সুমন্ত গুপ্ত
প্রকাশ : ২১ অক্টোবর ২০২৪ ১২:১২ পিএম
আমি আছি কলকাতা শহরের পথপ্রান্তরে। সঙ্গে আছে মা আর মামি। সেই সকালবেলা বের হয়েছি মামার সিঁথির মোড়ের বাসা থেকে। ঘুরে বেড়াচ্ছি নন্দনকানন থেকে প্রিন্সেপ ঘাট। ঘুরতে ঘুরতে আমরা চলে এলাম ৩ নং গৌরমোহন স্ট্রিটে স্বামী বিবেকানন্দের জন্মভিটায়। ১৮৬৩ সালের ১২ জানুয়ারি এই বাড়িতেই স্বামী বিবেকানন্দ জন্মগ্রহণ করেছিলেন। শৈশব ও প্রথম যৌবনে বিবেকানন্দ এই বাড়িতেই ছিলেন।
নরেন্দ্রনাথ দত্ত থেকে স্বামী বিবেকানন্দ হয়ে ওঠা যুবকের জীবনের গল্প কমবেশি সবাই জানেন। মহান এই বাঙালি যুগে যুগে আসমুদ্র হিমাচলকে জ্ঞানের চক্ষু খুলে জাগ্রত করে চলেছেন। বাঙালি জাতিকে বিশ্বের মঞ্চে সর্বপ্রথম তিনিই প্রতিষ্ঠিত করেন। শিকাগোর সেই ধর্মসভার গল্প সবাই জানেন। নিজের প্রতি বিশ্বাস রাখা, সমস্যায় বুক চিতিয়ে লড়া, সমাজের সবাইকে এক করে দেখার অনুপ্রেরণা এই মহান বাঙালির কাছ থেকেই পাওয়া। গত দিনও এসেছিলাম বেলা শেষে। তাই স্বামী বিবেকানন্দের জন্মভিটায় অবস্থিত মিউজিয়ামটি বন্ধ ছিল। তাই আজ আগেই এসে উপস্থিত আমরা।
এখনও মিউজিয়ামের প্রবেশদ্বার খুলেনি। তাই মিউজিয়ামের সামনে দাঁড়িয়েই ছবি তুলতে লাগলাম। ঠিক ১৩টা ৩০ মিনিটেই মিউজিয়ামের প্রবেশদ্বার খুলে দেওয়া হলো। প্রবেশদ্বারে ঢোকার পরই চোখে পড়ল বড় বড় অক্ষরে লেখা- ছবি তোলা নিষেধ। দেখেই মনটা খারাপ হয়ে গেল। এত সুন্দর জায়গায় এলাম কিন্তু ছবি তুলতে পারব না। পরে মনে মনে ভাবলাম, যাই হোক এই মহাপুরুষের জন্মভিটায় পা দেওয়াটাও ভাগ্যের ব্যাপার। যাই হোক আমরা পদব্রজে এগিয়ে চললাম। ঠাকুরবাড়ির প্রতিটি কক্ষে সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে স্বামী বিবেকানন্দের ব্যবহৃত দ্রব্যাদি।
এখানে কর্তৃপক্ষ শতভাগ চেষ্টা করেছে স্বামীজির শৈশবের স্মৃতিকে তুলে ধরার জন্য। দেখা পেলাম শিবমন্দিরের। কথিত আছে শিবের উপাসনা করতেন স্বামী বিবেকানন্দের জন্মদায়িনী মা ভুবনেশ্বরী দেবী। অন্যরকম পরিবেশ, চারপাশে ধূপকাঠির মহনীয় সুবাস। নেই কোনো কোলাহল। আমরা কিছু সময় বসে প্রার্থনা করে এগিয়ে চললাম সামনের দিকে। প্রতি স্থানে স্বামীজির স্মৃতি জীবন্ত রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। দেখা পেলাম দুর্গামন্দিরের। সেখানে প্রতি বছর দুর্গাপূজা হয়। আমাদের মতো অনেকেই এসেছেন এই তীর্থস্থান ঘুরে দেখার।
প্রতিটি দেয়ালে আছে স্বামীজির বাণীসংবলিত বোর্ড। দেখতে দেখতে কীভাবে যে সময় পার করে দিলাম টেরই পেলাম না। এবার বিদায় নেওয়ার পালা। আমরা ফিরে চললাম আমাদের পরবর্তী গন্তব্য পানে। বলে রাখা ভালো ১৮৮৪ সালে বিবেকানন্দের বাবা বিশ্বনাথ দত্তের মৃত্যুর পর এই বাড়িরই বাসিন্দা বিবেকানন্দের কাকিমা বাড়ির দখল নিতে চান। তিনি বিবেকানন্দের মা ভুবনেশ্বরী দেবী ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেন। নিম্ন আদালতে বিবেকানন্দের জয় হয়। কিন্তু মামলাটি পরে উচ্চ আদালতে ওঠে। হাইকোর্টে মামলাটি অনেক দিন চলেছিল। ১৯০২ সালে বিবেকানন্দের মৃত্যুর কিছুদিন আগে মামলাটির নিষ্পত্তি হয়। মামলার রায়ে বিবেকানন্দ তার পারিবারিক বাসস্থানের ওপর পূর্ণ অধিকার পেয়েছিলেন।
পরে এই বাড়িটি ভেঙে পড়েছিল। ১৯৬২ সালে রামকৃষ্ণ মিশন কর্তৃপক্ষ এটি অধিগ্রহণ করে সংগ্রহালয়ে পরিণত করার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৯৯ সালে মিশন জমির দখল নেয় এবং পাশের কিছুটা জমিও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সাহায্যে পান। প্রকল্প রূপায়ণের জন্য একটি কমিটি গঠিত হয়। কেন্দ্রীয় সরকার, রাজ্য সরকার ও জনসাধারণের দান থেকে এই কাজের জন্য কমিটি ১০ কোটি টাকা পায়। ২০০৪ সালে পুনর্গঠন কাজ শেষ হওয়ার পর এই বাড়িটির উদ্বোধন করা হয় ‘রামকৃষ্ণ মিশন স্বামী বিবেকানন্দ’স অ্যানসেসট্রাল হাউস অ্যান্ড কালচারাল সেন্টার’ হিসেবে। এটি একটি সংগ্রহালয় ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত পায়। এখন এই বাড়িতে সংগ্রহালয়, গবেষণাকেন্দ্র, স্মারক পূজাকক্ষ, গ্রন্থাগার, ইংরেজি শিক্ষাকেন্দ্র, কম্পিউটার শিক্ষাকেন্দ্র ও দাতব্য চিকিৎসাকেন্দ্র রয়েছে। নিয়মিত সেমিনার ও কনভেনশনও আয়োজিত হয়। স্বামী বিবেকানন্দের আধ্যাত্ম চিন্তা, বেদ, উপনিষদ সম্পর্কে তার বাণী নিয়ে চর্চা করতে এবং উনবিংশ শতকে বাংলার নবজাগরণের প্রেক্ষিতে তার গুরুত্ব এবং আজকের দিনে তার প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে অধ্যয়ন করতে দেশ-বিদেশের বহু গবেষক এখানে আসেন।
যাবেন কীভাবে
বিমান মাধ্যম : ৩ নং গৌরমোহন স্ট্রিটে অবস্থিত স্বামী বিবেকানন্দ জন্মভিটা যেতে বিমানবন্দরে নামার পর যে কেউ ট্যাক্সি অথবা অটো ভাড়া করে গৌরমোহন স্ট্রিটে পৌঁছতে পারেন। এছাড়া রেলওয়ে স্টেশন থেকে ট্যাক্সি অথবা বাসে চাপলে আপনাকে স্বামী বিবেকানন্দ জন্মভিটায় নামিয়ে দেবে। সড়ক পথে যেতে হলে সিএসটিসি, এসবিএসটিসি, ডব্লিউবিএসটিসি এবং সিটিসির যেকোনো একটি বাসে ৩ নং গৌরমোহন স্ট্রিটে অবস্থিত স্বামী বিবেকানন্দের জন্মভিটায় পৌঁছতে পারেন। মিউজিয়ামটির সাপ্তাহিক বন্ধ বার হলো সোমবার।