× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পারিবারিক সহিংসতা

নারীর জন্য প্রতিটি ঘর নিরাপদ হোক

আব্দুল্লাহ আল মামুন

প্রকাশ : ০৯ অক্টোবর ২০২৪ ১৪:০৬ পিএম

আপডেট : ০৯ অক্টোবর ২০২৪ ১৮:১৪ পিএম

নারীর জন্য প্রতিটি ঘর নিরাপদ হোক

দুই সন্তানের জননী নূরজাহান বেগম, বয়স ৩০। বিয়ের পর থেকেই স্বামীর পরিবার ৫ লাখ টাকা যৌতুকের জন্য চাপ দিচ্ছিল। এ নিয়ে দুই পরিবারের মধ্যে বেশ কয়েকবার বৈঠকও হয়। গত ১৯ জুন নূরজাহানের শরীরে আগুন দেয় স্বামী ও তার পরিবারের সদস্যরা। আগুনে তার শরীরের বিভিন্ন জায়গা পুড়ে গেছে। এ ছাড়া শরীরের বিভিন্ন জায়গায় খুন্তির ছ্যাঁকার দাগও রয়েছে। কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার শিমপুর গ্রামে ঘটে এ ঘটনা। নূরজাহানকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ ঘটনায় স্বামী খোরশেদ আলমসহ শ্বশুরবাড়ির ছয় সদস্যের বিরুদ্ধে নির্যাতন ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে মামলা করেন নূরজাহানের বাবা জয়নাল আবেদীন। সংবাদমাধ্যমে তিনি বলেন, ‘শ্বশুরবাড়ির লোকজন যৌতুকের জন্য দীর্ঘদিন ধরে আমার মেয়েকে হুমকি দিয়ে আসছিল। আমি এর আগে কয়েকবার তাদের সঙ্গে বসে বিষয়টি সমাধান করি। কিন্তু তারা এ সমাধান না মেনে আমার মেয়েকে আগুনে পুড়িয়ে আহত করল।’

বগুড়া শহরের জামিলনগরের বাসিন্দা পাখি আক্তার সম্পা (২৮)। রুনু প্রামাণিকের সঙ্গে বিয়ের পর জানতে পারেন এটি স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ে। বিয়ের পর থেকেই বিভিন্ন বিষয়ে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন সম্পা। নির্যাতন সইতে না পেরে অবশেষে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেন। ১ জুলাই মোবাইলে স্বামীর নির্যাতনের কথা ভিডিও করে নিজ ঘরে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেন সম্পা। আত্মহত্যার আগে সম্পা ভিডিওতে উল্লেখ করেন, রুনু তার প্রথম স্ত্রী থাকার পরও তাকে বিয়ে করে জামিলনগরে ভাড়া বাড়িতে রাখে। তার স্বামী মাঝেমধ্যেই তাকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করত। এ কারণে এর আগেও তিনি আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। স্বামীর অত্যাচারেই আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন। ১ মিনিট ৩৬ সেকেন্ডের ভিডিও বক্তব্য রেকর্ড করার পর ফেসবুক আইডি নিষ্ক্রিয় করে আত্মহত্যা করেন।

এ ঘটনায় সম্পার ভাই মুক্তার হোসেন বাদী হয়ে সোমবার রাতে থানায় আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগে মামলা করেন। মামলার পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ রুনু প্রামাণিককে গ্রেপ্তার করে।

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের সভাপতি ড. সঞ্জয় কুমার সরকার। যৌতুকের দাবিতে স্ত্রীকে নির্যাতনের মামলায় গ্রেপ্তার হন ২৯ আগস্ট। এ বিষয়ে তার স্ত্রী জয়া সাহা বলেন, বিয়ের পর থেকেই সঞ্জয় কথায়, কাজে, আচরণে আমাকে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন করেছে। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর নির্যাতনের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। স্যান্ডেল, বেল্ট, ঝাঁটা, খুন্তি, বেলনা থেকে শুরু করে হাতের কাছে যখন যা পেত তা দিয়েই মারধর করত। মারতে মারতে বলত, ‘তুই বাপের বাড়ি যাস না কেন? বাঁচতে চাইলে বাপের কাছ থেকে ট্যাকা নিয়ে আয়।’

