× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ঠিকানা হারানো মানুষকে ঘরে ফেরান তিনি

শওকত আলী রতন

প্রকাশ : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১৪:২৩ পিএম

আপডেট : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১৪:৩৫ পিএম

প্রায় এক বছরের চেষ্টায় ভারতীয় যুবক সুভাষকে তার পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয় বেনাপোল সীমান্তে।   ছবি : শামসুল হুদার ব্যক্তিগত অ্যালবাম

প্রায় এক বছরের চেষ্টায় ভারতীয় যুবক সুভাষকে তার পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয় বেনাপোল সীমান্তে। ছবি : শামসুল হুদার ব্যক্তিগত অ্যালবাম

নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ উপজেলার নয়াহাটি এলাকায় তিন সন্তান নিয়ে ভাড়া বাড়িতে বসবাস করেন রহিমা বেগম। তিন সন্তানের মধ্যে বড় মেয়ে ফারজানা ববির সঙ্গে সখ্য গড়ে ওঠে প্রতিবেশী এক মেয়ের। ২০২৩ সালের মার্চের দিকে ওই মেয়ের সঙ্গে ঘুরতে বের হন ববি। রাতে ফোন দিয়ে বান্ধবীর বাড়িতে থাকার কথা মাকে জানায়। এর পর থেকেই ববির ফোন নম্বরটি বন্ধ পায় পরিবার। অনেক চেষ্টা করেও আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। ভয়ে থানা প্রশাসনের কাছে যেতে সাহস করেননি রহিমা বেগম। এভাবেই চলছিল। গত বছর অক্টোবরে হঠাৎ একদিন রহিমা বেগমের কাছে একটি ফোন আসে। তার কাছে জানতে চাওয়া হয়, আপনার মেয়ে কি হারিয়ে গেছে? তখনও তিনি ঝামেলা মনে করে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তখন তাকে আশ্বস্ত করে বলা হয়, আপনার মেয়ে কলকাতার একটি সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে রয়েছে। তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে হলে অভিভাবকের কাগজপত্র লাগবে। এক পর্যায়ে ববির সঙ্গে তার মাকে ভিডিওকলে কথা বলিয়ে দেন সেই ব্যক্তি। যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া ব্যক্তির নাম শামসুল হুদা। 

শুধু ববি নয়, ববির মতো হারিয়ে যাওয়া অন্তত ত্রিশজনকে পরিবারের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন শামসুল হুদা। পেশায় সংবাদকর্মী হলেও সামাজিক দায়বদ্ধতা তাকে এ কাজে উদ্বুদ্ধ করেছে বলে জানান। তাই নিজ উৎসাহেই কাজটি করেন।

ববিকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে জানতে চাইলে শামসুল হুদা বলেন, ববির খোঁজ প্রথম পাই আমার পরিচিত পশ্চিমবঙ্গ রেডিও ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক অম্বরিশ নাগের কাছে। সে আমাকে জানায়, কলকাতার শিয়ালদহে এলোমেলো ঘোরাঘুরির সময় পুলিশ ববিকে আটক করে। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাকে সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে রাখা হয়। আরও জানতে পারি, একটি প্রতারক চক্র ববিকে বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে ভারতের কলকাতায় নিয়ে দালালদের কাছে বিক্রি করে দেয়। সেখান থেকে হায়দরাবাদ হয়ে দিল্লি নিয়ে যাওয়া হয়। পরে দিল্লির বন্দিশালা থেকে কৌশলে পালায় সে। দুই দেশের দাপ্তরিক কাজ শেষে এ বছর ৩০ এপ্রিল মায়ের কাছে ফিরে আসে ববি।

