× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

কেউ রাখে না বাঘবিধবাদের খোঁজ

সাধন সরকার

প্রকাশ : ০২ অক্টোবর ২০২৪ ১৩:১৭ পিএম

আপডেট : ০২ অক্টোবর ২০২৪ ২৩:০৯ পিএম

কেউ রাখে না বাঘবিধবাদের খোঁজ

সুন্দরবনের আশপাশের অঞ্চলে বাঘের থাবায় প্রতি বছর মৃত্যুবরণ করেন অসংখ্য বনজীবী। পরিবারের আয়ের যোগান দেওয়া মানুষটিকে চিরতরে হারিয়ে তাদের স্ত্রীরা হয়ে পড়েন স্বামীহারা। স্থানীয়দের কাছে যারা বাঘবিধবা নামে পরিচিত। সুন্দরবনের পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোয় বাঘবিধবার সংখ্যা ২ হাজারের বেশি। শুধু শ্যামনগরের বিভিন্ন ইউনিয়নে রয়েছে ১ হাজারের বেশি বাঘবিধবা পরিবার। বনের ওপর নির্ভরশীল এসব মানুষের বিকল্প কর্মসংস্থানের দাবি দীর্ঘদিনের। এ বিষয়ে বিশেষ লেখা—

সাহিদা আক্তার, বয়স ৫০। সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের মুন্সিগঞ্জ সেন্টার কালীনগর গ্রামের বাসিন্দা। বাঁধের উঁচু রাস্তার পাশে তার ছোট্ট একটি মাটির ঘর। দরজার সামনে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ড্রাম। নড়বড়ে ঘরটি সামান্য ঝড়ে ভেঙে পড়ার ভয় তাকে সব সময় তাড়া করে বেড়ায়। সাহিদার বাড়ি থেকে সুন্দরবন দেখা যায়। ২০০৮ সালে স্বামী রহমান মোড়ল বাঘের আক্রমণে মারা যান। তিনি বিধবা ভাতা পান। তবু সংসার চালাতে এখন নেট টানেন। সুন্দরবনের ভেতরেও মাছ ধরতে যান। জোয়ারের সময় সুন্দরবনের ভেতরে আটল (কাঁকড়া ধরার যন্ত্র) দিয়ে কাঁকড়া ও চিংড়ির পোনা ধরেন। আটল বনের ভেতরে রেখে আসেন। কোনো দিন ৭০টি আবার কোনো দিন ১০০টির মতো পোনা পান। ১টি পোনা ১ টাকা করে বিক্রি করেন। নিজে কিছু করতে না পারলেও একমাত্র ছেলেকে নিয়ে তার অনেক স্বপ্ন। ছেলে শ্যামনগর সরকারি মহসীন ডিগ্রি কলেজে অনার্স পড়েন। টিউশনি করে কোনোরকমে নিজের খরচ মেটান। সাহিদা সুপেয় পানির সমস্যার কথা বলেন। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে রাখলেও শুষ্ক মৌসুমে পানি কিনে খেতে হয় তাকে। সংসারে অর্থের টান পড়লে সাহিদা তার ভাইবোনদের কাছে হাত পাতেন।

মুন্সিগঞ্জ সেন্টার কালীনগর গ্রামের আরেক বাসিন্দা সোনাভানু। অনেক খোঁজাখুঁজির পর পাওয়া গেল সোনাভানুকে (৭০)। বয়সের ভারে এখন আর তেমন হাঁটাচলা করতে পারেন না। বেশিরভাগ সময় বিছানায় শুয়েবসে দিন কেটে যায়। সোনাভানু একজন বাঘবিধবা। তার স্বামী মান্দার গাজী প্রায় ১৭ বছর আগে বাঘের আক্রমণে মারা যান। মান্দার গাজীর আয়ে চলত সংসার। সুন্দরবনে কাঁকড়া, সাদা মাছ, চিংড়ি ধরতে যেতেন। বাঘের আক্রমণে স্বামীকে হারিয়ে ছেলেমেয়েদের বেশিদূর লেখাপড়া করাতে পারেননি। সোনাভানুর এক ছেলে ও এক মেয়ে যে-যার মতো বিয়ে করে সংসার করছেন। মেয়ে মাজেদাও (৪৩) এখন নেট টেনে চিংড়ির পোনা সংগ্রহ করেন।

