রবিউল কমল
প্রকাশ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১৩:০২ পিএম
আপডেট : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১৪:৩৭ পিএম
অলংকরণ : জয়ন্ত সরকার
চার বছরের রিয়ানা। মাথায় লম্বা চুল বেণি করা থাকে। বুড়ো মামার সঙ্গে তার খুব ভাব। এ মামা কিন্তু মোটেও বুড়ো নয়। ত্রিশ বছরের তরুণ। বড় মামাকে বুড়ো মামা বলে ডাকে। বুড়ো মামার চোখে চশমা। মাথায় কোঁকড়ানো চুল।রিয়ানা থাকে গ্রামে। ছোট্ট গ্রামের চারদিকে সবুজ আর সবুজ। পাখির ডাকে সকাল হয়। পাখির ডাকে সন্ধ্যা নামে। আর বুড়ো মামা থাকে ঢাকা শহরে। চারদিকে দালান আর দালান। গাছ, পাখি ও সবুজ নেই। রিয়ানা শহরে বেড়াতে এসেছে। একদম ভালো লাগছে না শহর। চার দেয়ালে বন্দি থাকতে কার ভালো লাগে? এখানে নীল আকাশ এবং মেঘের ওড়াওড়ি দেখা যায় না। রিয়ানার মন খারাপ হলো বুলবুলি পাখিটার জন্য। তারপর হুহু কান্না! কী আর করা, ওকে নিয়ে গ্রামে রওনা দিল বুড়ে মামা।
রিয়ানাদের উঠোনের সফেদা গাছে বাসা বানিয়েছে বুলবুলিটা। ফুড়ুত ফুড়ুত করে এদিক-সেদিক উড়ে যায়। আবার উড়ে এসে বাসায় ঢোকে। ও বারান্দায় বসে বুলবুলির ওড়াউড়ি দেখে। মাঝে মাঝে মুঠো মুঠো চাল ছিটিয়ে দেয় সফেদা গাছের নিচে। তখন বুলবুলিটা লেজ দোলাতে দোলাতে বাসা থেকে বের হয়। খুঁটে খুঁটে সেই চাল খায়। রিয়ানার তখন খুব আনন্দ হয়। ও খিলখিল করে হাসে। বুলবুলিটা মুখটা তুলে একপলক রিয়ানাকে দেখে নেয়। তারপর আবার চাল খায়।
আজ সকাল থেকে সূর্য ওঠেনি। পুরো আকাশ কালো হয়ে আছে। কালো কালো মেঘ ভেসে যাচ্ছে। টুপটাপ বৃষ্টি হচ্ছে। শনশন বাতাস হচ্ছে। কখনও দমকা বাতাস বয়ে যাচ্ছে। কেঁপে উঠছে রিয়ানাদের ঘরটাও। রিয়ানা বারান্দায় বসে আছে। বুলবুলিটা বাসার মধ্যে বসে আছে। মাঝে মাঝে উঁকি দিচ্ছে। কিন্তু বাইরে বের হচ্ছে না। বাতাস লেগে বাসাটাও দুলে ওঠে। বুলবুলিটা চিউ চিউ করে ডেকে ওঠে। বুড়ো মামা রিয়ানার পাশে এসে বসে। ওর মাথার বেণি ধরে টান দেয়। ও মামাকে জড়িয়ে ধরে।‘মামা, এত জোরে জোরে বাতাস হচ্ছে কেন?’ ‘আজ খুব ঝড় হতে পারে।’
‘ঝড় কী মামা? ‘ঝড় হলে খুব জোরে বাতাস হয়। গাছের ডাল ভেঙে পড়ে! ঘরের চাল উড়ে যায়! ‘বলো কী?’ বলেই ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে রিয়ানা। কিছুই বুঝতে পারে না বুড়ো মামা।‘ কী হলো, তুমি কাঁদছ কেন? ‘ঝড় হলে বুলবুলিটার কী হবে? ওর বাসাটা যদি উড়ে যায়!’
‘বুলবুলির কিছু হবে না।’
‘তুমি সত্যি বলছ তো?
‘হ্যাঁ, আমি সত্যিই বলছি।’
সারা দিন এভাবেই চলল। কখনও দমকা বাতাস। কখনও টুপটুপ বৃষ্টি। রিয়ানা বুলবুলির বাসার দিকে তাকিয়ে ছিল। পাখিটা আজ বেরই হলো না। সন্ধ্যা নামল। তারপর রাত। বাইরে হালকা বৃষ্টি হচ্ছে। রিয়ানা মামার কাছে গল্প শুনছে। পরীর গল্প, ভূতের গল্প, রাখালের গল্প, রাজকন্যার গল্প। কিন্তু ওর মনটা পড়ে আছে বুলবুলির বাসায়! একসময় ঘুমিয়ে পড়ে রিয়ানা।
সারা রাত খুব ঝড় হলো। রিয়ানা ঘুমিয়ে ছিল, কিছুই বুঝতে পারেনি। কিন্তু সকালে উঠে দেখে বাড়ির উঠান গাছের পাতায় ভরে আছে। গাছের ডাল ভেঙে পড়ে আছে। রিয়ানার মনটা কেঁপে ওঠে। ও ছোট্ট ছোট্ট পায়ে সফেদা গাছের নিচে গেল। কিন্তু সেখানে বুলবুলি নেই! বাসাটা নেই! যে ডালে বাসা ছিল সেই ডালটা ভেঙে গেছে!
হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে রিয়ানা। ছুটে আসে বুড়ো মামা।
‘কী হয়েছে রিয়ানা, তুমি কাঁদছ কেন?’
‘বুলবুলির বাসা নেই! বুলবুলি নেই!’
মামা রিয়ানার আরও কাছে আসে। তারপর ওর পাশে বসে। রিয়ানা মামাকে জড়িয়ে ধরে। মামার বুকের মধ্যে ডুকরে ডুকরে কাঁদে। আর বলে, ‘মামা, বুলবুলিটা কই?’
মামা বলল, ‘বুলবুলি আছে। তুমি একটু দাঁড়াও।’
তারপর মামা ঘরে যায়। আর বের হয় হাতে একটি বাসা নিয়ে। রিয়ানা দেখেই চিনতে পারে বাসাটা। ভেতরে বুলবুলি পাখি বসে আছে। রিয়ানা ছুটে যায় মামার কাছে। মামা বুলবুলির বাসাটা ওর হাতে দেয়। ও কিছু সময় সেটা কোলের মধ্যে আগলে রাখে। ছোট্ট রিয়ানার গাল বেয়ে কয়েক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ে।
মামা বাসাটা নিয়ে সফেদা গাছের আরেক ডালে বেঁধে দেয়। তারপর বুলবুলিটা ফুড়ুত করে উড়ে যায়। আবার ফুড়ুত করে উড়ে আসে। রিয়ানা বারান্দায় বসে বসে দেখছে। ওর পাশে বসে আছে বুড়ো মামা।
তোমাদের বলা হলো না, সেদিন রাতে ঝড় শুরু হলে বুড়ো মামা বাসাটা ছিঁড়ে ঘরে নিয়ে রেখে ছিল। যেন বুলবুলিটার কোনো ক্ষতি না হয়। আর রিয়ানা কোনো কষ্ট না পায়।