× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

প্রথম যুগের গণপরিবহন

মাওলা বখ্‌শের মুড়ির টিন

হাসনাত মোবারক

প্রকাশ : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১৩:৪১ পিএম

আপডেট : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১৫:৪১ পিএম

ছবি : ঢাকা কেন্দ্রের সৌজন্যে

ছবি : ঢাকা কেন্দ্রের সৌজন্যে

লক্কড়ঝক্কড় বাস দেখলে প্রায়ই বলতে শোনা যায়-এ তো দেখি মুড়ির টিন। কণ্ঠে থাকে তাচ্ছিল্যের সুর। সে যতই তুচ্ছতাচ্ছিল্য করি এ ‘মুড়ির টিন’ নামটির সঙ্গে মিশে আছে নগর ঢাকার বাস সার্ভিস তথা গণপরিবহনের সূচনাপর্ব। ‘মুড়ির টিন’ নামে পরিচিত ঢাকার প্রথম দিকের বাস সার্ভিসটি শুধু ঢাকার নয়, বাংলাদেশের পরিবহন ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ। ঢাকায় বাস সার্ভিস শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর। বিশেষ করে ঢাকার ভেতরে পরিবহনব্যবস্থা সহজতর করতে এর তুলনা ছিল না। আর যার হাত ধরে ঘটনাটি ঘটেছিল তিনি তৎকালীন ঢাকার পঞ্চায়েত সরদার পেয়ার বখ্‌শের ছেলে মাওলা বখ্‌শ।

বাসগুলোকে মুড়ির টিন বলা হতো এর আকৃতি ও মানের কারণে। সাধারণত ট্রাকের কাঠামোর ওপর বসানো হতো এবং কোনো ধরনের আরাম-আয়েশের সুযোগ ছিল না। আকারে ছিল বেশ ছোট এবং সরু, দেখতে অনেকটা মুড়ি রাখার টিনের মতো। যাত্রীদেরও বসতে হতো খুব গাদাগাদি করে। গাড়ির ভেতর ও বাইরের এমনি চেহারার কারণেই রসিক ঢাকাবাসী মজার এ নামটি দিয়েছিল। কম পয়সায় ঢাকার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে সহজে যাতায়াতের সুযোগ করে দেওয়ায় মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুয়ের কাছে খুব দ্রুতই জনপ্রিয়তা পায় এ বাস সার্ভিসটি। স্থান করে নেয় ঢাকার নাগরিক জীবনের অংশ হিসেবে।

‘কাজির গরু কেতাবে আছে, গোয়ালে নেই।’ প্রবাদটি মনে পড়ল পুরান ঢাকার ফরাশগঞ্জে ‘ঢাকা কেন্দ্র’ নামের সংগ্রহশালায় গিয়ে। বাস্তবে না থাকলেও সংগ্রহশালার গ্যালারিতে সগৌরবে জায়গা করে নিয়েছে একসময়ের জনপ্রিয় মুড়ির টিন বাসের রেপ্লিকা। সেখানে লেখাÑ১৯৩২ সালে ৬৭ নং ফরাশগঞ্জ রোডে মাওলা বখ্‌শ সরদার প্রতিষ্ঠিত ‘ইন্ডিয়া মটর ওয়ার্কশপ’-এর কিছু দুষ্প্রাপ্য যন্ত্রপাতি। জানা গেল, এটিই পূর্ব বাংলার বাঙালি মুসলমান মালিকানাধীন প্রথম অটোমোবাইল ওয়ার্কশপ। সেই স্মৃতিচিহ্ন ধরে রেখেছেন মাওলা বখ্‌শ সরদারের উত্তরসূরিরা।

ঢাকার পঞ্চায়েত সরদার পেয়ার বখ্‌শের ছেলে মাওলা বখ্‌শ বাড়ি পালিয়ে চলে গিয়েছিলেন কলকাতা। সেখানে গিয়ে বেঙ্গল মোটর ওয়ার্কসে শুরু করেন গাড়ি মেরামতের কাজ শেখা। কিছুদিন পর ১৯২৭ সালে ফিরে আসেন ঢাকায়। কাজ নেন বাংলাদেশের প্রথম ওয়ার্কশপ ‘এক্সেল মোটর ওয়ার্ক্স’-এ। এর মালিক ছিলেন ইংরেজ সাহেব প্যান পুশম্যান। এ ইংরেজ মালিক দক্ষ বাঙালি যুবক মাওলাকে অত্যধিক স্নেহ করতেন। ১৯২৯-৩০ সালের দিকে ওয়ার্কশপটি বন্ধ হয়ে গেলে পুশম্যান তার ওয়ার্কশপের যন্ত্রপাতি মাওলাকে উপহার দিয়ে যান। সেগুলো দিয়েই ১৯৩২ সালে ৬৭ ফরাশগঞ্জ রোডে গড়ে তোলেন ‘মেসার্স ইন্ডিয়া মোটর ওয়ার্কশপ’। পরে ওয়ার্কশপটি স্থানান্তর হয় লক্ষ্মীবাজারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘মাওলা বখ্‌শ এন্ড সন্স’।

মিত্রবাহিনী বিশেষ করে মার্কিন বাহিনী অনেক গাড়ি ও ট্রাক বিক্রির জন্য নিলামে তোলে। এসব গাড়ি কিনে সেগুলোয় বডি তৈরি করে রূপান্তর করা হয় বাসে। এসব বাসের বডি কাঠের ফ্রেমের সঙ্গে টিন মুড়ে দিয়ে তৈরি হতো। বাসে ছিল না কোনো ইলেকট্রনিক বা হাইড্রোলিক হর্ন। চালকের পাশে দরজার সঙ্গে ভেঁপু বা হর্ন লাগানো থাকত। চালক হাত দিয়ে চেপে এ হর্ন বাজাতেন। আবার অনেক বাসে পিতলের হর্ন ব্যবহার করা হতো। বাসগুলো মূলত ঢাকা শহরে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চলাচলের জন্য ব্যবহার করা হতো। দূরপাল্লার পরিবহন হিসেবে মুড়ির টিন বাস ব্যবহার হতো না। চকবাজার, গুলিস্তান, সদরঘাট, নবাবপুর, ইসলামপুর এসব জায়গায় চলত মুড়ির টিন। এরপর নারায়ণগঞ্জ, ফতুল্লা, মিরপুর, আরিচা, ডেমরা, রামপুরা, কালিয়াকৈর ও নয়ারহাট রুটেও চলাচল শুরু করে। মুড়ির টিন সর্বশেষ বাহাদুর শাহ পার্ক বা সদরঘাট থেকে রামপুরা-কুড়িল ও গাজীপুর থেকে সায়েদাবাদ রুটে নিয়মিতভাবে চলাচল করতে দেখা গেছে। বাহাদুর শাহ পার্কের পেছনে ছিল বাসস্ট্যান্ড। সেখান থেকে ছেড়ে চিত্রামহল, নাজিরাবাজার, ফুলবাড়িয়া, গুলিস্তান, পল্টন হয়ে রামপুরা যেত বাসগুলো। যশোর, বেনাপোল, সিলেট, চট্টগ্রাম, খুলনাসহ বড় শহরগুলোতেও চলত মুড়ির টিন।

লেখক ও গবেষক স্থপতি শামীম আমিনুর রহমান জানান, ঢাকায় ত্রিশের দশকে জনসাধারণের জন্য ট্যাক্সি সার্ভিস শুরু হয়। এরপর অনেকেই পরিবহন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হন। এদের প্রথম দিকে ছিলেন সরদার মাওলা বখ্‌শ এবং হাবিবুর রহমান খান। মাওলা বখ্‌শের গাড়িগুলো চলত ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা-কালিয়াকৈর, ঢাকা-নয়ারহাট, ঢাকা-মিরপুর ও ঢাকা-ডেমরা রুটে।

মাওলা বখ্‌শের ছেলে আজিম বখ্‌শ বলেন, মাওলা সরদার প্রায় ২০টি পুরাতন গাড়ি নিয়ে পরিবহন ব্যবসা শুরু করেন। তখনকার জনপ্রিয় হিন্দি সিনেমার নাম অনুসারে এসব বাসের নাম রাখা হতো। মাওলা বখ্‌শ এন্ড সন্স কোম্পানির গাড়িগুলোর নাম ছিল কিসমত, পুকার, আজাদ ইত্যাদি।

১৯৬৮ সালে এ ওয়ার্কশপটি বন্ধ হয়ে যায়। ঢাকার রাস্তায়ও আজ সেই বাস নেই। কিন্তু ঢাকাবাসীর স্মৃতিতে রয়ে গেছে মুড়ির টিন। আছে ঢাকার ঐতিহ্যের অংশ হয়ে।

একনজরে মাওলা বখ্‌শ সরদার

১৯০৯ সালে ঢাকার সূত্রাপুরের ওয়ালটার রোডে সরদার পরিবারে মাওলা বখ্‌শের জন্ম। বাবা পিয়ার বখ্‌শ ছিলেন পঞ্চায়েত সরদার। প্রাথমিক শিক্ষা শুরু ধীরেন্দ্র সেন লেনের এক টোলে। ইস্টবেঙ্গল ইনস্টিটিউট থেকে মাধ্যমিক পাশ। মাওলা বখ্‌শ মোটর মেকানিকের পাশাপাশি ইটের ভাটা ও লবণ কারখানার ব্যবসাও খুলেছিলেন। বাবা পিয়ার বখ্‌শ ১৯৪১ সালে মারা গেলে ১৯৪৪ সালে ঢাকার নবাব কর্তৃক ‘বাইস’ পঞ্চায়েতের সরদার মনোনীত হন মাওলা বখ্‌শ। তখন থেকে এলাকার জনপ্রতিনিধি হিসেবে নিজেকে নিবেদিত করে রাখেন মাওলা। ১৯৫৬ সালে ‘গেন্ডারিয়া বাবা বাড়ি’ সংযোগ সড়ক নির্মাণ করেন। একই বছরে দেশে খাদ্য সংকট দেখা দিলে ব্যক্তিগত উদ্যোগে চালু করেন লঙ্গরখানা। 

১৯৫৬-৫৭ সালে ঢাকার পানি সরবরাহ ব্যবস্থা বিকল হয়ে পড়ে। মানুষ পানির জন্য হাহাকার করতে থাকে। পানি সরবরাহ সচল করতে ব্রিটিশ কারিগররা ৪ লাখ টাকার দরপত্র দেন। তখন মাওলা বখ্‌শ মাত্র কয়েক হাজার টাকায় তা সমাধান করে দেন। তৎকালীন পৌর চেয়ারম্যান মঈনুদ্দীনকে নিয়ে গড়ে তোলেন ‘লালকুঠি কমিউনিটি সেন্টার’। তখনকার দিনে এটিই একমাত্র মিউনিসিপ্যাল কমিউনিটি সেন্টার। ১৯৬৮ সালে লালকুঠিতেই এলাকাবাসীর শিক্ষা বিস্তারের জন্য মাওলা বখ্‌শ নতুন উদ্যমে চালু করেন ‘নর্থব্রুক হল লাইব্রেরি’। প্রতিষ্ঠা করেন কাগজীটোলা সোশ্যাল ক্লাব, সূত্রাপুর স্পোর্টিং ক্লাব, লক্ষ্মীপুর বসাক লেনের জাগৃতি সংঘ। পরপর তিনবার-১৯৫১, ১৯৬২ ও ১৯৬৫ সালে ঢাকা পৌরসভার কমিশনার নির্বাচিত হন মাওলা বখ্‌শ। ১৯৭০ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত তিনি ইউনিয়ন কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। সমাজসেবা এবং উদ্যোক্তার পাশাপাশি তিনি একজন শৌখিন মানুষ ছিলেন। তখনকার দিনে ঢাকায় দুজনের মোটর সাইকেল ছিল। একটি ছিল ব্রিটিশ ম্যাজিস্ট্রেটের, অন্যটি মাওলা বখ্‌শের। তিনি নিজ উদ্যোগে বেড়ানোর জন্য একটি মোটর লঞ্চ তৈরি করেছিলেন। এটি চালু হতো পেট্রল দিয়ে কিন্তু চলত কেরোসিনে। মোটর মেকানিক থেকে ঢাকার পঞ্চায়েতের সরদার মাওলা বখ্‌শ ১৯৮৭ সালের ১৫ জানুয়ারি পরলোকে পাড়ি জমান।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা