রাসেল মাহমুদ, বরগুনা
প্রকাশ : ০২ অক্টোবর ২০২৪ ১৫:৫৪ পিএম
অবৈধ দখলদারদের তালিকা করে প্রশাসন কিছু অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ শুরু করলেও পরে তা থেমে যায়
উপকূলীয় জেলা বরগুনার চারপাশে রয়েছে অসংখ্য নদ-নদী আর খাল। পদ্মা, মেঘনা, আড়িয়াল খাঁ ও মধুমতী নদীর অববাহিকায় বরগুনা জেলা। বরগুনার প্রকৃতি নদী আর সাগরনির্ভর। বরগুনার সঙ্গে নৌ যোগাযোগের একমাত্র পথ খাকদোন নদ। দখল-দূষণ ও নাব্য সংকটের কারণে এ নদটি অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। নদটি দখলের কারণে বারবার খনন করেও নাব্য ধরে রাখা যাচ্ছে না। খাকদোন নদের অস্তিত্ব বিলীন হলে এর সঙ্গে অন্তত ১৫টি প্রাকৃতিক খালেরও মৃত্যু হবে। অবৈধ দখলদারদের তালিকা করে প্রশাসন কিছু অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ শুরু করলেও পরে তা থেমে যায়। এদিকে লঞ্চ চলাচল বন্ধ রয়েছে।
স্থানীয়রা বলছেন, একসময় নদটি প্রায় দেড় কিলোমিটার প্রশস্ত ছিল। গত দুই দশকে অব্যাহত দখল, রক্ষণাবেক্ষণে উদাসীনতা ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের অবহেলায় বিষখালী-পায়রা দুই নদীর সংযোগ স্থাপনকারী ২৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এ নদের ১৫ কিলোমিটার মরা খালে পরিণত হয়েছে। বাকি ৯ কিলোমিটারের মধ্যে মাত্র ৬ কিলোমিটারে কোনোরকমে নৌযান চলাচল করে। এ নদে বিআইডব্লিউটিএর নৌবন্দর অবস্থিত। শুষ্ক মৌসুমে এ ৬ কিলোমিটারেও নাব্য সংকট দেখা দেয়। অপরিকল্পিত সেতু এবং দুই পাশ দখলের কারণে বরগুনার প্রাণ খাকদোন নদের অস্তিত্ব মারাত্মক সংকটে পড়েছে। বিআইডব্লিউটিএ-সূত্র জানান, বরগুনা নদীবন্দর সচল রাখতে প্রায় প্রতি বছর সরকার লাখ লাখ টাকা ব্যয়ে খাকদোন নদের ৬ কিলোমিটার খনন করে। কিন্তু অব্যাহত দখলের কারণে এ অংশের নাব্য ধরে রাখা যাচ্ছে না। এ কারণে নাব্য ও অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়েছে নদটি। নদের সঙ্গে শাখা খালগুলোর প্রবেশদ্বারে স্লুইসগেট নির্মাণ করায় জোয়ারের প্রবাহ কমে গিয়ে এসব খালও ভরাট হয়ে যাচ্ছে। বরগুনা শহরের ক্রোক থেকে মাছবাজার পর্যন্ত ৩ কিলোমিটার এলাকায় বিআইডব্লিউটিএর তালিকায় ১৫০ জন অবৈধ দখলদারের নাম রয়েছে। এর মধ্যে সাধারণ ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে রাজনীতিবিদের নামও রয়েছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, বরগুনা শহরের প্রাণকেন্দ্রে খাকদোন নদ দিয়ে একসময় চলত বড় বড় পণ্যবাহী জাহাজ। তবে বছরের পর বছর এর দুই তীর দখলের কারণে সরু হয়ে আসছে। নাব্য সংকটের কারণেও নৌযান চলাচলে হিমশিম খেতে হয়। নদটি বিপন্ন হলে পরিবেশ ও ব্যবসাবাণিজ্য হুমকির মুখে পড়বে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, খাকদোন নদের দক্ষিণপারের পোটকাখালী থেকে মাছবাজার ব্রিজ পর্যন্ত অগণিত অবৈধ স্থাপনা রয়েছে। শহরের কাঠপট্টি এলাকায় নদের চর দখল করে কাঠবাজার গড়ে তোলা হয়েছে। আবার লঞ্চঘাটের উত্তরপারে নদের ভেতর ঘাটলা নির্মাণ করছে পিআইও অফিস। বরগুনা জেলা প্রশাসন ২০২২ সালের ২১ মার্চ খাকদোন নদের দক্ষিণপারে মাছবাজার এলাকায় ৪৪টি অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ করেই আবার ৭৫টি ঘর বরাদ্দ দিয়েছে। এ বছরের ১২ মে হাইকোর্ট নদের দক্ষিণ তীরভূমিতে মামলা নিষ্পত্তি পর্যন্ত স্থিতাবস্থা বজায় রাখার আদেশ দেন।
