প্রচ্ছদ
সুবর্ণা মেহ্জাবীন স্বর্ণা
প্রকাশ : ০১ অক্টোবর ২০২৪ ১৮:২৭ পিএম
আপডেট : ০১ অক্টোবর ২০২৪ ১৮:২৯ পিএম
মডেল : জুঁই ও ওয়াজিহা; পোশাক : বিশ্বরঙ; মেকআপ : রেড বিউটি সেলুন; ছবি : ফারহান ফয়সাল
শরতের শেষে মা
দুর্গা আসবেন ধরায়। পূজা মানেই চারদিকে সাজসাজ রব। কেনাকাটা, খাওয়াদাওয়া, ফুর্তি, হইহুল্লোড়,
মণ্ডপে যাওয়া, ঘোরাঘুরি, আড্ডা আর দেবীদর্শন তো আছেই। এ সময় নিজেকে প্রতিদিন নতুনভাবে
সাজিয়ে তুলতে চান সবাই। অনেকে ষষ্ঠী থেকে দশমীÑপ্রতিদিনের জন্য আগে থেকেই বাছাই করে
রাখেন আলাদা নতুন পোশাক। কোন পোশাকের সঙ্গে কেমন সাজ মানাবে তা নিয়েও থাকে নানা পরিকল্পনা।
পূজা যেহেতু বাঙালির
উৎসব, তাই পশ্চিমার চেয়ে বাঙালিয়ানা পোশাকই বেশি প্রাধান্য পায়। বিশেষত শাড়ি পরতে বেশি
দেখা যায়। যারা শাড়িতে স্বস্তি বোধ করেন না, তারা পরেন সালোয়ার-কামিজ, কুর্তিসহ ইন্দো-ওয়েস্টার্ন
ঘরানার বিভিন্ন পোশাক। পছন্দের পোশাকের সঙ্গে প্রতি বছরই এ সাজে দেখা যায় নতুনত্ব।
প্রতিদিন নতুন পোশাক না বেছে, সাজের মাধ্যমে নতুনত্ব আনাটাই অনেকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছেন।
রেড বিউটি সেলুনের স্বত্বাধিকারী ও রূপ বিশেষজ্ঞ আফরোজা পারভীন বলেন, যেহেতু এখনও আবহাওয়া বেশ গরম তাই এবারের পূজায় একদম ন্যাচারাল বা ন্যুড মেকআপ লুক হবে স্বচ্ছন্দময়। ষষ্ঠী-সপ্তমীর সাজ রাখতে পারেন একেবারে সাধারণ। কিন্তু অষ্টমীর রাতের জন্য একটু গর্জিয়াস লুক নেওয়া যেতে পারে। নবমীতে একটু উজ্জ্বল ও প্রাণবন্ত ভাব আনতে পারেন সেমি-পার্টি লুকে। এ লুকটি খুব বেশি জাঁকজমকপূর্ণ না হলেও বেশ উৎসবের ভাব দেবে। আর দশমীর দিন সিঁথি-সিঁদুরে রাঙানো একেবারে দেশি সাজ।

ষষ্ঠীতে ছিমছাম
ষষ্ঠীর দিনে একদম
ছিমছাম ও স্বচ্ছন্দপূর্ণ একটি লুক বেছে নিতে পারেন। এ দিন খুব বেশি ভারী সাজসজ্জার
দিকে না গিয়ে হালকা, অথচ পরিপাটি ও স্নিগ্ধ লুক বেছে নিলে দেখতে সুন্দর লাগবে। শাড়ি
পরতে চাইলে সুতি বা হ্যান্ডলুম শাড়ি বেছে নিন। প্যাস্টেল শেডের শাড়ি যেমন হালকা গোলাপি,
সাদা, মাটির রঙ, নীল বা হালকা সবুজ রঙগুলো খুবই মানানসই। শাড়ি ছাড়া একটি সিম্পল কুর্তি
ও পালাজো সেট পরতে পারেন, যা দেখতে বেশ স্নিগ্ধ আর স্টাইলিশ হবে। হালকা বেস মেকআপ রাখুন।
ফাউন্ডেশন বা বিবি ক্রিম খুব বেশি ভারী না করে ত্বক স্বাভাবিক রাখুন। চোখে কাজল বা
মাশকারা ব্যবহার করতে পারেন। ঠোঁটে ন্যুড বা হালকা গোলাপি শেডের লিপস্টিক দিন। খুব
গাঢ় রঙের লিপস্টিক এড়িয়ে চলাই ভালো। ছোট একটি লাল বা কালো টিপ পরতে পারেন, যা ছিমছাম
লুককে আরও সম্পূর্ণ করবে। চুল খোলা রেখে একটু ওয়েভি করে রাখতে পারেন। এদিন ছিমছাম লুকের
জন্য ভারী গহনা এড়িয়ে চলুন। তার বদলে ছোট একটি ঝুমকা, মাটির গহনা বা ছোট মেটাল দুল
পরতে পারেন। গলায় হালকা একটা সুতার চেইন বা নেকলেস, আর হাতের চুড়ি খুব হালকা রাখুন।
চাইলে পূজা মোটিফের গহনাও বেছে নিতে পারেন।

স্নিগ্ধ সাজে
সপ্তমী
এ দিনটি অনেকের
জন্য পূজার মূল উৎসবের শুরু, তাই সাজগোজে হওয়া চাই অতিযত্নশীল। তবে স্নিগ্ধ লুক মানেই
হালকা অথচ সুন্দর, যা দেবে পরিপাটি লুক এবং স্বচ্ছন্দে থাকতে পারবেন। হালকা রঙের তাঁত,
মসলিন বা কটন শাড়ি স্নিগ্ধ লুকের জন্য উপযুক্ত। প্যাস্টেল শেডের শাড়ি যেমন হালকা গোলাপি,
হালকা সবুজ, নীল বা সাদা রঙ বেছে নিতে পারেন। যদি শাড়ি পরতে না চান, তাহলে পালাজো প্যান্টের
সঙ্গে হালকা রঙের লং কুর্তি বা সালোয়ার-কামিজও পরতে পারেন। এ দিনে মেকআপ খুবই হালকা
রাখুন। ত্বকের স্বাভাবিক সৌন্দর্য বজায় রাখতে ফাউন্ডেশনের পরিবর্তে বিবি ক্রিম বা সিসি
ক্রিম ব্যবহার করতে পারেন। মেকআপ করে ত্বক খুব বেশি ভারী না করে স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা
রাখার চেষ্টা করুন। চোখের মেকআপ ন্যাচারাল রাখুন, চাইলে হালকা মাশকারা লাগিয়ে চোখ আরও
উজ্জ্বল করতে পারেন। ঠোঁটে হালকা পিচ, গোলাপি বা ন্যুড শেডের লিপস্টিক ব্যবহার করুন।
খুব গাঢ় বা উজ্জ্বল লিপস্টিক এড়িয়ে চলুন। চাইলে ঢিলে বেণি করতে পারেন, অথবা ঢিলেঢালা
খোঁপা করে তাতে সামান্য ফুল লাগাতে পারেন। স্নিগ্ধ লুকের জন্য হালকা মেটালিক বা পাথরের
ছোট্ট দুল বা ঝুমকা বেছে নিন। খুব হালকা গলা চেইন, সুতার মালা বা অক্সিডাইজড ছোট নেকলেস
পরে নিতে পারেন। হাতে পাতলা বালা বা ব্রেসলেটও সুন্দর মানাবে। চুল খোলা রাখতে চাইলে
হালকা কার্ল বা ওয়েভি করে রাখতে পারেন; যা স্নিগ্ধ ও প্রাণবন্ত লুক দেবে।

অষ্টমীতে নজরকাড়া