জয়া আরও বলেন, ‘২০২৩ সালের ২৪ জুন সঞ্জয় আমাকে বাবার বাড়িতে যাওয়ার জন্য শারীরিক নির্যাতন শুরু করে। সে আমাকে ও ছেলেকে নাটোর রেখে যায়। দীর্ঘদিন না নিয়ে যাওয়ায় আমি নিজে ও আমার বাবা-মা সঞ্জয়সহ তার বাবা-মা ও আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ করি। পরে সে জানায়, তার ১০ লাখ টাকা প্রয়োজন। টাকা দিলে নিয়ে যাবে, নচেৎ না। পরে এ নিয়ে আমি আদালতে মামলা দায়ের করি।’

উপরোল্লিখিত ঘটনা তিনটি দেশের বিভিন্ন অংশে প্রায় প্রতিদিন ঘটে যাওয়া পারিবারিক সহিংসতার খণ্ডাংশ মাত্র। সংবাদমাধ্যমে হামেশাই পাওয়া যায় নারীর প্রতি এমন সহিংসতার খবর। কঠোর আইন থাকার পরও কোনো এক অজানা কারণে কমে না পারিবারিক সহিংসতা ও নির্যাতন।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সদ্য শেষ হওয়া সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পারিবারিক সহিংসতা ঘটেছে ৩৪৬টি। এসব ঘটনায় শুধু স্বামীর হাতে নির্যাতনের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন ১১২ নারী। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে মাত্র ৫৬টি ঘটনায়। এ ছাড়া স্বামীর পরিবারের সদস্যদের হাতে নিহত হয়েছেন ২৩ নারী। নিজের পরিবারের হাতে খুন হয়েছেন ৪১ জন। পাশাপাশি নিজের পরিবারের হাতে নির্যাতিত হয়েছেন ২২ নারী। এসব ঘটনা সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেছেন ১১৬ জন।

এবার যাওয়া যাক মাসের হিসাবে। পারিবারিক সহিংসতায় জানুয়ারিতে স্বামীর হাতে নির্যাতনের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন ১৫ নারী। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে মাত্র ছয়টি। এ ছাড়া স্বামীর পরিবারের সদস্যদের হাতে নিহত হয়েছেন তিন নারী। নিজের পরিবারের হাতে খুন হয়েছেন সাতজন। পাশাপাশি স্বামী দ্বারা নির্যাতিত হয়েছেন পাঁচ নারী। আত্মহত্যা করেছেন ১১ জন।

ফেব্রুয়ারিতে স্বামীর হাতে নির্যাতনের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন ১৩ নারী। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে মাত্র চারটি। এ ছাড়া স্বামীর পরিবারের সদস্যদের হাতে নিহত হয়েছেন দুই নারী। নিজের পরিবারের হাতে খুন হয়েছেন তিনজন। পাশাপাশি স্বামী দ্বারা নির্যাতিত হয়েছেন চার নারী। আত্মহত্যা করেছেন ২৪ জন।

মার্চে স্বামীর হাতে নির্যাতনের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন ১২ নারী। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে মাত্র ছয়টি। এ ছাড়া স্বামীর পরিবারের সদস্যদের হাতে নিহত হয়েছেন চার নারী। নিজের পরিবারের হাতে খুন হয়েছেন ছয়জন। স্বামী দ্বারা নির্যাতিত হয়েছেন চারজন। আত্মহত্যা করেছেন ১৪ জন।

এপ্রিলে স্বামীর হাতে নির্যাতনের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন আট নারী। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে মাত্র একটি। এ ছাড়া স্বামীর পরিবারের সদস্যদের হাতে নিহত হয়েছেন দুজন। নিজের পরিবারের হাতে খুন হয়েছেন সাতজন। আত্মহত্যা করেছেন ১৭ জন।

মেতে স্বামীর হাতে নির্যাতনের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন ১৯ নারী। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে ১২টি। এ ছাড়া স্বামীর পরিবারের সদস্যদের হাতে নিহত হয়েছেন তিনজন। নিজের পরিবারের হাতে খুন হয়েছেন ছয়জন। নিজের পরিবার দ্বারা নির্যাতিত হয়েছেন ১৫ নারী। আত্মহত্যা করেছেন ১৫ জন।

জুনে স্বামীর হাতে নির্যাতনের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন ১৭ নারী। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে মাত্র ছয়টি। স্বামীর পরিবারের সদস্যদের হাতে নিহত হয়েছেন দুজন। নিজের পরিবারের হাতে খুন হয়েছেন তিনজন। নিজের পরিবার দ্বারা নির্যাতিত হয়েছেন চারজন। এ ছাড়া আত্মহত্যা করেছেন ১৩ জন।

জুলাইয়ের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, স্বামীর হাতে নির্যাতনের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন ২১ জন। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে ১০টি। স্বামীর পরিবারের সদস্যদের হাতে নিহত হয়েছেন চারজন। নিজের পরিবারের হাতে খুন হয়েছেন তিনজন। এ ছাড়া আত্মহত্যা করেছেন ১২ জন।

আগস্টে দেখা যায়, স্বামীর হাতে নির্যাতনের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন সাতজন। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে তিনটি। স্বামীর পরিবারের সদস্যদের হাতে নিহত হয়েছেন তিনজন। নিজের পরিবারের হাতে খুন হয়েছেন ছয়জন। এ ছাড়া আত্মহত্যা করেছেন ১০ জন।

সেপ্টেম্বরে দেখা যায়, স্বামীর হাতে নির্যাতনের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন ১৭ জন। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে সাতটি। স্বামীর পরিবারের সদস্যদের হাতে নিহত হয়েছেন একজন। নিজের পরিবারের হাতে খুন হয়েছেন দুইজন। এ ছাড়া আত্মহত্যা করেছেন ১০ জন।

পারিবারিক সহিংসতার বলি শুধু নারীরাই নন, এর দ্বার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশুরাও। জাতিসংঘ শিশু তহবিল-ইউনিসেফের চলতি বছরের তথ্যমতে, দেশে এক থেকে ১৪ বছর বয়সি প্রতি ১০ জন শিশুর মধ্যে নয়জনই নিজ পরিবারে সহিংসতার শিকার। সংস্থাটির তথ্যমতে, সব মিলিয়ে সাড়ে ৪ কোটি শিশুর ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

নারী নির্যাতন প্রতিরোধে কঠোর আইন থাকার পরও কমছে না এর সংখ্যা। সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি-বেসরকারি দুটি গবেষণায় দেখা যায়, দেশে দুই-তৃতীয়াংশ নারী পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হলেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হার মাত্র ৩ শতাংশ। এর কারণ হিসেবে গবেষণায় বলা হয়েছে, সচেতনতার অভাব, সংসারে টিকে থাকার ইচ্ছা, লোকলজ্জা ও অর্থ খরচের ভয়ে অধিকাংশ নারী থানায় অভিযোগ করেন না। পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০ অথবা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩ ও ২০২০) বা অন্য কোনো প্রাসঙ্গিক আইনেও তারা বিচার চান না।

আর্থসামাজিক বাস্তবতায় আমাদের দেশের নারীরা নিজেদের ঘরেও যেন সুরক্ষিত নন। পারিবারিক সহিংসতার বলি হয়ে অকালে প্রাণ হারান অনেকে। অনেকের জীবনে নেমে আসে নির্যাতনের কালো আঁধার। এসব পাশ কাটিয়ে সরকারি-বেসরকারিভাবে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আইনি সহযোগিতা পাওয়া সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। তবেই যদি নারীদের জন্য নিজেদের ঘরগুলো নিরাপদ হয়ে ওঠে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা