ফারহাত মাইশা অর্পা
প্রকাশ : ২৭ অক্টোবর ২০২৪ ১৩:৫৮ পিএম
আপডেট : ২৭ অক্টোবর ২০২৪ ২২:০২ পিএম
প্রথম বাংলাদেশি নারী হিসেবে অংশ নিয়ে প্রথমবারের চেষ্টাতেই সফল হয়েছেন ফেরদৌসী আক্তার মারিয়া।
মালয়েশিয়ার লাংকাউইতে অনুষ্ঠিত হয়েছে কঠিনতম ট্রায়াথলন (সাঁতার, সাইক্লিং ও দৌড়ের সমন্বয়ে ক্রীড়া) আয়রনম্যানের দুই ফরম্যাটের প্রতিযোগিতা। এতে প্রথম বাংলাদেশি নারী হিসেবে অংশ নিয়ে প্রথমবারের চেষ্টাতেই সফল হয়েছেন ফেরদৌসী আক্তার মারিয়া। সফল এই আয়রন লেডিকে নিয়ে লিখেছেন ফারহাত মাইশা অর্পা
মালয়েশিয়ার লাংকাউইতে অনুষ্ঠিত হয়েছে কঠিনতম ট্রায়াথলন (সাঁতার, সাইক্লিং ও দৌড়ের সমন্বয়ে ক্রীড়া) আয়রনম্যানের দুই ফরম্যাটের প্রতিযোগিতা। এতে প্রথম বাংলাদেশি নারী হিসেবে অংশ নিয়েছেন ফেরদৌসী আক্তার মারিয়া। প্রথমবারের চেষ্টাতেই সফল হয়েছেন তিনি। আয়রনম্যান ৭০.৩–তে অংশ নিয়ে হয়েছেন দেশের প্রথম নারী ট্রায়াথলেট।
দেশের সবচেয়ে অভিজ্ঞ আয়রনম্যান মোহাম্মদ সামছুজ্জামান আরাফাতসহ চারজন আয়রনম্যান মালয়েশিয়ায় অংশ নিয়েছেন। অর্ধদূরত্বের অর্থাৎ আয়রনম্যান ৭০.৩–এ অংশ নিয়েছেন নয়জন বাংলাদেশি। এর মধ্যে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের এক নারীও রয়েছেন। নারী ট্রায়াথলেট ফেরদৌসী আক্তার মারিয়া তার প্রথম আয়রনম্যান ৭০.৩ প্রতিযোগিতা সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন। আয়রনম্যান প্রতিযোগিতার বৈশ্বিক আয়োজক ওয়ার্ল্ড ট্রায়াথলন করপোরেশন (ডব্লিউটিসি)। বছরজুড়ে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে আয়রনম্যান প্রতিযোগিতার আয়োজন করে থাকে তারা।
আয়রনম্যান প্রতিযোগিতায় ১৭ ঘণ্টায় প্রতিযোগীদের ৩ দশমিক ৮ কিলোমিটার সাঁতার, ১৮০ কিলোমিটার সাইক্লিং এবং ৪২ দশমিক ২ কিলোমিটার দূরত্বের দৌড় সম্পন্ন করতে হয়। ৭০.৩ হলো অর্ধদূরত্বের প্রতিযোগিতা। এতে সাড়ে ৮ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিযোগীদের ১.৯ কিলোমিটার সাঁতার, ৯০ কিলোমিটার সাইক্লিং ও ২১.১ কিলোমিটার দৌড় সম্পন্ন করতে হয়। আয়রনম্যান ট্র্যাকার অ্যাপ ও আয়রনম্যানের ওয়েবসাইট থেকে পাওয়া তথ্যানুসারে আয়রনম্যান মালয়েশিয়ায় এবার ৪৭৯ জন প্রতিযোগী অংশ নিয়েছেন। রংপুরের মেয়ে ফেরদৌসী আক্তার মারিয়া প্রথম বাংলাদেশি মেয়ে হিসেবে আয়রনম্যানের কোনো প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে সফল হয়েছেন। ৮ ঘণ্টা ১৮ মিনিট ২৬ সেকেন্ডে তিনি আয়রনম্যান ৭০.৩ মালয়েশিয়া সম্পন্ন করেন। ৯১ জন নারীর মধ্যে তার অবস্থান ৮৭তম। তিনি বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (বিকেএসপি) সাবেক শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, ‘আমার অনেক দিনের একটি স্বপ্ন আজ পূরণ হলো।’ এ প্রতিযোগিতায় সফল হওয়ায় মারিয়া আগামী বছর স্পেনে অনুষ্ঠেয় আয়রনম্যান ৭০.৩ বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছেন।
