হাসনাত মোবারক
প্রকাশ : ১৯ অক্টোবর ২০২৪ ১৩:২৭ পিএম
আপডেট : ১৯ অক্টোবর ২০২৪ ১৪:৩১ পিএম
ছবি : নাসির খান সৈকত
দেয়ালে ঝুলছে কণ্ঠহার, কানপাশা, কানের দুল, চুড়ি, বাউটি, হাঁসুলি, গলার হার, বাজুবন্দ, রতনচূড়, সীতাপাট, নোলক, নথ, নাকছাবিসহ শোভাবর্ধনের নানান গয়না। আরেকটি ফ্রেমে বাঁধানো প্রজাপতির মালা। এ অলংকারটি একটু দূর থেকে দেখলে মনে হবে একঝাঁক প্রজাপতি যেন উড়ে আসছে। এ রকম ৭০টির অধিক নজরকাড়া নকশার গয়না প্রদর্শন করা হয়েছে রাজধানীর লালমাটিয়ার ডি ব্লকের ১/১-এর দ্বীপ গ্যালারিতে। শুধু কি গয়না! এখানে প্রবেশ করতেই মনে হবে ভুল করে বুঝি সোনারুদের কোনো ডেরায় এসে পড়েছি।
এটি গয়না তৈরির কারিগরদের জায়গা না হলেও পুরান ঢাকার তাঁতী বাজারের স্বর্ণকারদের কাজ এবং তাদের জীবনযাপন তুলে ধরার উদ্দেশ্যে এ আয়োজন। যার শিরোনাম ‘স্যাকরার তাঁতী বাজার’।

গ্যালারির মেঝেতে পাতা সারি সারি ক্যাশবাক্স। ওপরে ঝুলছে দুটি ইলেকট্রিক বাতি। পাশেই টুলের ওপর গ্রাহকের জন্য রাখা একটি খাতা এবং পান-সুপারির ডালা। পুরো গ্যালারির দেয়ালে ও মেঝেতে থরে থরে সাজানো গয়না তৈরির নানান উপকরণ। যেমন ধাতব কাটা এবং জোড়া লাগানো ও নকশা করার উপকরণ। পাশে পড়ে আছে হাতে আঁকা আরেকটি গয়নার নকশা করা কাগজ। আরেক পাশে বসানো গয়না রাখার সিন্দুক, হাপর, কয়লা, গ্যাস সিলিন্ডার এবং চুড়ি মাপার বলনা। আছে কয়েকটি আদি নকশার বই। ঘরজুড়ে আগরবাতির গন্ধ ছড়াচ্ছে। বিরাজ করছে গয়না তৈরির আবহ।
গ্যালারিতে অবশ্য স্যাকরা বা কারিগরদের গয়নাগাটি বানানোর ব্যবস্থা নেই। তবে তাঁতী বাজারের স্যাকরাদের গয়না বানানোর অবিকল দৃশ্য তুলে ধরতে প্রায় ২৫০টি ছবি দেয়ালে টানানো হয়েছে। নাসির খান সৈকত এবং নারী উদ্যোক্তা তাহমীনা শৈলীর আলোকচিত্রে উপস্থাপন করা হয়েছে তাঁতী বাজারের গয়নাপট্টি। এ উদ্যোক্তা প্রায় এক যুগ ধরে কাজ করছেন এখানকার কারিগদের নিয়ে। কাছ থেকে দেখেছেন তাদের জীবনযাপন। কিউরেটর শৈলী গ্যালারিতে ঝুলে থাকা ব্যস্ত এক পরিচ্ছন্নতা কর্মীর ছবি দেখিয়ে বলেন, ‘এখানকার প্রতিটি গলিতে রয়েছেন আলাদা পরিচ্ছন্নতা কর্মী। স্বর্ণকারদের পেশার সঙ্গে এ মানুষগুলোর জীবিকাও জড়িত। কেননা এখানকার ঝাড়ু দেওয়া ধুলোও বিক্রি হয়। ধুলো এবং পোড়া কয়লাতেও মেলে সোনাদানা।’

জানা গেল, তাঁতী বাজারের সোনা ও রুপার অলংকার তৈরির পরিমাণ কমে যাওয়ায় অনেক পরিচ্ছন্নতা কর্মীই পেশা বদল করেছেন। তাঁতী বাজার বলতে রাস্তার পাশ দিয়ে বয়ে চলে খোলা নর্দমা, অল্প বৃষ্টিতে যেখানে পানি জমে। পলেস্তারা খসে পড়া শত বছরের পুরাতন কোনো বাড়ির নিচতলায় বসে কাজ করছেন কোনো স্যাকরা। আলোকচিত্রে সেসব দৃশ্যই তুলে ধরা হয়েছে। শতাব্দীপ্রাচীন স্যাকরাপট্টি ঘিরে নানান পেশা-শ্রেণির মানুষের জীব্কিা নির্ভর করে সেটিও বিভিন্ন ছবিতে দেখা গেল। বড় বড় দোকানদাররা এখান থেকে গয়না কিনে নিয়ে যান। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে এখানকার মানুষের ব্যস্ততা। স্যাকরাপট্টির এ কারিগররা যেন একান্নবর্তী পরিবারের সদস্য। সেটিও আলোকচিত্রে তুলে ধরা হয়েছে। কেননা একটি গয়না ব্যবহারোপযোগী করে তুলতে পেরোতে হয় কয়েকটি ধাপ। থাকে কয়েকজনের হাতের ছোঁয়া। গয়নাশিল্পীদের মধ্যে কেউ নকশা আঁকছেন, পাশেরজন রঙ করছেন। অন্যজন মিনা করছেন। আরেকজন করছেন কাটাই এবং গিলা।

গয়নাপট্টির কারিগরদের ব্যস্ততা ফুটে উঠেছে এ ছবিগুলোয়। আরেকটি ছবিতে দেখা গেল গয়না বন্ধকির একটি দোকান। দেশের প্রতিটি গয়নাপট্টিতে চলে এ ব্যবসা। টাকার বিনিময়ে এ ব্যবসায়ীদের কাছে অলংকার গচ্ছিত রাখা কত নারীর শখ। টাকা ফেরত না দিতে পারায় যুগের পর যুগ বন্ধকি দোকানেই থেকে যায় তাদের সাধের গয়না। গ্যালারি ছবি দেখা শেষে কৌতূহলবশত আয়োজকদের কাছ জানতে চাইÑ এখানে কোনো নারী স্যাকরার ছবি তো নেই। জানা গেল, তাঁতী বাজারে কোনো নারী স্বর্ণকার নেই। প্রদর্শনীতে স্থান পাওয়া প্রতিটিই ছবি যেন এক একটি গল্প। যাদের গল্প তুলে ধরতে এ আয়োজন। তারাও গ্যালারিতে এসে ঘুরে দেখছেন। তাঁতী বাজারে প্রায় ছয় দশক ধরে কাজ করছেন প্রবীণ গয়নাশিল্পী নাজিম আহমদ। এ গয়নাশিল্পীর সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, ‘পরম্পরায় তাঁতী বাজারের কারিগররা যে মনোযোগ, ভালোবাসা আর পরিশ্রম দিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন, তা এ প্রদর্শনীর মাধ্যমে সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে।’ এ শিল্পীর জীবনের গল্প জানা গেল। তিনি জীবিকার সন্ধানে দেশের বাইরে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে তার মন টেকেনি। বিদেশে কাজ করার সময় তার কানে বাজত হাতুড়ির ঠুকঠাক শব্দ আর তাঁতী বাজারের মানুষের গমগম আওয়াজ। পরে তিনি দেশে ফিরে ভালোবাসার জায়গায় কাজ করে চলেছেন।

গ্যালারিতে ঘুরে ঘুরে গয়না দেখছেন ষাটোর্ধ্ব কাওসার শিরীন। তিনি ‘প্রেমফাঁস’ নামে গলার চেইন দেখে আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠেন। এ দর্শনার্থী জানান, তিনিও বিয়ের পর এ গয়না ব্যবহার করতেন। এ মালার গল্প তার স্মৃতি থেকে জানানÑ আশির দশকে নারীদের ভাবনায় ছিল, গলায় এ চেইন পরলে স্বামীও নাকি তার প্রেমের ফাঁদে আটকা পড়বে। এমন তথ্য রটে গেলে নারীদের কাছে খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠে সোনার চেইনে প্যাঁচানো নকশা তোলা এ অলংকারটি। এ অলংকার নিয়ে হয়তো কাওসার শিরীনের মতো আরও কত নারীর শখের গল্পই না জমা আছে! এ প্রেমফাঁস মালা গলায় দিয়ে আদৌ কাউকে ফাঁসানো যায় কি না সে তর্ক থাক। তবে এ মালার প্রেমে পড়েছেন অনেক বাঙালি নারী। দ্বীপ গ্যালারিতে আয়োজিত এ প্রদর্শনী নিয়ে কথা হয় গ্যালারির প্রধান সমন্বয়ক শিল্পী মনন মোর্শেদের সঙ্গে। এ শিল্পী জানান, ‘আমাদের দেশের হাতে বানানো গয়না তৈরির ইতিহাসে পুরান ঢাকার তাঁতী বাজারের স্যাকরাদের আলাদা একটা কদর ও ঐতিহ্য রয়েছে। যেখানে বসে তারা কাজ করেন, সেখানকার পুরাতন দেয়াল, কারিগরদের কাজ করার ঠুকঠাক শব্দ। ধূপের গন্ধ। সেই পরিবেশটি মূলত গ্যালারিতে তুলে ধরা হয়েছে।’ এ আয়োজনের উদ্দেশ্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে স্যাকরার সংখ্যা ক্রমেই কমে যাচ্ছে। বাজার দখল করে নিয়েছে অত্যাধুনিক মেশিনে তৈরির গয়না। কিন্তু হাতে তৈরি অলংকারের যে আলাদা বৈশিষ্ট্য রয়েছে, দর্শনার্থীদের কাছে তা তুলে ধরতে এ আয়োজন।’
কথা হয় কিউরেটর শৈলীর সঙ্গে। তিনি জানান, এটি শুধু গয়নার নকশার নয়, তাঁতী বাজার তথা দেশের এ শিল্পের সব কারিগরের জীবনের গল্প, তাদের কঠিন পরিশ্রমের খণ্ডচিত্র। তিনি আরও বলেন, ‘স্যাকরারদের কাজের প্রতি এটি শ্রদ্ধানিবেদনের একটি মাধ্যম। আমাদের গয়নাশিল্পীদের কাজ বিশ্বায়নের যুগে যেন টিকে থাকতে পারে, সেজন্য জনমানুষের আগ্রহ সৃষ্টি করার লক্ষ্যে এ আয়োজন।’
১০ অক্টোবর শুরু হওয়া এ প্রদর্শনীতে স্যাকরাদের দৈনন্দিন জীবনের আনন্দ-বেদনা, তাঁতী বাজারের ঐতিহ্যবাহী খাবারদাবার, শিল্পের বহুমাত্রিক উপাদান এবং পারিপার্শ্বিক নানা অনালোচিত বিষয়ের ওপর দৃষ্টি ফেলা হয়েছে। তুলে আনা হয়েছে তাদের অজানা জীবনসংগ্রাম, ঐতিহ্যবাহী শিল্প এবং তাঁতী বাজারের গয়নাবাজারের পরিবর্তনের চিত্র। ‘স্যাকরার তাঁতী বাজার’ প্রদর্শনীটি দর্শকসমাদৃত হচ্ছে বলে জানান আয়োজকরা। তাঁতী বাজারের এ গল্পটি আমাদের ঐতিহ্যের সঙ্গে আরও বেশি সংযুক্ত করবে। সৃজনশীল এ উপস্থাপনা এবং সুনিপুণ কারুকাজে বানানো গয়না দেখে দর্শনার্থীরা একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে ফিরে যাচ্ছেন। কেউ কেউ পছন্দের গয়না কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। এ প্রদর্শনী প্রতিদিন বিকাল ৪টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত। চলবে ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত।