গোলাম কিবরিয়া
প্রকাশ : ০৬ অক্টোবর ২০২৪ ১৩:১৯ পিএম
আপডেট : ০৬ অক্টোবর ২০২৪ ১৭:০০ পিএম
সুন্দরবনের প্রান্তিক এলাকায় বসবাসরত হাজারও নারী কুসংস্কার, অপমান এবং সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করছেন। যাদের স্বামী সুন্দরবনে বাঘের আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের সমাজ ‘বাঘ-বিধবা’ হিসেবে অপবাদ দিয়ে নির্বাসিত করে।
এসব নারী শুধু স্বামী হারানোর শোকেই কাতর নন, তারা সমাজের নানামুখী নিগ্রহেরও শিকার। সম্প্রতি ইকো-মেন প্রকল্পের আওতায় পরিবেশবাদী সংগঠন ইয়ুথনেট ফর গ্লোবাল ক্লাইমেট জাস্টিসের আয়োজনে সুন্দরবনসংলগ্ন সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগরে এক সামাজিক সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে ২০ জন 'বাঘ-বিধবা', স্থানীয় সুন্দরবন বিশেষজ্ঞ এবং যুবদের অংশগ্রহণে সামাজিক কুসংস্কার ও বাস্তব সমস্যাগুলো নিয়ে কথা হয়। শনিবার (৫ অক্টোবর) উপজেলার কলাবাড়ির সিডিও অফিসে ইয়ুথনেট ফর গ্লোবাল ক্লাইমেট জাস্টিসের আয়োজনে ও বেডস এর সহযোগিতায় এই সংলাপে বাঘ-বিধবা, সুন্দরবন বিশেষজ্ঞ ও যুবরা তাদের মতামত এবং অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
-67023a2ef2156.jpg)
১৯৯৯ সালে স্বামীকে বাঘে হারানো সোনামনি জানান, স্বামী মারা যাওয়ার পর তাকে সমাজ 'অপায়া' এবং 'অলক্ষ্মী' বলে অভিহিত করে। শাশুড়ি তাকে শেকলে বেঁধে রাখতেন যেন সকালের প্রথমে তার মুখ দেখতে না হয়। এমনকি সমাজে তার সঙ্গে এমন আচরণ করা হয় যেন তিনি শত্রু। তাকে অনুষ্ঠানে সর্বশেষে খাবার দেওয়া হতো। তার শাশুড়ি ও দেবর উভয়ের মৃত্যু বাঘের আক্রমণে ঘটেছে, কিন্তু তাকেই দায়ী করা হয়।
কুসংস্কারের শিকার বুলি দাশীর গল্প আরও হৃদয়বিদারক। ২০০২ সালে তার স্বামী বাঘের আক্রমণে নিহত হওয়ার পর শাশুড়ি তাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেন। অসহায়ভাবে নদীতে রেণুপোনা ও কাঁকড়া ধরে সংসার চালানোর সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। এ ধরনের ঘটনা শুধু বুলী বা সোনামনির নয়, সুন্দরবনের আশপাশে বহু নারীর জীবনে একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। তাদের সমাজ একঘরে করে তাড়িয়ে দিয়েছে।
-67023a3bb1768.jpg)
তবে এসব নারী শুধু ট্র্যাজেডির শিকার নয়, তারা প্রতিরোধের প্রতীকও। কুসংস্কার ও সমাজের অবহেলার বিরুদ্ধে তারা সোচ্চার। তাদের সংগ্রাম আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, জলবায়ু সংকট সবচেয়ে প্রান্তিক মানুষদের ওপরেই গভীরভাবে প্রভাব ফেলে।
সুন্দরবন বিশেষজ্ঞ পিযুষ বাউলিয়া পিন্টু জানান, প্রায় ১১৬৩ জন 'বাঘ-বিধবা' নারী সুন্দরবনের সংলগ্ন এলাকায় বসবাস করছেন, যারা সমাজের অবহেলা ও নিগ্রহের শিকার। সরকারি হিসাব মতে, মাত্র ৫ জন বাঘ-বিধবার নাম তালিকাভুক্ত রয়েছে। এর কারণ অনেকেই সরকারি নিয়ম না মেনে সুন্দরবনে প্রবেশ করেন এবং তাদের মৃত্যুর পর কোনো স্বীকৃতি পান না। এমনকি সরকারি কোনো সহায়তাও তারা পান না।
-67023a45235cd.jpg)
সংলাপের মূল প্রতিপাদ্য ছিল বাঘ-বিধবাদের প্রতি সমাজের অন্যায় মনোভাব এবং কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সচেতনতা বৃদ্ধি। ইকো-মেন প্রকল্পের জেলা সমন্বয়ক হাফিজুর রহমানের সঞ্চালনায়, সুন্দরবন বিশেষজ্ঞ পিযুষ বাউলিয়া পিন্টু, জলবায়ু কর্মী শামিম হোসেন, সংবাদকর্মী জুবায়ের মাহমুদ এবং অন্যান্য অতিথি তাদের বক্তব্য রাখেন।
অতিথিরা তাদের বক্তব্যে বলেন, কুসংস্কারের এই দুষ্টচক্র থেকে মুক্তি দিতে হবে এবং বাঘ-বিধবাদের প্রাপ্য ন্যায্যতা ও সহমর্মিতা নিশ্চিত করতে হবে। তারা কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে এই নারীদের সম্মান ফিরিয়ে আনার দাবি জানান। তারা বলেন, বিয়ে-জীবন-মৃত্যু সৃষ্টিকর্তার হাতে, অথচ কুসংস্কারের কারণে অসহায় নারীদের অন্যায়ভাবে দোষারোপ করা হয়।