আর্নিশ মান্দা
শরিফুল ইসলাম পলাশ
প্রকাশ : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১৩:০৬ পিএম
আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১৪:০৪ পিএম
আর্নিশ মান্দার গান গারো জনগোষ্ঠীর কাছে জনপ্রিয়তা পেয়েছে ‘নাচের গান’ হিসেবে। কিন্তু নাচ বা গান পরিবেশনে গানের স্রষ্টার নাম উল্লেখ হয় না। ছবি : লেখক
গারো ভাষার একটি জনপ্রিয় গানের স্রষ্টা তিনি। কিন্তু গান মনে রাখলেও তাকে মনে রাখেনি কেউ। নির্মম বাস্তবতায় প্রতিভাবান এই শিল্পী এখন দিনমজুর। ‘ছাপরা ঘরে’ জসীমউদ্দীনের ‘আসমানী’র মতো জীবনযাপন করছেন।
‘ও আচিক মান্দিরাং, আফসানংবো নাসিমাং’ গারো জনগোষ্ঠীর ভাষায় রচিত জনপ্রিয় একটি গান। বৃহত্তর ময়মনসিংহের সমতলের ক্ষুদ্র জাতিসত্তাকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে লেখা গানটি বেশ সমাদৃত। ঐতিহ্যবাহী ‘ওয়ানগালা’ উৎসব থেকে শুরু করে যেকোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে জাগরণের সেই গানটি শোনা যায়। দেশের সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের আসাম-মেঘালয়ের গারোদের কাছেও ‘নাচের গান’ হিসেবে পৌঁছে গেছে গানটি।
গারো জনগোষ্ঠীর বহুল আলোচিত গানটির শিল্পী আর্নিশ মান্দা। পিতা-মাতার দেওয়া নাম মাইকেল সাংমা হলেও তিনি পরিচিত ‘আর্নিশ মান্দা’ নামে। ১৯৬৯-এর জানুয়ারিতে ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলার সাপমারি গ্রামে আর্নিশ মান্দার জন্ম। বাবা অবিনাশ বাজি একজন সংগীতশিল্পী। নিয়মিত বেতার-টেলিভিশনে গান করতেন। নজরুলসংগীতের প্রতি অনুরাগ ছিল তার। তিন ভাই-বোনের মধ্যে আর্নিশ মান্দা দ্বিতীয়। ছেলেবেলায় পাশের হালুয়াঘাট উপজেলার কয়েকটি গ্রামে আত্মীয়ের বাড়িতে লজিং থেকে পড়ালেখা করেছেন। জীবিকার প্রয়োজনে এরপর পাড়ি জমিয়েছেন গাজীপুরে, কাজ করেছেন বেশ কয়েকটি পোশাক কারখানায়।
গানের প্রতি আর্নিশ মান্দার অনুরাগ বাবার হাত ধরেই। ছোটবেলায় অবিনাশ বাজি তাকে কোলে নিয়ে তবলা-হারমোনিয়ামসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান করতেন। তখন থেকেই গান পছন্দ করেন আর্নিশ মান্দা। কিন্তু আর্থিক সংগতির অভাবে কোনো পেশাদার ওস্তাদের কাছে সংগীতের তালিম নিতে পারেননি। তার পরও চেষ্টা থামেনি। ধীরে ধীরে নিজেকে মেলে ধরতে শুরু করেন আর্নিশ মান্দা।
আর্নিশ মান্দার ভাষায়, ‘আমাদের আর্থিক অবস্থা তেমন ভালো ছিল না। প্রাইমারি স্কুলে পড়ার সময় একবার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য একজন শিল্পীকে আনা হয়েছিল। উনি আমাদের কিছু গান শিখিয়েছেন। সেই ওস্তাদের কাছেই যতটা সম্ভব রপ্ত করেছি। এরপর আর সংগীতের অ আ ক খ শেখার সুযোগ আসেনি। আমি নিজের চেষ্টায়, নিজের মনের ইচ্ছায় লেখালেখি শুরু করি। নিজের ভাষায় গান লিখতে শুরু করি। নিজেই সুর করি, নিজকণ্ঠেই সেই গান গাইতে শুরু করি। কতটা ভালো লিখি, মন্দ লিখি জানি না।’
