মুহাম্মদ শফিকুর রহমান
প্রকাশ : ১৯ অক্টোবর ২০২৪ ১৩:২২ পিএম
বন্য প্রাণীর স্বজন শ্রীবাস নাথ
পরিবেশ, প্রকৃতি,
প্রাণীদের প্রতি তার একবুক মায়া। তার ভাবনা থেকে তিনি মনপ্রাণ উজাড় করে বন্য প্রাণী
রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছেন। এ পর্যন্ত সাপ, পাখি, মেছোবিড়ালসহ শতাধিক প্রাণী উদ্ধার করে
বনে অবমুক্ত করেছেন। সেবাযত্ন করে অসুস্থ প্রাণী সুস্থ করে তুলেছেন। বন্য প্রাণীপ্রেমী
এ মানুষটির নাম শ্রীবাস নাথ। গ্রামের বাড়ি সুনামগঞ্জে হলেও জীবিকার তাগিদে থাকেন সিলেটে।
ছোটবেলায় সাপ
নিয়ে তার ভীতি ছিল। কিন্তু ন্যাশনাল জিওগ্রাফির ‘স্নেক অব দ্য সিটি’র অনুষ্ঠান দেখে
সাপের প্রতি তার আগ্রহ বেড়ে যায়। এরপর ইউটিউবে বংকিম স্নেক সেভার, সমিরন বারিক, মির্জা
আরিফ, বাপি দা, ডব্লিউএফসি নেটওয়ার্ক, গুড্ডে মুরিয়া, মুরলেওয়ালে হুসলা এদের ভিডিও
দেখে সিদ্ধান্ত নেন সাপ রেসকিউ করার। যদিও সাপ প্রকৃতি, পরিবেশের জন্য কতটা উপকারী
তা আরও পরে বুঝতে পারেন। শ্রীবাস নাথের আগ্রহ দেখে পাশে দাঁড়ান‘স্নেক রেসকিউ টিম বাংলাদেশ’-এর
প্রতিষ্ঠাতা সিদ্দিকুর রহমান রাব্বি ও জুবাইদুর রহমান মেহেদী। তারা সিলেটে এসে শ্রীবাস
নাথকে প্রশিক্ষণ দেন। ২০২১ সালে শ্রীবাস নাথ স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে স্নেক রেসকিউ টিম
বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত হন। সিলেটের মিরাবাজার থেকে একটি ময়াল অজগর উদ্বারের মাধ্যমে
সাপ রেসকিউ শুরু তার। এরপর ১০০-এর কাছাকাছি সাপ রেসকিউ করেছেন শ্রীবাস নাথ। শুধু সাপ
নয়, শ্রীবাস নাথ বিভিন্ন পাখি, বনবিড়াল, মেছোবিড়ালসহ অন্যান্য বন্য প্রাণী ২০টির বেশি
উদ্বার করেছেন। অনেক সময় রেসকিউ করা প্রাণী মানুষের আঘাতের কারণে অসুস্থ থাকে। শ্রীবাস
নাথ তাদের পরম সেবাযত্ন, চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করে তোলেন। এ রকই জানা গেল তার কাছে। গত
বছর সিলেটের লাক্কাতুরা এলাকায় একটি শঙ্খিনী আহত অবস্থায় উদ্বার করেন। পরে তিনি এবং
অ্যানিমেল কিপার মাসুদ হাওলাদার সাপটি চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করে তুলে বনে ছেড়ে দেন। আমাদের
সমাজে এমন অনেকেই আছেন, যারা সাপ রেসকিউ ভালো চোখে দেখেন না। শ্রীবাস নাথ এসব কাজে
মানুষের বাজে কথাও শুনেছেন। তবে একদমই পাত্তা দেননি।
প্রাণপ্রকৃতি,
প্রাণী রক্ষার লড়াইয়ে শ্রীবাস নাথ কিছু সতর্কতা অবলম্বন করেন। কারণ সাপ বিপজ্জনক প্রাণী।
তিনি রেসকিউ করার সময় গ্লাভস, স্টিক, গামবুট অথবা কেডস্ পরেন। চাকরি করার কারণে সিলেটের
বাইরে রেসকিউ করতে যাওয়ার সুযোগ তার কম হয়। তিনি সিলেটের সুনামগঞ্জ, কোম্পানীগঞ্জ,
জৈন্তাপুর, মৌলভীবাজারে গিয়ে সাপ উদ্ধার করেছেন। রেসকিউ করতে গিয়ে নানা অভিজ্ঞতার সম্মুখীন
হন শ্রীবাস। একবার খবর পেলেন, সিলেটের শাহপরান এলাকায় একটি অজগর বাড়ির পাশে গাছে অবস্থান
নিয়ে আছে। গাছটি বেশ উঁচু। মই দিয়ে উঠে মাথায় হেলমেট পরে শ্রীবাস সাপটির মুখোমুখি হন।
প্রায় ২০ মিনিট চেষ্টার পর সাপটি উদ্ধার করতে সক্ষম হন। এদিকে নিচে হাজারো উৎসুক মানুষ
অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষায় ছিল। পরে তারা জোরে হাততালি দিয়ে শ্রীবাস নাথকে অভিনন্দন
জানায়। এ ঘটনা আজও ভুলতে পারেননি তিনি।
রেসকিউ অভিযানে
গেলে খরচপাতি হয়। কিন্তু কারও কাছ থেকে একটি টাকাও নেন না শ্রীবাস নাথ। উল্টো তাদের
ওয়াদা করিয়ে আসেন তারা যেন মাত্র দুটি হলেও ফলের গাছ লাগান। একটি প্রাণীর সুরক্ষায়
ন্যূনতম অবদান রাখতে পারলে শ্রীবাস নাথ আনন্দ অনুভব করেন। তবে একবার তাজগাঁও ডিগ্রি
কলেজে একটি তামাটেমাথা দুধরাজ উদ্বার করেন। তখন ওই কলেজের প্রিন্সিপাল খুশি হয়ে ৫০০
টাকা আর বই উপহার দেন; যা শ্রীবাস নাথের খুব ভালো লেগেছিল।
যারা সাপ রেসকিউ
করার কাজে একদম নতুন তাদের জন্য শ্রীবাস নাথের পরামর্শÑ নিজের সুরক্ষা নিশ্চিত করে
কাজ করবেন। নিজে সুস্থ থাকলে হাজারো বন্য প্রাণীর জীবন রক্ষা করা সম্ভব হতে পারে।
বন্য প্রাণীর
জন্য জীবনভর নিবেদিতভাবে কাজ করে যাবেন শ্রীবাস নাথ। তার ইচ্ছা মানুষকে আরও পরিবেশ,
প্রকৃতি, প্রাণী সুরক্ষায় সচেতন করবেন। সাপের দংশনের শিকার হলে একটুও দেরি না করে চিকিৎসাকেন্দ্রে
যেতে হবে। ওঝা, কবিরাজের কাছে নয়। ভবিষ্যতে এসব বিষয় নিয়ে তিনি আরও কাজ করতে চান।