বিশ্ব নদী দিবস
সিরাজুল ইসলাম আবেদ
প্রকাশ : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১২:২৯ পিএম
আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১৩:২০ পিএম
বাংলাদেশে স্বীকৃত আন্তঃসীমান্ত নদীর সংখ্যা ৫৭টি হলেও নদীকর্মীদের হিসাবে তা অন্তত ১২৬টি। চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া আন্তঃসীমান্ত নদী মহানন্দা। ছবি : ফখরুল ইসলাম
সেপ্টেম্বরের চতুর্থ রবিবার বিশ্ব নদী দিবস। সে হিসেবে আগামীকাল ২২ সেপ্টেম্বর বিশ্বজুড়ে নদীপ্রাণ প্রকৃতিবাদী জন ও নানা সংগঠন-সংস্থা দিবসটি পালন করবে। উদ্দেশ্য-নদীর গুরুত্ব এবং আমাদের জীবনে এর অপরিহার্যতা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো। এ বছর বিশ্ব নদী দিবসে আমাদের প্রতিপাদ্য ‘আন্তঃসীমান্ত নদীতে বাংলাদেশের অধিকার’। বাংলাদেশের জলবায়ু, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং ভৌগোলিক সীমারেখার প্রেক্ষাপটে প্রতিপাদ্যটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
প্রাণের অপরিহার্য অংশ নদী। নদীমাতৃক বাংলাদেশের জন্য এ কথা অনিবার্যভাবেই সত্য। পানীয় জল সরবরাহ থেকে শুরু করে জীববৈচিত্র্য রক্ষা, সেচ এবং সুলভ পরিবহন পথ হিসেবে নদী বাস্তুতন্ত্র ও জীবনযাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। দখল, দূষণ, শিল্পবর্জ্য, বন উজাড় এবং পানির অতিরিক্ত নিষ্কাশনে বিশ্বব্যাপী নদী আজ হুমকির মুখে। আমাদের মতো ভাটির দেশগুলোর জন্য আরও বড় চ্যালেঞ্জ উজানের দেশের বাঁধ দেওয়ার মাধ্যমে আন্তঃসীমান্ত নদীর স্রোতধারা নিয়ন্ত্রণ বা গতিপথ রোধ করা। এর ফল যে কী ভয়াবহ সাম্প্রতিক বন্যা তা দেখিয়ে গেছে। আবার উত্তরের মরুময়তার আশঙ্কা এবং অসংখ্য নদীর মরে যাওয়ার পেছনেও একেই অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
আন্তঃসীমান্ত নদী : বৈশ্বিক এবং আঞ্চলিক চ্যালেঞ্জ
উজান থেকে ভাটির দিকে বয়ে চলা নদীর খুব স্বাভাবিক চরিত্র। রাষ্ট্র বিভিন্ন সময়, প্রেক্ষাপট ও রাজনৈতিক বিবেচনায় তার সীমারেখায় পরিবর্তন আনলেও নদীর পথচালা একই থেকে যায়। আন্তঃসীমান্ত নদী বলতে আমরা এমন নদীগুলোকে বুঝি, যেগুলো এক বা একাধিক দেশের সীমা অতিক্রম করে প্রবাহিত হয়। এ নদীগুলোর প্রভাব রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং পরিবেশগত—সব ক্ষেত্রেই গভীর।
কোনো রাষ্ট্রীয় সীমারেখায় নদীকে আটকে রাখা যায় না। রাখাটা উচিতও নয়। কিন্তু এ ‘উচিত নয়’ কাজটিই যখন কেউ করে, নদীর পানি প্রত্যাহার বা জোর করে আটকে রাখে, স্বাভাবিক গতিপথ প্রবাহিত করে ভিন্ন দিকেÑতখনই বিপত্তি বাধে। এবং উজানের দেশগুলো নদীতে তাদের একক কর্তৃত্ব ফলাতে গিয়ে এ অনুচিত চর্চাটি প্রায়ই করে থাকে। যে রাষ্ট্র যত বেশি শক্তিশালী আন্তঃসীমান্ত নদীতে সেই রাষ্ট্রের প্রভাব বিস্তারের প্রবণতাও তত বেশি।

বাংলাদেশের আন্তঃসীমান্ত নদী
কাজির গরু গোয়ালে না পাওয়া গেলেও নাকি কিতাবে পাওয়া যায়; কিন্তু আমাদের নদীর ক্ষেত্রে প্রবাদটি ধরা দিয়েছে উল্টোভাবে। বাংলাদেশে স্বীকৃত আন্তঃসীমান্ত নদীর সংখ্যা ৫৭টি। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের ৫৪টি আর বাকি নদীগুলো প্রবাহিত হচ্ছে মিয়ানমারের সীমারেখা অতিক্রম করে। কিন্তু গবেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে অন্তত ৬৯টি নদী রয়েছে যেগুলো ভারত থেকে বাংলাদেশে এসেছে। আন্তঃসীমান্ত নদী হিসেবে কোথাও এর স্বীকৃতি বা নথিভুক্তি নেই। এ প্রসঙ্গে কথা হয় দীর্ঘদিন নদী ও পরিবেশ নিয়ে আন্দোলন ও গবেষণায় যুক্ত অধ্যাপক ড. তুহিন ওয়াদুদের সঙ্গে। তিনি বলেন, আন্তঃসীমান্ত নদীর সংখ্যা ৫৭ বলা হলেও এর সংখ্যা অন্তত ১২৬টি। সরেজমিন অনুসন্ধানে প্রকৃত সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে মত দেন তিনি। তার হিসাবে ছোটবড় অনেক নদী ওই তালিকায় নেই। যেমন কুড়িগ্রামের গদাধর, বারোমাসি বড় নদী হওয়ার পরও রয়ে গেছে তালিকার বাইরে। ছোট হোক কিংবা বড় সব আন্তঃসীমান্ত নদীর দ্বিদেশীয় স্বীকৃতি থাকা জরুরি। নদীর প্রশ্নে উজানের দেশ ভারতের মনোভাব কখনোই সৌহার্দ্যপূর্ণ নয়। ফলে তারা চাইবে নদীগুলোর স্বীকৃতি না হোক। এতে এসব নদীর পানি তারা নির্বিঘ্নে প্রত্যাহারের সুযোগ পেতে পারে। ভারতের মতো উজানের দেশগুলোয় নদীগুলোর ওপর বাঁধ নির্মাণের ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হয়, যা বাংলাদেশের মতো ভাটির দেশগুলোকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করে। তাই ভাটির দেশ হিসেবে আমাদের তাগিদ দিয়ে হলেও আন্তঃসীমান্ত সব নদীর স্বীকৃতি নেওয়া জরুরি।
নথির বাইরে আন্তঃসীমান্ত
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দাপ্তরিকভাবে স্বীকৃত ৫৪টি আন্তঃসীমান্ত নদীর বাইরেও এ পর্যন্ত আরও অন্তত ৬৯ নদী চিহ্নিত করেছে রিভারাইন পিপল। যেগুলো ভারত থেকে বাংলাদেশে এসেছে কিংবা বাংলাদেশ থেকে ভারতে ঢুকেছে। অনুসন্ধানে পাওয়া তালিকাবহির্ভূত আন্তঃসীমান্ত নদীগুলো হলো সাতক্ষীরার হাঁড়িভাঙা বা হাড়িয়াভাঙা; দিনাজপুরের চিরি বা শ্রী, ইছামতী বা ঘুকসি; ঠাকুরগাঁওয়ের নোনা বা লোনা; পঞ্চগড়ের বেরং বা গোবরা, কুরুম, যমুনা, চাওয়াই, ভেরসা, ভাতা, আলাইকুমারী, সুই, সাউ বা সাহু; লালমনিরহাটের গিদারী বা গিরিধারী, মালদাহা, সানিয়াজান বা সিমলাজান, সিংগিমারী, সাকোয়া; কুড়িগ্রামের সংকোশ, কালো, দন্নী, গঙ্গাধর, গদাধর, নওজল, নীলকমল, বারোমাসি, ফুলকুমার, তোর্ষা, কালজানি, হাড়িয়ারডারা, গিরাই, শিয়ালদহ; শেরপুরের কর্ণঝড়া, মহারশি; নেত্রকোনার গণেশ্বরী, উপদাখালী, কর্ণ-বালজা (মঙ্গলেশ্বর), মহাদেও; সুনামগঞ্জের মহেষখোলা বা মহিষখোলা, খাসিমারা, বড়ছড়া, লাকমাছড়া, আশাউড়া, উমফুঙ, মৌলা, উমস্তা, জাল্লাগাঙ; সিলেটের রাঙাপানি/রাঙাগাঙ বা রাঙা-বাগলি, চেলা বা শিলা, জালিয়াছড়া, লুভা/লোভা বা লুবহা, উতমাছড়া, তুরংছড়া, কুড়িছড়া, কুলুমছড়া, তাইরঙ্গল, হিঙ্গাইর, হুরই, নুনছড়া, দোনা, আমরি; মৌলভীবাজারের মুরইছড়া, লাঘাটা, বিলাস; হবিগঞ্জের করাঙ্গী; ব্রাহ্মণবাড়িয়ার লহর বা লৌর; রাঙামাটির কর্ণফুলী (ঠেগামুখ, বরকল); বান্দরবানের বাঁকখালী (নাইক্ষ্যংছড়ি) ও কক্সবাজারের উখিয়ার রেজুখাল।
ভারত এবং বাংলাদেশের মধ্যে কেবল গঙ্গা নদীর পানি বণ্টন নিয়ে চুক্তি হয়েছে। তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে বহু দেনদরবার, আন্দোলন সংগ্রাম হয়েছে; তিস্তার চর বড় হতে হতে দৃষ্টিসীমা ছাড়িয়ে গেছে কিন্তু সেই চুক্তি এখনও আলোর মুখ দেখেনি। ফলে বাংলাদেশের কৃষি এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর বড় রকমের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
মেলেনি ১৬ নদীর স্বীকৃতি
১৯৭২ সালের মার্চে বাংলাদেশ ও ভারতের দুই প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং ইন্দিরা গান্ধীর যৌথ ঘোষণার মাধ্যমে ‘ভারত-বাংলাদেশ যৌথ নদী কমিশন’ গঠিত হয়। সে বছর জুনে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত যৌথ নদী কমিশনের প্রথম বৈঠকে বাংলাদেশ-ভারত আন্তঃসীমান্ত ৫৪ নদীর তালিকা চূড়ান্ত হয়েছিল। এরপর বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে নতুন আরও ১৬টি আন্তঃসীমান্ত নদীর খোঁজ পায় বাংলাদেশ। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে ওই নদীগুলোকে আন্তঃসীমান্ত নদী ঘোষণা করতে ভারতের কাছে তালিকাও পাঠায় পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়। তবে ভারতের কাছ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো সাড়া মেলেনি।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো ১৬টি নদী হলো হাঁড়িভাঙা, সংকোশ, কর্ণঝড়া, সোমেশ্বরী, মহারশি, উপদাখালী, মঙ্গলেশ্বর, মহাদেও, মহিষখোলা, রাঙা-বাগলি, কাশিমারা, চেলা, জালিয়াছড়া, লুবহা, লোহার ও কর্ণফুলী।
বাংলাদেশের অধিকার এবং আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনা
নদীতীরবর্তী বাংলাদেশে নদীর ভূমিকা শুধু জলসেচ বা পরিবহনব্যবস্থাতেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পলি জমা করে নতুন ভূমি গঠন, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং কৃষি উৎপাদনে ভূমিকা রাখে। কিন্তু আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক পানি বণ্টন আইন প্রয়োগ না হওয়ায়; নদীর প্রবাহ এবং পানি সরবরাহে অসম বণ্টনের কারণে বাংলাদেশ বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস সাম্প্রতিক সময়ে আন্তঃসীমান্ত নদী নিয়ে ভারতের সঙ্গে উচ্চতর কমিটি গঠনের প্রস্তাব করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘পানি বণ্টন অবশ্যই আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী হতে হবে এবং ভাটির দেশগুলোর অধিকার রক্ষিত থাকা উচিত।’ এ প্রস্তাবটি আন্তঃসীমান্ত নদীর পানির সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং অংশীদারির বিষয়ে আলোচনার নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা
ইউরোপে অনেক দেশ আন্তঃসীমান্ত নদীর পানি বণ্টন সুষ্ঠুভাবে নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে চুক্তি করেছে। তারা জাতিসংঘের ইউরোপীয় অর্থনৈতিক কমিশনের (UNECE) সহায়তায় ন্যায্য পানি বণ্টনের একটি মডেল তৈরি করেছে। বাংলাদেশ, ভারত, চীন এবং উজানের অন্যান্য দেশের সঙ্গে আলোচনা করে একই ধরনের সমঝোতা ও সমন্বয় সম্ভব।
এগিয়ে যাওয়ার পথ : একটি জাতীয় আন্দোলন
আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর পানির ন্যায্য হিস্সার জন্য শুধু কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রচেষ্টাই যথেষ্ট নয়। নদীকে তার আপন পথে বইতে দিতে হবে। সেজন্য যথাযথ নদী কূটনীতির সঙ্গে প্রয়োজন হবে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে মাঠ পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে নদী বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা। আমাদের দেশের জনগণ, গবেষক, পরিবেশবিদ এবং সংশ্লিষ্ট সবার এগিয়ে আসা প্রয়োজন। জাতীয় স্তরে একটি আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে যাতে সবাই এ সমস্যার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন হয় এবং আন্তঃসীমান্ত নদী নিয়ে একটি ন্যায্য সমাধান খুঁজতে সচেষ্ট হয়।