অষ্টমী হলো দুর্গাপূজার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং জমকালো দিন। অষ্টমীর সাজে ঐতিহ্যবাহী এবং গ্ল্যামারাস লুক মিলিয়ে নিজের মধ্যে একটা রাজকীয় আভা ফুটিয়ে তুলতে পারেন। এ দিন সিল্ক, বেনারসি, কাঞ্জিভরম কিংবা কাতান শাড়ি উপযুক্ত। এ ধরনের শাড়ি আভিজাত্যপূর্ণ এবং গ্ল্যামারাস লুক দেবে। রঙ হিসেবে লাল, ম্যাজেন্টা, গোল্ডেন বা রাজকীয় নীল শেড বেছে নিতে পারেন। যদি শাড়ির পরিবর্তে লেহেঙ্গা পরতে চান, তবে জমকালো ও এমব্রয়ডারি করা লেহেঙ্গা বেছে নিন। গোল্ড বা রুপালি কাজের লেহেঙ্গা নজরকাড়া লুক দিতে পারে। মেকআপে রাখতে পারেন সিম্পল কিন্তু গর্জিয়াস লুক। ত্বকে প্রাইমার ব্যবহার করে ফাউন্ডেশন ভালোভাবে ব্লেন্ড করে নিন। ফ্ললেস এবং গ্লোয়িং বেস তৈরি করতে হাইলাইটার ব্যবহার করতে পারেন। স্মোকি আই মেকআপ বা গোল্ডেন শ্যাডোর সঙ্গে ড্রামাটিক উইংড আইলাইনার এবং লম্বা আইল্যাশ ব্যবহার করে চোখ আকর্ষণীয় করে তুলুন। চোখের মেকআপটা ভারী হলে ন্যুড শেডের লিপস্টিক বেছে নিন। চোখে যদি হালকা মেকআপ করেন তো বেছে নিন লাল, মেরুনের মতো ডিপ রঙের লিপস্টিক। চুল খোঁপা করলে সেটাকে একটু জমকালো করার জন্য ফুল বা গাজরা দিয়ে সাজাতে পারেন। কিংবা চুল খোলা রেখে একপাশে কৃত্রিম ফুল লাগালে দেখতে সুন্দর লাগবে। অষ্টমীর জন্য বড় ঝুমকা, চাঁদবালি বা ঝুমুর কানের দুল মানানসই। জমকালো কানের গহনা সাজের অন্যতম মূল আকর্ষণ হয়ে ওঠে। ভারী নেকলেস বা হার পরতে পারেন, যা আপনার শাড়ির সঙ্গে মানানসই হবে। গোল্ড প্লেটেড, কুন্দন বা পাথরের কাজের নেকলেস বেশ মানাবে। কিংবা অ্যান্টিক কোনো গহনাও বেছে নিতে পারেন এদিন।

জমকালো নবমী
মহানবমী হলো দুর্গাপূজার
শেষ পূর্ণাঙ্গ দিন। এ দিন একটু জমকালোভাবে তো সাজতেই পারেন। নবমীর জন্য বেনারসি, সিল্ক,
কাঞ্জিভরম অথবা এমব্রয়ডারি করা শাড়ি একেবারে উপযুক্ত। রাজকীয় রঙ যেমন লাল, ম্যাজেন্টা,
বেগুনি, গোল্ডেন বা নীল বেছে নিতে পারেন। জমকালো শাড়ি আপনাকে উৎসবের পরিবেশে আরও আকর্ষণীয়
করে তুলবে। মেকআপেও রাখুন জমকালো ভাব। নিখুঁত ও গ্লোয়িং বেস তৈরি করতে হাইলাইটার ও
ব্রোঞ্জার ব্যবহার করতে পারেন। ফ্ললেস এবং ডিউয়ি বেস মেকআপ আপনাকে দিনভর উজ্জ্বল রাখবে।
ড্রামাটিক এবং গ্ল্যামারাস চোখের মেকআপ বেছে নিন। গোল্ডেন, ব্রোঞ্জ বা ডার্ক শ্যাডো
দিয়ে স্মোকি আই মেকআপ করুন। উইংড আইলাইনার এবং লম্বা আইল্যাশ লাগালে চোখের আকর্ষণ
দ্বিগুণ হয়ে যাবে। গাঢ় রঙের লিপস্টিক যেমন ডিপ রেড, বারগান্ডি বা ম্যাট ফিনিশের চেরি
শেড বেছে নিন। শেষে কপালে বড় লাল বা সোনালি টিপ পরে নিন। ব্যস, মেকআপ শেষ।
সাজে জমকালো ভাব আনতে হলে মানানসই গহনাও প্রয়োজন। নেকলেস বা লম্বা হার বেছে নিন। কুন্দন, পাথর বা মীনাকারি কাজের গহনা শাড়ির সঙ্গে দারুণ মানাবে। নথ পরতে পারেন যা জমকালো লুকের মধ্যে ঐতিহ্যের ছোঁয়া যোগ করবে। হাতে সোনার চুড়ি বা কুন্দন বালা পরুন। নবমীর জমকালো সাজের জন্য খোঁপা করা একটি ভালো অপশন। খোঁপায় গাজরা বা ফুল দিয়ে সাজিয়ে একটি ট্র্যাডিশনাল এবং ক্লাসিক লুক দিতে পারেন। চুলে বড় খোঁপা করে ফুল বা কৃত্রিম গহনার ব্যবহার চুলের স্টাইল আরও আকর্ষণীয় করবে। চুল খোলা রাখতে চাইলে কার্ল করা বা ওয়েভি করে রাখতে পারেন। চুলে হালকা সেরাম দিয়ে চকচকে রাখুন।
দশমীতে সাবেকিয়ানা
দশমীতে নারীর
সাবেকিয়ানা সাজে বিশেষ গুরুত্ব থাকে, কারণ এটি দুর্গাপূজার শেষ দিন এবং দেবী দুর্গার
বিসর্জনের মুহূর্ত। এ দিনটিতে নারীরা সাবেকি ও ঐতিহ্যবাহী সাজে নিজেদের সাজিয়ে তোলেন,
যা বাঙালি সংস্কৃতির প্রতীক। আর এ সাজের জন্য সবার পছন্দ লাল পাড় সাদা শাড়ি। এটি দুর্গাপূজার
অন্যতম ঐতিহ্যবাহী পোশাক হিসেবে দেখা হয়। এ ছাড়া বেনারসি, সিল্ক, কাতান অথবা জামদানি
শাড়ি পরারও প্রচলন রয়েছে। শাড়ির সঙ্গে সোনালি বা রুপালি কাজ করা পাড়ও জনপ্রিয়। এদিন
চোখে মোটা করে কাজল দেওয়া হয়, যা ঐতিহ্যবাহী বাঙালি নারীর সৌন্দর্য প্রকাশ করে। বড়
লাল টিপ কপালের শোভা বাড়ায়। লাল বা মেরুন লিপস্টিক বেছে নিতে পারেন, যা সাবেকি শাড়ির
সঙ্গে মানানসই। এ ছাড়া শাড়ির সঙ্গে সোনার গহনা বা সোনালি যেকোনো গহনা এদিনের সাজ আরও
আকর্ষণীয় করে তোলে। গলার হার, কানের দুল এবং সোনার বা মেটালের চুড়ি সাজে ঐতিহ্যবাহী
লুক এনে দেয়। দশমীর মূল আকর্ষণ সিঁদুর খেলা। বিবাহিত নারীরা দেবী দুর্গাকে সিঁদুর পরিয়ে
তার বিদায় জানিয়ে একে অন্যের কপালে সিঁদুর পরান। চুল খোঁপা করে বাঁধলেই এদিন সাজে
পূর্ণতা আসে। গাঁদা ফুল বা বেলি ফুলের মালা খোঁপায় পরতে পারেন। এ দিন আলতা পরতে ভুলবেন
না যেন। বিশেষ করে পায়ের পাতা এবং হাতের আঙুলে আলতার নকশা করলে দেখতে খুব সুন্দর লাগে।