 শামসুল হুদার সঙ্গে ভারত থেকে উদ্ধার হওয়া তরুণী ফারজানা ববি ও তার পরিবার

মানসিক ভারসাম্যহীন, পাচার হওয়া এবং ছোটবেলায় হারিয়ে গেছে-এমন ব্যক্তিরা পূর্ণাঙ্গ ঠিকানা বলতে পারেন না। ঠিকানা বলতে না পারায় তাদের পরিবারের কাছে ফেরাও হয় না। আবার অনেকেই এপার-ওপারের সীমানা পেরোনোর পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আটক হয়। তাদের সাজার মেয়াদ শেষ হলেও ঠিকানা বলতে না পারায় পরিবারের কাছে যেতে পারে না। মূলত এমন মানুষের সন্ধান এবং তাদের পরিবারে ফিরিয়ে দেওয়ার কাজ করেন শামসুল হুদা।

শামসুল হুদা জানান, হারিয়ে যাওয়া ব্যক্তির সন্ধানে প্রথমে তাদের পরিবারের খোঁজ করা হয়। এ ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে পাওয়া ঠিকানা অনুসারে গুগল ম্যাপের মাধ্যমে খোঁজা হয়। অনেক সময় গ্রামপ্রধানের মাধ্যমে চেষ্টা করেন পরিবারকে খুঁজতে। গ্রামপ্রধানরা ব্যর্থ হলে তখন যোগাযোগ করেন সংশ্লিষ্ট থানায়।

সাধারণত এ কাজে তাকে সহযোগিতা করে পরিচিত বন্ধুমহল। সাহায্য নেন সমাজমাধ্যমেরও। শামসুল হুদার বর্তমান কাজের ক্ষেত্র আপাতত বাংলাদেশ ও ভারত। সাংবাদিকতার সুবাদে প্রতিবেশী ভারতে রয়েছেন তার একাধিক বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষী।

হারিয়ে যাওয়া মানুষকে পরিবারের সঙ্গে দেখা করিয়ে দেওয়ার প্রথম ঘটনাটি ২০২০ সালের। শামসুল হুদা জানান, ওই বছর ফেব্রুয়ারিতে ভারতের এক বন্ধুর মারফত খবর পান পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুরের সাগরদ্বীপ এলাকায় নাসির নামে মানসিক ভারসাম্যহীন এক বাংলাদেশি যুবক এলোমেলো ঘুরে বেড়াচ্ছে। নাসিরের বাড়ি ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার সুরগঞ্জে। সেই তথ্যমতে নাসিরের পরিবারকে খুঁজে বের করেন তিনি। কিন্তু নাসিরের পরিবারের সদস্যদের আগ্রহ না থাকায় শেষ পর্যন্ত তাকে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়নি। এরপর বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারি শুরু হলে নাসিরের পরিবারের সঙ্গে আর যোগাযোগ করতে পারেননি শামসুল হুদা। তাই বলে এ উদ্যোগ থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখেননি।

একই বছরের মে মাসে কলকাতা থেকে খবর পেলেন বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলার নলদা গ্রামের অনিল মুখার্জির। অনিলের বোন ছায়াদেবী ছোটবেলায় কলকাতায় এক আত্মীয়ের বাড়ি গিয়ে আর ফেরেননি। দেশে থাকা পরিবারের সঙ্গে ছায়াদেবীর কোনো যোগাযোগও ছিল না। এ তথ্য জানার পর শামসুল হুদা গুগল ম্যাপের মাধ্যমে অনিলের ঠিকানা বের করেন। এরপর স্থানীয় জনপ্রতিনিধির মাধ্যমে অনিলের সঙ্গে ছায়াদেবীর কথা বলিয়ে দেন। ৪২ বছর পর সেদিনই ভাইবোনের মধ্যে প্রথম কথা হয়। এর পর থেকে ভাইবোনের নিয়মিত যোগাযোগ হচ্ছে।

