মাসুদ হোসেন
প্রকাশ : ১৬ অক্টোবর ২০২৪ ১৫:০৭ পিএম
শিক্ষিত হয়ে ঘরে বসেও যে একজন নারী স্বাবলম্বী হতে পারেন, তার উদাহরণ সাবিকা
উচ্চশিক্ষা নিয়েও অনেক নারী চাকরি করার ফুরসত পান না। পড়াশোনা শেষ করে তারা সংসার সামলান। কিছু নারী আছেন যারা অদম্য। স্বামী, সংসার, সন্তানদের দেখভাল করেও ঘরে বসেই স্বাবলম্বী হতে চান। এদেরই একজন মাহমুদা ইয়াসমিন সাবিকা। যিনি ঘরে তৈরি করা খাবার অনলাইনে বিক্রি করে স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছেন।
বগুড়া সদর উপজেলার দত্তবাড়ী এলাকার মেয়ে মাহমুদা ইয়াসমিন সাবিকা। দুই ভাই-বোনের মধ্যে ছোট সাবিকা ২০১৩ সালে এসএসসি পাস করেন নিজ এলাকার কাটনার সেন্ট্রাল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে। পড়াশোনার এক পর্যায়ে অনার্স তৃতীয় বর্ষে থাকাকালে ২০১৮ সালে পছন্দের এক বেকার ছেলের সঙ্গে বিয়ে হয়। কর্মহীন ছেলেকে বিয়ে করায় মেনে নেয়নি পরিবার। স্বামীর বেকারত্ব আর সাংসারিক খরচ মেটাতে না পেরে দুশ্চিন্তায় পড়েন তিনি। একদিন শখের বসে খাবারের ওপর প্রশিক্ষণ নিয়ে ব্যবসা করার ইচ্ছে জাগে তার। বিভিন্ন ফেসবুক গ্রুপে খাবারের প্রচার শুরু করে দেন সাবিকা। হঠাৎ একদিন সবজি শিঙ্গাড়ার অর্ডার পান। মায়ের কাছ থেকে ধার নেওয়া ৪০০ টাকা দিয়ে শুরু করেন শিঙ্গাড়া তৈরির কাজ। দ্রুত সময়ে খাবার ডেলিভারি দিয়ে প্রশংসিতও হন।
২০১৯ সালে ব্যবসা শুরু করার কয়েক মাস পরই সারা বিশ্বের মতো আমাদের দেশেও নেমে আসে মহামারি করোনাভাইরাস। সাবিকার এ ব্যবসার প্রচার যখন বগুড়বাসীর কাছে পৌঁছাতে থাকে তখন পরিবার, আত্মীয়স্বজনসহ প্রতিবেশীরা বিষয়টি ভিন্ন চোখে দেখত। স্বামীর অনুপ্রেরণায় ঘরবন্দি সময়ে দুজনে মিলে ব্যবসার পরিধি বাড়াতে থাকেন। সাবিকার ব্যবসার লভ্যাংশ দিয়ে চলতে থাকে তাদের সংসার।
খাবারের ওপর টিএমএসএস থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে শুরু করা শখের ব্যবসার জন্য প্রথমে ৯ হাজার ও পরে ৫০ হাজার টাকা সরকারি অনুদান পান এ নারী উদ্যোক্তা। ক্রমান্বয়ে তার ব্যবসার এমন সফলতায় পরিবারসহ সবাই খুশি। এর মধ্যে বগুড়া আজিজুল হক কলেজ থেকে সমাজকর্মের ওপর মাস্টার্স পাস করেন সাবিকা। sabika's food Shop নামে প্রায় ৫ হাজার ফলোয়ারের ফেসবুক পেজে চলে তার ব্যবসার চাকা। দেশি খাবার, পোলাও, বিরিয়ানি, খিচুড়ি প্যাকেজ, বিভিন্ন স্ন্যাকস আইটেম, ডেজার্ট আইটেম, শীতের পিঠা, গরুর মাংসের আচারসহ প্রায় ৩০ ধরনের খাবার নিয়ে কাজ করছেন সাবিকা। ব্যবসায় নিয়োজিত আছেন ছয় জন সহযোগী। শূন্য থেকে উঠে আসা শিক্ষিত এ নারী উদ্যোক্তা এখন প্রতি মাসে আয় করছেন প্রায় পঞ্চাশ হাজার টাকা। বিভিন্ন মেলায় অংশগ্রহণ করে অর্জন করেছেন সম্মাননা। মেয়ের এমন সাফল্যে গর্বিত বাবা নাসিমুল গনি। মেনে নিয়েছেন তাদের বিয়ে।
সাবিকা বলেন, ‘সামাজিকভাবে প্রথম পর্যায়ে নারী হয়ে এমন কাজ কখনও ভালো চোখে দেখেনি কেউ। কিন্তু বর্তমানে পারিবারিক সব বাধা পেরিয়ে সামাজিকভাবেও অনেক সম্মান পাচ্ছি।’ তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন সামাজিক ক্ষেত্রে সফল নারী উদ্যোক্তা হিসেবে আমি স্বীকৃতি পেয়েছি। পরিবারে এখন আমার সম্মান এবং মূল্যায়ন অনেক বেশি যা অন্য ১০ জন সাধারণ নারী পান না। ’
সাবিকা বলেন, ‘ব্যবসাটা শুরু করি মাত্র ৪০০ টাকা দিয়ে। অথচ গত ছয় বছরে এত ভালো বিক্রি হবে তা ভাবিনি। শুরু করেছিলাম শখের বশেই। নিজ হাতে রান্না করে প্রথম উপার্জন ছিল সামান্য। সেই সামান্য উপার্জন আমার কাছে অনেক বড় পাওয়া। আগে বাবার পরিচয়ে বড় হয়েছি, এখন নিজের পরিচয়ে সমাজে আরও বড় হতে চাই।
এ নারী উদ্যোক্তা আরও বলেন, ‘অনেকের ইচ্ছা থাকে পড়াশোনা শেষে চাকরি করবে কিন্তু আমার কখনও এ ইচ্ছা জাগেনি। ব্যবসা শুরুর পর আর কখনও চাকরির দিকে তাকাতে হয়নি। ঘরে বসেও যে একজন নারী ভালো আয় এবং সব ধরনের প্রয়োজন পূরণ করতে পারে তার উদাহরণ আমি নিজেই।’