এক দেশে এক রাজা ছিলেন। তিনি ছিলেন ভীষণ খারাপ রাজা। প্রজাদের খুব অত্যাচার করতেন। সকলে ভয়ে রাজার কথা মেনে চলত। কিন্তু ইশকুলে যারা পড়ে, তাদের ভয় নেই। তারা রাজার খারাপ কথা মানত না। তারা রাজাকে বলত, তুমি যা বলছ, তা ঠিক বলছ না।
একবার দেশে প্রচণ্ড ঝড় হলো। মানুষজনের ঘরবাড়ি ভেঙে গেল। খাবারের অভাব দেখা দিল। চারদিকে হাহাকার শুরু হলো। অন্যান্য দেশ থেকে মানুষজনের জন্য অনেক সাহায্য এলো। খাবার এলো, ঘর বানানোর জিনিসপত্র এলো। কিন্তু রাজা মানুষজনকে কিছু দিলেন না। রাজা আর রাজার লোকজন সেই সব খাবার আর ঘর বানানোর জিনিস নিজেরা ভাগ করে নিলেন।
দেশের মানুষজনের ঘর নেই। তারা খোলা আকাশের নিচে থাকে। তাদের খাবার নেই। তারা কেউ না খেতে পেয়ে মরে গেল। কেউ গাছের পাতা আর বৃষ্টির পানি খেয়ে কোনোরকমে বেঁচে থাকল। রাজার ভয়ে কেউ কিছু বলতে পারল না। কিন্তু ইশকুলে পড়া ছেলেমেয়েরা তো রাজাকে ভয় পায় না। তারা খুব সাহসী। তারা রাজাকে বলল, তুমি যা করছ, তা ঠিক করছ না। তুমি আমাদের খাবার দাও, ঘর দাও।
রাজা রেগে গেলেন। তিনি বললেন, আজ থেকে সব ইশকুল বন্ধ।
রাজা ঘোষণা দিলেন যেখানে যত ইশকুলের বই-খাতা আছে সব এনে নদীতে ডুবিয়ে দাও। কারও কাছে বই-খাতা, কাগজ-কলম পাওয়া গেলে তাকে কঠিন শাস্তি দেওয়া হবে।
ইশকুল বন্ধ হয়ে গেল। রাজার লোকজন এসে দেশের সব বই-খাতা, কাগজ-কলম নিয়ে গিয়ে নদীতে ফেলে দিল। রাজার ভয়ে কেউ কিছু বলতে পারল না। ইশকুলে পড়া ছেলেমেয়েরাও কিছু বলতে পারল না। কথা বললে রাজা তাদের ভয়ংকর শান্তি দেবে ভেবে বাবা-মা ছেলেমেয়েকে চুপ করে থাকতে বললেন।
তাতে সপ্তর্ষির ভয়ানক মন খারাপ হলো। সে সবে ইশকুলে ভর্তি হয়েছে। তার লেখাপড়া করার প্রবল ইচ্ছে। কিন্তু রাজা তো সব ইশকুল বন্ধ করে দিয়েছেন। তার আর লেখাপড়া করা হবে না। তবে সপ্তর্ষি মন খারাপ করে থাকল না। সে বুদ্ধি বের করে ফেলল।
সপ্তর্ষি গাছ থেকে পাতা নিয়ে এলো। তাই দিয়ে শিখে ফেলল, দুটো পাতা আর দুটো পাতা একসঙ্গে করলে চারটে পাতা হয়। আবার ছয়টা পাতা থেকে দুটো পাতা সরিয়ে নিলেও চারটে পাতা হয়। সপ্তর্ষিকে এমনভাবে শেখাতে থাকলেন মা।
মাটির ওপর কাঠি দিয়ে লেখা শিখে ফেলল সপ্তর্ষি। সে লিখল অ, আ, ই, ঈ। আবার ক, খ, গ, ঘ, ঙ সব। মা বললেন, ঘরের দেয়াল তোমাকে দিয়ে দিলাম। আর এই নাও লেখার জন্য, বলে মা সপ্তর্ষির হাতে এক টুকরো কাঠকয়লা তুলে দিলেন।
সপ্তর্ষি সেই কাঠকয়লা দিয়ে ঘরের দেয়ালে লিখল, অজগর ওই আসছে তেড়ে। আমরা তাকে ধরব ঘিরে।
লিখতে লিখতে বাড়ির সব ঘরের দেয়াল ভরে উঠল। আর লেখার কোনো জায়গা থাকল না। সপ্তর্ষি ভাবল, ইস্, আমার যদি লেখার একখানা খাতা থাকত!
সেই রাতে সপ্তর্ষি অদ্ভুত স্বপ্ন দেখল। কেউ একজন তাকে বলছে, শোনো মেয়ে, তোমার ওপর খুশি হয়েছি আমি। তুমি লেখাপড়া করতে ভালোবাসো। এই নাও খাতা। এই খাতার পাতায় তুমি যা লিখবে তাই সত্যি হয়ে যাবে।
সপ্তর্ষি ভেবেছিল স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু ঘুম ভেঙে দেখে সত্যি তার বালিশের পাশে একখানা খাতা। আর সে খাতার পাতায় যা লিখল তাই হয়ে যেতে থাকল। যার খাবার নেই তার খাবার হলো। যার ঘর নেই তার ঘর হলো।
ঘটনা জেনে গেলেন রাজা। তিনি লোক পাঠিয়ে খাতাসহ বন্দি করে নিয়ে গেলেন সপ্তর্ষিকে। বললেন, তোমার খাতার পাতায় লেখÑ রাজা আর তার লোকজন কোনোদিন মরবে না।
রাজা নিজের লোকজন নিয়ে অমর হতে চাইলেন। সপ্তর্ষি খাতার পাতায় তাই লিখল। রাজা খাতার পাতা হাতে নিয়ে অমর হতে পারার আনন্দে কেঁদে ফেললেন। তখন তার দুই চোখ থেকে টপটপ করে দুফোঁটা পানি পড়ল খাতার পাতায়। এক ফোঁটা পানি পড়ল ‘কোনোদিন’ শব্দের ওপর আর আরেক ফোঁটা পানি পড়ল ‘না’ শব্দের ওপর। তাতে খাতার পাতায় লেখা হয়ে গেল, রাজা আর তার লোকজন মরবে। অমনি রাজা আর তার লোকজন সবাই মরে গেল। মা বললেন, কখনও লোভ করতে হয় না। লোভ করলে তার মৃত্যু হয়।
দুষ্টু রাজার মৃত্যুর পর মানুষজন নিজেদের ভেতর থেকে একজন ভালো মানুষকে রাজা বানাল। তারপর তারা সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে থাকল।