বরগুনা সদরের কেওড়াবুনিয়া ইউনিয়নের হলদিয়া গ্রামের বাসিন্দা মোবারক আলী বলেন, ‘বাপদাদার কাছে শুনেছি এ নদ দিয়ে একসময় স্টিমার, লঞ্চসহ বিভিন্ন নৌযান চলত। এখন সবই স্মৃতি। খাকদোন শেষ পর্যন্ত মরেই যাবে।’
কেওড়াবুনিয়া ইউনিয়নের শিংড়াবুনিয়া গ্রামের মোখলেছুর রহমান বলেন, ‘খাকদোন নদে এখন নৌকা-ট্রলার কিছুই চলতে পারে না। ঘনঘন ব্রিজ দিয়া নদটি মেরে ফেলেছে। এ কারণে নদটি ভরে গেছে।’
ফুলঝুরি ইউনিয়নের বাসিন্দা শাহজাহান মিয়া বলেন, ‘নদের সংযোগ খালগুলোর মুখে স্লুইসগেট নির্মাণ করায় এবং দুই পার অব্যাহত দখল করায় খাকদোন এখন মরা খালে পরিণত হয়েছে।’
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)-সূত্র জানান, খাকদোন নদটি দখলের কারণে এখন বেশিরভাগ অংশ মৃতপ্রায়। নদটি রক্ষার জন্য পাউবো থেকে একটি প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে, তা পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।
ওয়াটারকিপারস বাংলাদেশের বরগুনা শাখার সমন্বয়ক মুশফিক আরিফ বলেন, ‘খাকদোন নদ বরগুনা শহরের প্রাণ, ব্যবসাবাণিজ্য, যোগাযোগব্যবস্থা এবং কৃষিকাজে খাকদোনের গুরুত্ব অপরিসীম। সুতরাং খাকদোন নদ হারিয়ে গেলে বরগুনার সব ক্ষেত্রে অস্তিত্ব সংকট দেখা দেবে। প্রতিনিয়ত দখল-দূষণের মুখে খাকদোন হারাতে বসেছে। এ নদের ওপর নির্মিত অপরিকল্পিত ব্রিজ অপসারণ করতে হবে এবং খননের মাধ্যমে পায়রা-বুড়ীশ্বর নদীর সঙ্গে পুনরায় সংযোগ স্থাপন করলেই এর নাব্য ফিরে আসবে। আমরা শিগগিরই বরগুনার বিভিন্ন সংগঠনকে সঙ্গে নিয়ে খাকদোন নদ রক্ষায় বৃহৎ কর্মসূচির মাধ্যমে আন্দোলন শুরু করব।’
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) বরগুনা নদীবন্দর কর্মকর্তা মাহফুজার রহমান বলেন, ‘খাকদোন নদের দক্ষিণ ও উত্তর পারে সীমানার মধ্যে অবৈধ দখলদার রয়েছেন। বেপরোয়া দখলের কারণে নদটির অস্তিত্ব বিপন্ন। আমাদের লঞ্চঘাটের বিপরীতে ঘাটলা নির্মাণ করছে উপজেলা প্রশাসন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে ঘাটলা নির্মাণ বন্ধ করার জন্য অনুরোধ করা হয়েছিল; তারা তা মানছেন না।’
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বরগুনা কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিব বলেন, ‘খাকদোন নদের উৎসস্থল থেকে পায়রা নদী পর্যন্ত খনন করা হবে। নদটি রক্ষার জন্য পাউবো থেকে একটি প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে। সে প্রস্তাব পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।’
বরগুনার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শফিকুল আলম বলেন, ‘খাকদোন নদের দুই পারের অবৈধ দখলদারদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। এখানে নদ দখল ও ময়লা ফেলে নাব্য নষ্ট করা হচ্ছে। দখলদারদের বিরুদ্ধে আমাদের ভ্রাম্যমাণ আদালত বা আইনে যেটা আছে সেটা আমরা করব।’