১৫ অক্টোবর ঢাকায় ফিরেছেন মারিয়া। তিনি বলেন, ‘বিমানবন্দরে পুলিশ কর্মকর্তাকে পদক ও ট্রফি দেখালাম, তিনি খুবই খুশি হলেন।’ এটা বলার কারণ আছে। প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে যাওয়ার সময় ৭ অক্টোবর মারিয়া বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন পার হচ্ছিলেন, তখন এ কর্মকর্তাই অনেকক্ষণ ধরে তাকে জেরা করেছিলেন। কারণ এটাই ছিল মারিয়ার প্রথম বিদেশযাত্রা।
প্রথম আরও কিছু আছে মারিয়ার ঝুলিতে। তিনি বলেন, ‘আমি জীবনে কখনও সমুদ্রই দেখিনি। সেই আমি এবার আয়রনম্যান ৭০.৩-তে এসে শুধু দেখলামই না, সমুদ্রে সাঁতার কাটতে হলো। আবার এর আগে কখনও পাহাড়ি পথে সাইকেল চালাইনি। লাংকাউইতে সেটাও প্রথমবারের মতো করলাম।’
মারিয়া বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিকেএসপির সাবেক ছাত্রী। ২০২৩ সালে এইচএসসি পাস করেন। কিন্তু এখনও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হননি। কেন? ‘আয়রনম্যান প্রতিযোগিতার জন্য। এটা আমার একটা স্বপ্ন ছিল। যেহেতু বাংলাদেশের কোনো মেয়ে এতে আগে অংশ নেননি। তাই আয়রনম্যান ৭০.৩ প্রতিযোগিতার প্রস্তুতির জন্য এ বছরটা বেছে নিয়েছি। ২০২৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হব।’
‘পেশাদার জিমের সরঞ্জাম বহন করার জন্য আমার কাছে অর্থ ছিল না এবং তাই আমি যা পেয়েছি তা দিয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছি- ভারোত্তোলনের জন্য ওয়াটার গ্যালন, গাইডেন্সের জন্য ইউটিউব টিউটোরিয়াল এবং বিকেএসপিতে আমি যে কৌশলগুলো শিখেছি,’ বলছিলেন ১৯ বছর বয়সি সফল এ নারী ট্রায়াথলেট। তার এ অর্জন শুধু ব্যক্তিগত কৃতিত্বের জন্যই বিশেষ নয়, বরং তিনি সামাজিক প্রতিবন্ধকতা কীভাবে ভেঙে দিয়েছেন, বিশেষ করে একটি রক্ষণশীল পরিবার থেকে আসা একজন তরুণী হিসেবে তা-ই যেন বড় প্রেরণা হয়ে থাকবে সবার জন্য। মারিয়ার গল্প শুরু হয় রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলায়, যেখানে অল্পবয়সি মেয়েদের কাছে খেলাধুলা ছিল না। ‘আমি যখন ক্লাস টুতে পড়ি তখন থেকেই ফুটবল খেলছি,’ মারিয়া বলেন। খেলাধুলার প্রতি তার ভালোবাসা ছিল। পরিবারের আপত্তি সত্ত্বেও বিকেএসপিতে ২০১৮ সালে ভর্তি হন মারিয়া।
যদিও তার পরিবার প্রাথমিকভাবে তার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল, বিশেষ করে তার চুল বালক স্টাইলে ছোট করার পরে। কিন্তু পরে পরিবার তার স্বপ্নকে সমর্থন করেছিল। কিন্তু চলার পথ ছিল না। মারিয়া তার এইচএসসি পরীক্ষা শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নিতে ঢাকায় চলে আসেন। তিনি তার ফিটনেস স্খলন লক্ষ করেছিলেন এবং জানতেন যে তাকে পরিবর্তন করতে হবে। একজন পরামর্শদাতার কাছ থেকে নির্দেশনা চেয়ে, তাকে ম্যারাথন দৌড় শুরু করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল, একটি পরামর্শ যা তার জীবন বদলে দেয়। মারিয়া এ বছর বঙ্গবন্ধু ম্যারাথনে তার প্রথম হাফ-ম্যারাথনে অংশ নিয়েছিলেন, ২১.১ কিলোমিটার দূরত্ব সম্পূর্ণ করে। ‘তার পর থেকে আমি ৯-১০ হাফ-ম্যারাথনে দৌড়েছি, তাদের ৭-৮টির মধ্যে শীর্ষ ৩-এ স্থান করে নিয়েছি,’ সে গর্ব করে বলে। যদিও তিনি দৌড়ে পারদর্শী হয়েছিলেন, ট্রায়াথলনের জগৎ তখনও মারিয়ার জন্য অজানা পৃথিবী ছিল।

তিনি জানতেন কীভাবে সাইকেল চালাতে হয়, তার ভাইবোনদের বাড়ি থেকে নামানোর দক্ষতা অর্জন করেছিলেন; কিন্তু সাঁতার কাটা সম্পূর্ণ আলাদা চ্যালেঞ্জ ছিল। ‘আমি আগে কখনও সমুদ্র দেখিনি এবং সাঁতার কাটতে পারতাম না,’ মারিয়া স্বীকার করেন। তা সত্ত্বেও তিনি আয়রনম্যান ৭০.৩ মালয়েশিয়ার জন্য নিবন্ধন করার সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। জীবন পরিবর্তনকারী ইভেন্টগুলোর একটি যাত্রা করলেন মারিয়া। প্রস্তুতির মাত্র কয়েক মাস পরে তিনি ক্রীড়া কর্মকর্তা ফেরদৌস আলম এবং প্রশিক্ষক মিজানুর রহমান ও তৌফিকের নির্দেশনায় সাঁতার শেখা শুরু করেন। ‘আমি শুধু গত মার্চে সাঁতারের পাট শুরু করেছি, কিন্তু আমি এটা আয়ত্ত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলাম,’ তিনি বলেন।
তার চাচাতো ভাই আকতারুল ইসলামও তাকে অনুপ্রাণিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। বিকেএসপিতে প্রশিক্ষক জয়া চাকমা বাধা সত্ত্বেও তাকে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করেছিলেন এবং সেই সঙ্গে মোহাম্মদ হেদায়তুল হাসান ফিলিপ, যিনি তাকে পাসপোর্ট পেতে সাহায্য করেছিলেন। তিনি বারাকা গ্রুপ, অ্যাক্টিভ প্লাস, আরিজ ফাউন্ডেশন এবং সাইকেল ৩৬৫ দ্বারা স্পনসর করেছিলেন, যা তাকে রেসের জন্য প্রয়োজনীয় সাইকেল সরবরাহ করেছিল। পুরো যাত্রাটি ছিল নিজের প্রতি ধৈর্য এবং বিশ্বাসের পরীক্ষা। এখন স্পেনের আয়রনম্যান ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ এবং থাইল্যান্ডে অলিম্পিক ট্রায়াথলন বাছাই পর্বের দিকে নজর রেখে মারিয়া আগের চেয়ে অনেক বেশি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। ১২ অক্টোবর মালয়েশিয়ার লাংকাউইতে অনুষ্ঠিত এ আসরে নিজের লক্ষ্য শেষ করে বয়সভিত্তিক ক্যাটাগরিতে (১৮-২৪) মারিয়া আছেন ২ নম্বরে, নারী ক্যাটাগরিতে ৮৭ আর মোট ৫৩৯ জন অংশগ্রহণকারীর মধ্যে আছেন ৫০৩ নম্বরে। মারিয়া বলেন, ‘আমার জন্য যেমন, আশা করি দেশের জন্যও এটা দারুণ একটি ঘটনা। মালয়েশিয়া আয়রনম্যান ৭০.৩ শেষ করতে পারার কারণেই আমি আরেকটি চমৎকার সুযোগ পেয়েছি। স্পেনে হতে যাওয়া আয়রনম্যান ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপের জন্য কোয়ালিফাই করেছি। সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন।’
‘আমি এগুলো সব করতে চাইÑ বাংলা চ্যানেল, ইংলিশ চ্যানেল সাঁতার, আয়রনম্যান এবং অলিম্পিক,’ তিনি বলেন, ‘যদি আমি যথেষ্ট স্পনসরশিপ পাই তবে সামনের পথ আমার জন্য সহজ হয়ে যাবে।’