরিবলের বড়বোন অঞ্জলি বোনার্জীর বিয়ে হয়েছে। আর সর্বকনিষ্ঠ বোন রুবি বোনার্জী ভাই হরিবলের সঙ্গেই এবারের এইচএসসিতে অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন।
প্রতিদিনের বাংলাদেশের সঙ্গে আলাপকালে জন্ম থেকেই দৃষ্টিহীন হরিবল বোনার্জী জানালেন তার কষ্ট আর সংগ্রামমুখর জীবনের কথা। তিনি বলেন, ‘আমার গল্পটা অনেক করুণ। ২০০৮ সালে আমার পরিবার আমাকে প্রাইমারিতে ভর্তি করে। সে সময় আমি পড়াশোনা যে করতে পারব তার নিশ্চয়তা ছিল না। ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে আমাকে ভর্তি করা হয়। ব্র্যাকে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের যে পদ্ধতি অর্থাৎ ব্রেইল পদ্ধতি ছিল না। সে কারণে ভর্তির পর তিন বছর আমি লেখাপড়া থেকে বঞ্চিত হই। ২০১২ সালে মূলত আমার আনুষ্ঠানিক পড়ালেখায় হাতেখড়ি হয়। ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত পিইসি (প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী) পরীক্ষায় জিপিএ ৪.৮৩ পেয়ে উত্তীর্ণ হই এবং সাধারণ বৃত্তি লাভ করি। তারপর ২০১৭ সালে মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হই। সেখান থেকে ২০১৯ সালে জেএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হই এবং ২০২২ সালে একই প্রতিষ্ঠান থেকে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হই। পরে আমি মৌলভীবাজার সরকারি কলেজে ভর্তি হই। আমার লেখাপড়াটা সম্পূর্ণই আমার ওপর নির্ভর ছিল। মানে আমরা যারা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী আমাদের পড়াশোনা করতে হয় ব্রেইল পদ্ধতিতে। আমাদের বইগুলো থাকে একটু ভিন্নরকম। এ ধরনের বই সরকার শুধু মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত ছাপায়। মাধ্যমিক-পরবর্তী পর্যায়ের বইগুলো সরকারিভাবে ছাপানো হয় না। যার কারণে আমরা উচ্চমাধ্যমিক পর্যায় থেকে সরকারিভাবে পড়াশোনার সুযোগটা পাই না। তবু আমি মৌলভীবাজার সমন্বিত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষাকার্যক্রমের আওতায় পড়াশোনা করি সমাজসেবা কার্যালয়ের মাধ্যমে। থাকা-খাওয়ার সুযোগ পাই ইন্টার লেভেলের জন্য। কলেজ জার্নি যখন শুরু হয় সে ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতা পাই আমি। তবে নবম-দশম লেভেলে ব্র্যাকের কর্মকর্তা শ্রদ্ধেয় লিমি আপা যিনি প্রতিবন্ধীদের নিয়ে কাজ করতেন এখন অবসরে আছেন, তিনি আমাকে সহযোগিতা না করলে হয়তো আমি এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেতাম না। তিনি আমাকে একটি স্মার্টফোন কিনে দেন। এ স্মার্টফোনে আমি আমার দৈনন্দিন পড়া রেকর্ড করে সে রেকর্ড বাজিয়ে মুখস্থ করতাম। এর পরও লিমি আপা আমাকে আরও নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন। এ ছাড়া আমাদের চা বাগানে শিশুদের পড়ালেখা করাতেন পাশের আমরাইলছড়া চা বাগানের বাসিন্দা শ্রদ্ধেয় শিক্ষক আপন দাস। তিনি আমাকে অনেক দূর থেকে এসে দীর্ঘদিন বিনা বেতনে প্রাইভেট পড়িয়েছেন। এ ছাড়া কলেজে ভর্তির সময় আপন দাস স্যার বিভিন্ন সংগঠনের মাধ্যমে আমাকে ভর্তি ফিসহ নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন। যখন ইন্টার লেভেলে পড়াশোনা শুরু করলাম তখন অনেক ধরনের বাধাবিপত্তিতে পড়তে হয়েছে। এ সময় আমি বই কিনে অন্য কারও সহযোগিতায় রেকর্ড করিয়ে ওই রেকর্ডটা শুনে শুনে পড়তে হতো। একজন শ্রুতিলেখকের সহায়তায় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের পরীক্ষায় বসতে হয়। শ্রুতিলেখকদের সহায়তা এ ক্ষেত্রে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সবার সহযোগিতায় এবং পরিশ্রম মিলিয়ে আমার এ রেজাল্ট।