১৯৯৫ সালে ঢাকায় একটি বিদেশি দূতাবাসে কর্মরত স্মৃতি খকসীর সঙ্গে শিল্পী আর্নিশ মান্দার বিয়ে হয়। এরপর স্ত্রী-সন্তান আর গান নিয়ে নব্বইয়ের দশকের শিল্পীর দিনগুলো বেশ ভালোই কেটেছে। ২০১৭ সালে চাকরি হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েন আর্নিশ মান্দা। স্ত্রীর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। ২০১৯ সালে প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হয়ে স্ত্রী স্মৃতি খকসীও চাকরি ছাড়তে বাধ্য হন। বাধ্য হয়ে পরিবারের সবাইকে নিয়ে ধোবাউড়ার ধাইরপাড়ায় ফিরে যান।
২০০৭ সালে গাজীপুরে থাকার সময় বাংলাদেশ বেতারে লোকগানের নিয়মিত শিল্পী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন আর্নিশ মান্দা। গারো জনগোষ্ঠীর জন্য নির্মিত ‘সাল্ গিতাল’ অনুষ্ঠানে প্রথম ‘ও আচিক মান্দিরাং, আফসানংবো নাসিমাং’ শিরোনামের গানটি পরিবেশন করেন। এটি মূলত গারো জনগোষ্ঠীর ভাষায় রচিত জাগরণের গান। যে গানে সময়ের সঙ্গে নিজস্ব কৃষ্টি-কালচার নিয়ে টিকে থাকার জন্য সবাইকে এক হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন শিল্পী। ‘সাল্ গিতাল’ অনুষ্ঠানটির পরিচালক ছিলেন প্রয়াত শিল্পী মাইকেল মৃত্যুঞ্জয় রেমা। আর্নিশ মান্দার দূর সম্পর্কের মামা ছিলেন। তার প্রেরণাতেই স্বল্পসময়ে গানটি লেখেন এবং সুর করেন। আর্নিশ মান্দার কণ্ঠে ‘ও আচিক মান্দিরাং’ গানটি বেতারে প্রচারের পর তিনি আর্নিশ মান্দার গানটিসহ আরও কয়েকজনের গান নিয়ে ‘ও আচিক মান্দিরাং’ শিরোনামে একটি অ্যালবাম প্রকাশের উদ্যোগ নেন।
২০১১ সালে অ্যালবামটি প্রকাশ করে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম। ২০১২ সালের ওয়ানগালা উৎসবে অ্যালবামটি প্রকাশ পায়। এরপর স্বল্পসময়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে গানটি। ছড়িয়ে পড়ে ইউটিউব-ফেসবুকসহ সমাজমাধ্যমে। গত এক যুগে গারো জনগোষ্ঠীর কাছে জনপ্রিয়তা পেয়েছে ‘নাচের গান’ হিসেবে। কিন্তু রহস্যজনক কারণে নাচ বা গান পরিবেশনের সময় গানটির শিল্পী হিসেবে আর্নিশ মান্দার নাম উল্লেখ করা হয়নি। কিছু ক্ষেত্রে গানটির শিল্পী হিসেবে অন্য শিল্পীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাই গান জনপ্রিয় হলেও শিল্পীর নাম সেভাবে ছড়ায়নি। বরং সময়ের ব্যবধানে হারিয়ে গেছেন লোকচক্ষুর অন্তরালে।
আর্নিশ মান্দার স্ত্রী স্মৃতি খকসী বলেন, ‘অনেকে নিজের মতো করে গানটি প্রচার করে। সবাই তার গান পছন্দ করে, এটা ভালো লাগে। কিন্তু ফেসবুক-ইউটিউবে যারা ওই গানটির নাচের ভিডিও ছাড়েন তারা শিল্পীর নাম উল্লেখ করেন না। যারা গানটি করেন তারাও শিল্পীর নাম উল্লেখ করেন না। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ওই গানটিতে নাচে অংশ নেন তারাও শিল্পীর জানেন না। যারা জানেন যে এটি আর্নিশের গান তারাও প্রতিবাদ করেন না। কেউ যখন শিল্পীর নাম বলেন না বা অন্যের নামে প্রচার করেন, তখন খুব কষ্ট লাগে।’
গারো জাতিস্বত্তার স্বনামখ্যাত কবি মতেন্দ্র মানখিন বলেন, ‘আমাদের সমাজে অনেক শিল্পী আছেন যারা নিজেদের চেষ্টায় গান লিখছেন। কিন্তু ইউটিউবে বা অ্যালবামে গীতিকার-সুরকারের নাম উল্লেখ করা হয় না। বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য শিল্পীর অনুমতি নেন না। যারা গান বা নাচ করেন তারা গীতিকার-সুরকারের নাম উল্লেখ করেন না। যে কারণে প্রকৃত গীতিকার-সুরকার ও শিল্পীরা লোকচক্ষুর অন্তরালেই থেকে যান। এটা আমাদের জন্য দুর্ভাগ্যজনক। যারা আমাদের শিল্প-সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখছেন তাদের প্রাপ্য সম্মান দেওয়া উচিত।’
বর্তমানে শিল্পী আর্নিশ মান্দা অসুস্থ স্ত্রী ও পুত্র-কন্যাকে নিয়ে পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের কবিতার ‘আসমানী’র মতো দুঃসহ দিনযাপন করছেন। মাথা গোঁজার ঠাঁই ছোট্ট একটি একচালা ঘর। যার বেড়া দেওয়ার সামর্থ্যও নেই শিল্পীর। রহস্যজনক কারণে তিনি সরকারি কোনো সুযোগসুবিধা পাননি। নিয়মিত গান লিখলেও গান করার মতো বাদ্যযন্ত্রও নেই এ শিল্পীর।
কয়েক বছর আগেও বাংলাদেশ বেতারের ‘সাল্ গিতাল’ ও বাংলাদেশ টেলিভিশনের ‘লোক লোকালয়’ অনুষষ্ঠানে নিয়মিত গান করতেন আর্নিশ মান্দা। কিন্তু স্ত্রী স্মৃতি খকসী অসুস্থ হয়ে পড়ার পর গ্রামে ফিরে সবকিছু থেকে দূরে রয়েছেন। নিয়মিত গান লেখেন, এ পর্যন্ত সহস্রাধিক গান লিখেছেন। বেশিরভাগই ‘আচিক’ ভাষায় লেখা। তার গানে গারো জনগোষ্ঠীর সোনালি অতীত, জনগোষ্ঠীর চলার পথে প্রতিবন্ধকতা ও নিজস্ব কৃষ্টি-কালচার স্থান পেয়েছে। নিজস্ব ভাষায় সুর করার বিষয়েও যত্নশীল এ শিল্পী।
আর্নিশ মান্দা বলেন, ‘আমি সংগীত ধারণ করে বেঁচে থাকতে চাই। কিন্তু যে অবস্থায় থাকি তাতে ইচ্ছে থাকলেও অনেক কিছু করতে পারি না। জীবিকার প্রয়োজনে এখন দিনমজুরের কাজও করতে হয়। তবুও সংসার ও দুই সন্তানের পড়লেখার খরচ চালাতে হিমশিম খেতে হয়। ফলে সংগীত নিয়ে নতুন কিছু ভাবার সুযোগ পাই না। তার পরও নিয়মিত গান লিখি। কোনো অনুষ্ঠানে ডাক পেলে যাই, গান করি।’
আর্নিশ মান্দা সরকারি সুযোগসুবিধা পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু ধোবাউড়া ইউনিয়নের কয়েক হাজার দুস্থ মানুষের তালিকায় তার নাম নেই। একইভাবে ভাঙা ও বেড়াবিহীন ছাপড়া ঘরে বসবাস করলেও তিনি সরকারিভাবে ঘর পাননি। তার দুই সন্তান পড়ালেখা করে, কিন্তু তারা কোনো শিক্ষাবৃত্তি পায়নি। অথচ আর্নিশ মান্দার তুলনায় সচ্ছল অনেকেই সরকারি এসব সুযোগসুবিধা পেয়েছেন। কিন্তু এ শিল্পীর ভাগ্যে কিছুই জোটেনি। ‘কেউ নাখোশ হবেন’ বলে এ বিষয়ে বিস্তারিত বলতে চাননি তারা। কারণ তাদের ‘সমাজের সবার সঙ্গে মিলেমিশেই’ থাকতে হবে।
স্মৃতি খকসী বলেছেন, ‘আমি কোনো কিছু পাই না। কেন পাই না জানি না। সবাই পায় আমি পাই না। আমাদের কমিউনিটির অনেকেই আমাদের দুরবস্থার কথা জানেন, আমি অসুস্থ সেটা জানেন। কিন্তু আমাদের খবর নেওয়ার মতো সময় কারও নেই। যখন সুস্থ ছিলাম, কমিউনিটির জন্য কাজ করতাম তখন সবাই খোঁজখবর নিত। কিন্তু অসুস্থ হওয়ার পর কেউ একটা ফোন করেও খবর নেয় না।’
সংসারের খরচ জোটাতে বর্তমানে দিনমজুরের কাজ করেন শিল্পী আর্নিশ মান্দা। সব সময় কাজ পাওয়া যায় না। যে কারণে বিকল্প আয়ের জন্য ব্যবসার পরিকল্পনা করছেন। সম্ভব হলে গারো জনগোষ্ঠীর বিলুপ্তপ্রায় পোশাক, খাবার ও বাদ্যযন্ত্রের ব্যবসাও করতে চান। এতে বাড়তি আয়ের পাশাপাশি বিলুপ্তপ্রায় ঐতিহ্য টিকে থাকবে। উপজেলা প্রশাসনের কাছ থেকে ‘প্রতিবন্ধী কোটা’য় একটি দোকানঘর পেয়েছেন। কিন্তু পুঁজির অভাবে ব্যবসা শুরু করতে পারছেন না। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর কাছে ধরনা দিয়েছেন। কিন্তু ব্যবসা করার জন্য প্রয়োজনীয় ঋণের সংস্থান হয়নি।
বর্তমানে ধোবাউড়ার ধাইরপাড়ায় বগলাদিঘির পারে আর্নিশ মান্দার বসবাস। আর্নিশ মান্দার বড় মেয়ে চিশমিতা ময়ূরী খকসী বিয়ের পর থেকে ঢাকায় থাকেন। বড় ছেলে মসীহ খ্রিষ্টময় খকসীও এখন সেখানে গিয়ে চাকরি করছেন। আরেক মেয়ে তৃতীয়া খকসী এখন স্থানীয় কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী। আর কনিষ্ঠ সন্তান তৃতীয় খকসী সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। দুই সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে আর্নিশ মান্দার বসবাস।
লোকচক্ষুর আড়ালে থাকা শিল্পী আর্নিশ মান্দার পরিবারের আরেক সদস্য আদিত্য খকসী। ২১ বছর বয়সি ছেলেটি শারীরিক প্রতিবন্ধী, ঠিকমতো কথা বলতেও কষ্ট হয় তার। আদিত্যর মা-বাবা আদিত্যকে গ্রামে রেখে যাওয়ার পর থেকে আদিত্যর দায়িত্বও এখন শিল্পীর পরিবারের ওপর। নিজের অসুস্থতা আর দারিদ্র্যের মধ্যে বোনের ছেলের দেখভাল করছেন শিল্পীর স্ত্রী স্মৃতি খকসী। প্রতিবন্ধী এ ভাগনের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বিগ্ন স্মৃতি খকসী।
শিল্পী আর্নিশ মান্দার জীবনের এমন দুঃসহ গল্প লিখে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। দুঃসহ জীবনের গল্প শিগগিরই প্রামাণ্যচিত্র আকারে প্রকাশ পাচ্ছে। ‘সুখী মানুষের পিরান’ শিরোনামে ৪০ মিনিটের প্রামাণ্যচিত্রটি চলতি মাসেই নিজস্ব ইউটিউব ও ফেসবুকে প্রকাশ করবে ‘দ্য পাথ ক্রিয়েটর’।