রাবেয়া আক্তারও একজন বাঘবিধবা। বয়স ৭৮-এর কাছাকাছি। শ্যামনগরের বুড়িগোয়ালিনী গ্রামের বাসিন্দা। গ্রামের নদীতীরের বাঁধের ওপর দাঁড়িয়ে কথা হচ্ছিল তার সঙ্গে। এ বয়সে স্বামীর চলে যাওয়ার স্মৃতি এখনও এতটুকু ভোলেননি। বয়সের ভারে কথা বলতে কষ্ট হচ্ছিল তার। বাঁধের রাস্তার এপার থেকে মালঞ্চ নদের ওপারের সুন্দরবন দেখা যায়। ২০০৯ সালের কথা। সুন্দরবনে মাছ ধরতে যেতেন তার স্বামী সামাদ সরদার। চিংড়ি, ভেটকি, পারশে মাছ ধরতেন। প্রতিদিনের মতো সেদিনও সুন্দরবনের ভেতরে মাছ ধরছিলেন। বাঘ এসে হঠাৎ আক্রমণ করে। অনেক সন্ধানের পর দেহের হদিস মেলে। দেহের ভেতরে বলতে গেলে কিছুই ছিল না। দেহ বলতে শুধু মুখটা ছিল। বাঘের আক্রমণে মারা যান সামাদ সরদার। এখন সন্তানরা যে-যার মতো বিয়ে করেছেন। রাবেয়া মেয়ে শেফালীর সঙ্গে থাকেন।

বুড়িগোয়ালিনী গ্রামের বাঁধের ওপর দাঁড়িয়ে যখন বাঘবিধবাদের খোঁজ করছিলাম তখন ৬০ বছরের নুরন্নেচ্ছা এসে হাজির হন। বিয়ের কয়েক বছরের মাথায় তার স্বামী সাখাওয়াত সরদারকে বাঘে ধরে। তখন সাখাওয়াত সরদারের বয়স ত্রিশের কাছাকাছি। তিনিও সুন্দরবনে মাছ ধরতে যেতেন। সেদিন পাঁচজন একসঙ্গে মাছ ধরতে গিয়েছিলেন। আলাদাভাবে যে-যার মতো মাছ ধরছিলেন। হঠাৎ বাঘ আক্রমণ করে সাখাওয়াত সরদারের ওপর। হেঁতাল গাছের পাশ ধরে বাঘ টানতে টানতে নিয়ে গিয়েছিল। পরে ফরেস্ট অফিস থেকে গার্ড ও স্থানীয় লোকজন গিয়ে বন্দুকের গুলি ছুড়ে দেহের খণ্ডিত অংশ উদ্ধার করেন। পায়ের শিরা-উপশিরা পর্যন্ত ছিল না। নুরন্নেছার জীবন এখন খুব কষ্টে চলে। সুন্দরবনে কাঠ সংগ্রহ করার পাশাপাশি বাড়ির সামনে মালঞ্চ নদে নেট টানেন। এতেই তার সংসার চলে। মাঝে মাঝে দিনমজুর হিসেবে কাজ করেন।

বাঘবিধবাদের তথ্য সংগ্রহ করছি জেনে খবর পেয়ে একই গ্রামের বাসিন্দা রোকসানা আক্তার (৩৫) এ প্রতিবেদকের সঙ্গে দেখা করেন। বুড়িগোয়ালিনী জেলেপাড়ায় তার বাড়ি। বলতে গেলে খুব অল্প বয়সে স্বামীকে হারিয়েছেন। রোকসানার স্বামীর নাম মনিরুল। মনিরুল ও রোকসানা দম্পতির তখন একমাত্র সন্তান নিয়ে সুখের সংসার। মনিরুলের জীবিকা ছিল মাছ ধরা। সুন্দরবনে মাছ ধরে সংসার চলত। ঘূর্ণিঝড় আইলা সংঘটিত হওয়ার কাছাকাছি সময়ে মনিরুল বাঘের আক্রমণে মৃত্যুবরণ করেন। মনিরুল প্রায় প্রতিদিনই বাদাবনে মাছ ও কাঁকড়া সংগ্রহ করতে যেতেন। রোকসানা আক্ষেপ করে বলছিলেন, ‘বাঘে খেলেও মানুষ পেশা বদলায় না। বাঘ যাকে শিকার করে তাকে ধরে। সাপের লেখা আর বাঘের দেখা! বাঘের সামনে গেলে মানুষ সাহস হারিয়ে ফেলে।’ স্বামীকে হারিয়ে রোকসানা রীতিমতো অথই সাগরে পড়েন। এখন তিনি নদীতে নেট টেনে জীবন চালান।

শ্যামনগরের গাবুরা, বুড়িগোয়ালিনী, মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নে বাঘবিধবাদের এ রকম অনেক পরিবার আছে। সুন্দরবনসংলগ্ন গ্রামগুলোয় বাঘের আক্রমণে স্বামী হারানো নারীরা ‘বাঘবিধবা’ বলে পরিচিত। স্বামী সুন্দরবনে কাজ করতে গেলে স্ত্রীকে অনেক বাছবিচার মেনে চলতে হয় বলে স্থানীয়ভাবে কথিত আছে! স্বামীকে হারানোর ফলে বাঘবিধবা তকমা পাওয়া নারীদের অনেক সময় অপয়া বা খারাপ দৃষ্টিতে দেখা হয়! অনেক বাঘবিধবা সরকার থেকে বিধবা ভাতা পান, আবার অনেকে পান না। স্বামী হারানোর পর সংসারের হাল ধরা, সন্তানদের লালনপালন করাতে গিয়ে বাঘবিধবারা জীবন বলি দিয়েছেন। নেট টেনে, দিনমজুরি করে, ঝুঁকি নিয়ে সুন্দরবনের ভেতরে মাছ ধরে কোনোভাবে জীবনের চাকা সচল রেখেছেন। তথ্য বলছে, সুন্দরবনের আশপাশের অঞ্চলে বাঘবিধবার সংখ্যা ২ হাজারের বেশি। শুধু শ্যামনগরের বিভিন্ন ইউনিয়নে রয়েছে ১ হাজারের বেশি বাঘবিধবা পরিবার। বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা বাঘবিধবাদের কর্মসংস্থান ও সহায়তায় এগিয়ে এসেছে। সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল মানুষের বেশিরভাগই গরিব ও সহজসরল প্রকৃতির। প্রতি বছরই সুন্দরবনে বাঘের আক্রমণে মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। সে হিসেবে বিধবার সংখ্যা কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না! সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল মানুষের বিকল্প কর্মসংস্থানের দাবি দীর্ঘদিনের। পাশাপাশি বাঘবিধবারাও কোনো খারাপ নজরে নয়, মানমর্যাদা নিয়ে নিরাপদ কর্মপরিবেশ চান।

উপকূলীয় এলাকায় উন্নয়ন সংস্থা ‘সিডিও ইয়ুথ টিম’-এর উপজেলা সিনিয়র ভলান্টিয়ার মো. হাফিজুর রহমান বলেন, ‘বাঘবিধবাদের সহায়তায় সাতক্ষীরা জেলাজুড়ে আমাদের ৬০০ ভলান্টিয়ার রয়েছেন। ১৭টি ইউনিট নিয়ে আমরা বাঘবিধবাদের প্রতি সমাজের নেতিবাচক মনোভাব রোধে কাজ করি। ক্ষেত্রবিশেষ অর্থসহায়তা দিয়ে থাকি।’ তিনি স্থানীয়ভবে পরিবেশ ও নারী অধিকার রক্ষায় কাজ করা ইকোমেন প্রকল্পের সাতক্ষীরা জেলার সমন্বয়কের দায়িত্বও পালন করছেন। হাফিজুর রহমান আরও বলেন, ‘বাঘবিধবাদের নিয়ে অনেক কুসংস্কার রয়েছে। অনেক সময় তাদের অপয়া বলা হয়! খারাপ চোখে দেখা হয়। আমরা সংগঠনের পক্ষ থেকে উঠান বৈঠক ও সেমিনার আয়োজনের মাধ্যমে স্থানীয়দের সচেতনতায় কাজ করি।’

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা