রম্য গল্প
শফিক হাসান
প্রকাশ : ১৯ অক্টোবর ২০২৪ ১৩:৪৪ পিএম
আপডেট : ১৯ অক্টোবর ২০২৪ ১৪:৩২ পিএম
কুরিয়ার সার্ভিসকে ছোটবেলায় ভাবতাম কোরিয়া থেকে আসা জিনিসপত্র বণ্টন। সেটা উত্তর-দক্ষিণ যেখান থেকেই হোক। বর্তমানে বহু কুরিয়ারের শরণাপন্ন হই সকালে-বিকালে। সকালে বউ তাড়া দিল- কোরিয়া থেকে নাকি তোমার কী সব আসবে! আঞ্চলিকতার দোষে দুষ্ট আমরা রাষ্ট্রটাকে ‘কুরিয়া’ উচ্চারণ করি। বউকে আশ্বস্ত করার আগেই বাজল কলিংবেল। ‘কুরিয়া’ থেকে কীভাবে মালামাল রিসিভ করতে হয়, হাতেকলমে শেখানোর জন্য বাহককে ভেতরে ডাকলাম। বউকে বললাম, ‘কই গো, একটা অটোগ্রাফ দিয়ে যাও!’
লোকটার হাতে কলম ছিল, ছুড়ে মারেনি সত্য তবে কথা ছুড়ল- ‘আপনি, এখানে!’
স্বাক্ষর ভুলে কুসুম কথার বাণ হানল, ‘আমার বাসায় আমি না থাকলে কে থাকবে!’
কথাটা সত্য। লোকটা রিসিভ কপি হস্তগত করে নিষ্ক্রান্ত হলো। ভাগ্য ভালো, প্রশ্নটা আমাকে করেনি। তাহলে টাকার অভাবে যে ভালো বাসাটায় থাকতে পারলাম না, বাধ্য হয়ে কবুতরের খাঁচাটায় ঢুকেছি- বলতে পারতাম না। এটাও বলা অশোভন, দশ-বিশ টাকা বকশিশ অনেকেই দেয়, সেটাও কেন লোকটাকে দিতে পারলাম না!
কিছুক্ষণ পর নিজেও নিষ্ক্রান্ত হলাম। বাসায় সব ধারা-উপধারাই চলমান। সিগারেট টানা যায় না। হেঁটে আসার ছলে মোড়ে গিয়ে সুখটানটা দিয়ে আসতে হয়। কুরিয়ারকর্মী সেখানে বিড়ি টানছিল আগে থেকেই। আমাকে দেখে শশব্যস্ত হয়ে উঠল। অভয় দিয়ে বললাম, ‘বসুন তো ভাই।’
দুটো সিগারেট নিলাম। সিগারেটে-সিগারেটে ঠোকাঠুকি করে কেন ‘চিয়ার্স’ বলা যায় না! ধোঁয়ার সঙ্গে কিছু চিন্তা উগরে দিয়ে তিনি বললেন, ‘কুসুম ম্যাডাম তো আপনার স্ত্রী?’
দীর্ঘশ্বাসটা গোপন করেই বললাম, ‘নামটাও জানেন! জি, আমিই কুসুমের আশ্রয়ে থাকা সেই কীট।’
‘কপাল ভালো, আমি বাঁইচা গেছি!’
নজরুল মিয়া জানালেন বহু বছর আগে পাত্রী হিসেবে কুসুমকে দেখতে গিয়েছিলেন। পরে খোঁজখবর নিয়ে পিছিয়ে এসেছেন। ওই বাড়ির মেয়েরা নাকি ‘পরখাউয়া’ স্বভাবের। উঠতে-বসতে তুলনা করে অন্য সফল স্বামীদের সঙ্গে নিজের স্বামীর। অক্ষমতার অস্ত্র হেনে বেচারাদের জীবন বরবটির মতো ঋজু বানিয়ে ছাড়ে।
কাষ্ঠ হেসে বললাম, ‘এমন বদভ্যাস সব বাড়ির মেয়েরই আছে। এটা জাতীয় সমস্যা।’
‘না, ভাই। ওই বাড়িতে এইডা বেশি।’
‘এরপর কোন বাড়িতে বিয়ে করলেন?’
‘মিজিবাড়িতে। ওই বউডাও জুইতের না!’
‘বউ কোনো দিন জুতসই হয় না, সাপ কখনও চুমু দেয় না। আফসোস না করে সংসার করেন!’
দীর্ঘশ্বাস ফেলে হতভাগ্য বলল, ‘সংসার মানেই ভেজাল। কঠিন জালডা আমরা ছিঁড়বার পারি না। তবু ভালা, বড় বিপদ থিকা রক্ষা পাইছি।’
‘আপনি বাঁচলেন মিয়া আমারে মারার জন্যই!’
‘চিন্তা লইয়েন না। জীবন আর কয়দিনের! লাতি-গুঁতা খাইতে খাইতে, তুলনা শুনতে শুনতেই কাইটা যাইব।’
নজরুলের আগে আরেকজনের ‘না-হওয়া’ স্বামীর সন্ধান পেয়েছিলাম। সে এখন মাছ ফেরি করে বেড়ায়। অথচ কুসুম আমাকে প্রায়ই খোঁটা দেয় তার জীবনটা নষ্ট করে ফেলেছি বলে। আমি কেন ওদের এত বড় বংশে ভিক্ষুকের মতো হাত পেরে দাঁড়িয়েছিলাম। কাউকে এখন পরিচয় দিতে পারে না। ভালো সম্বন্ধগুলো ভেস্তে গেছে। কপাল পুড়ল এ অল্প বেতনের কেরানির ঘরে এসে! ‘ভেগে যাওয়া বড় মাছগুলো’র ফিরিস্তি দেয় সময় পেলেই। অনার্সে পড়ার সময় একজন পাণিপ্রার্থী বাসি মিষ্টি এনেছিল, অন্যজন দর্শনি-নজরানা দিয়েছিল জাল নোটে, আরেকজন এসেছিল ইস্তিরিহীন শার্ট পরে! সুনির্দিষ্ট কারণেই প্রচুর সম্বন্ধ ভেঙে দিতে হয়েছিল!
চুকচুক করে সান্ত্বনাবাণী শুনিয়ে নজরুল বিদায় নেয়। বাসায় ফিরলে কুসুম বলে, ‘ছুটির দিনেও আমাকে কোথাও বেড়াতে নিতে মন চায় না! আমাদের বড়বাড়ির মেয়েরা একেক সপ্তাহ নতুন এলাকায় স্বস্বামীক বেড়াতে যায়! শাড়ি-গহনা কেনে।’
কুসুম-বউয়ের জন্যও তেমন জামাই-ই দরকার ছিল! অন্তত নজরুল কিংবা মেছোর মতো, যারা কি না কাজের সুবাদে প্রচুর ‘ভ্রমণের’ সুযোগ পায়! আহা, অভাগা আমাকেও যদি পার্সেল করে নতুন কোনো স্বস্তির জায়গায় পাঠিয়ে দিতে পারত কোনো কোম্পানি...।