এক পুলিশ কর্মকর্তা ২০২১ সালের জুনে ভারতীয় যুবক সুভাষকে আহত অবস্থায় রংপুর হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দেন। তিন মাস চিকিৎসার পর তার স্থান হয় একটি আশ্রয়কেন্দ্রে। ২০২২ সালের মে মাসে ওই আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে শামসুল হুদা সুভাষের কাছে জানতে পারেন তার বাড়ি ভারতের রামনগর। কিন্তু জায়গাটা কোন শহর বা রাজ্যে তা বলতে পারেন না সুভাষ। অনেক চেষ্টার পর ওই বছরের আগস্টে সুভাষের পরিবারের সঙ্গে শামসুল হুদার কথা হয়। আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে লেগে যায় আরও কয়েক মাস। অবশেষে ২০২৩ সালের মার্চে বেনাপোল সীমান্তে পরিবারের কাছে তুলে দেওয়া হয় সুভাষকে।

এ কাজটি করতে শামসুল হুদাকে বিভিন্ন সময় বেশ জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াটি বেশ জটিল। কোনো দপ্তরই দায়িত্ব নিয়ে এ কাজটি করতে চায় না। কিছু সংগঠন রয়েছে যারা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এসব কাজ করে। তিনি যেহেতু ব্যক্তিগত উদ্যোগে এ প্রত্যাবাসনের কাজ করেন, তাই তাকে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়। কেননা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার জন্য দুই দেশের মধ্যে সহজ কোনো ব্যবস্থা নেই। এটির সহজীকরণ হওয়া জরুরি মনে করেন শামসুল হুদা। এসব কাজ করতে গিয়ে অনেক সময় সরকারি কর্মকর্তাদের বিরাগভাজনও হতে হয়েছে। এ ছাড়া হারিয়ে যাওয়া পরিবারও অনেক সময় তার কথা প্রাথমিকভাবে বিশ্বাস করতে চায় না।

শামসুল হুদা বলেন, বাংলাদেশে ভারতীয় হাইকমিশনের সহায়তা খুবই প্রয়োজন। তাদের নাগরিকদের ফেরত পাঠানোর সময় বেশ সহায়তা করেছেন। হারিয়ে যাওয়াদের অধিকাংশই গরিব পরিবারের। ফলে সরকারি সাহায্য খুবই প্রয়োজন।

এসব কাজে অর্থায়ন প্রসঙ্গে কথা হলে শামসুল হুদা জানান, প্রাথমিকভাবে হারিয়ে যাওয়াদের পরিবার খুঁজতে অর্থের প্রয়োজন হয় না। তথ্য পাওয়ার পর তিনি ফোনকলে যোগাযোগ করেন। কখনও তিনি কয়েকটি সংগঠনের সাহায্য নেন। তিনি অ্যামেচার রেডিও সোসাইটি বাংলাদেশ এবং রোটারি ক্লাব অব বনানীর সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। আবার প্রয়োজনে দেশে এবং বিদেশে থাকা কিছু সোর্সও ব্যবহার করেন। এ ছাড়া ব্যক্তিগতভাবেও কেউ কেউ সাহায্য করেন।

বর্তমানে থাইল্যান্ড, মধ্যপ্রাচ্যসহ বেশ কয়েকটি দেশের হারিয়ে যাওয়া মানুষের পরিবারের খোঁজে কাজ করছেন। এ ছাড়া সন্ধান পেয়েছেন আরও ১৩ ভারতীয় নাগরিকের। যারা লালমনিরহাট, পঞ্চগড়, দিনাজপুর ও নীলফামারীর জেলে বন্দি ছিলেন। সাজার মেয়াদ শেষ হলেও পরিবারের ঠিকানা বলতে না পারায় দেশে ফিরতে পারছেন না মানসিক ভারসাম্যহীন এ মানুষগুলো।

সামাজিক এ কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ রোটারি ক্লাব অব বনানী এবং রোটারি ডিস্ট্রিক্ট, রেডিও সোসাইটি অব বাংলাদেশ থেকে সম্মাননা পেয়েছেন শাসসুল হুদা। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানাতে গিয়ে বলেন, আমার পক্ষে যতদিন সম্ভব হারিয়ে যাওয়া মানুষদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে কাজ করে যেতে চাই।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা