ফারহাত মাইশা
প্রকাশ : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১২:২১ পিএম
আন্তর্জাতিক ইনফরম্যাটিক্স অলিম্পিয়াডে স্বর্ণপদক জিতেছেন দেবজ্যোতি দাস সৌম্য। এ ছাড়া শিক্ষার্থী জারিফ রহমান ও আকিব আজমাইন তূর্য ব্রোঞ্জ পদক অর্জন করেছেন
আন্তর্জাতিক ইনফরম্যাটিক্স অলিম্পিয়াডে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে স্বর্ণপদক জিতেছেন সিলেটের জালালাবাদ ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র দেবজ্যোতি দাস সৌম্য। এ ছাড়া শিক্ষার্থী জারিফ রহমান ও আকিব আজমাইন তূর্য ব্রোঞ্জ পদক অর্জন করেছেন
৩৬তম আন্তর্জাতিক ইনফরম্যাটিক্স অলিম্পিয়াডে (আইওআই) প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে স্বর্ণপদক জিতেছেন সিলেটের জালালাবাদ ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র দেবজ্যোতি দাস সৌম্য। এ ছাড়া রাজশাহীর শাহ্ মখদুম কলেজের শিক্ষার্থী জারিফ রহমান ও ফরিদপুর ইয়াসিন কলেজের শিক্ষার্থী আকিব আজমাইন তূর্য ব্রোঞ্জ পদক অর্জন করেছেন। প্রোগ্রামিং ভাষা সি ও সি প্লাস প্লাস-এ সমস্যার সমাধন দিয়ে এ সম্মাননা জিতেছেন তারা।
আইওআই ওয়েবসাইটে এ ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে। ফলাফলে দেখা গেছে, দুই দিনে ৫ ঘণ্টা করে অনুষ্ঠিত সেশনে বিশ্বের মোট ৩০ জন স্বর্ণপদক জিতেছেন। এর মধ্যে বাংলাদেশে সৌম্য ৬২.৫৭ শতাংশ সঠিক সমাধান দিয়েছেন। প্রতেযোগিতায় রুপাজয়ী হয়েছেন ৬৯ জন। আর ব্রোঞ্জজয়ীর সংখ্যা ৮৮। এর মধ্যে লাল-সবুজের পতাকা গায়ে ব্রোঞ্জজয়ী জারিফ ৪০.৩৭ ও তূর্য ৩৬.৩৩ শতাংশ সঠিক সমাধান দিয়েছেন। স্বর্ণপদক জয়ী দেবজ্যোতি Codeforces-এ একজন রেড কোডারও! গত বছরই মাত্র ১৫ বছর বয়সে দেশের সর্বকনিষ্ঠ গ্র্যান্ডমাস্টার তকমা পান কোডফোর্সেসে। সিলেটের জালালাবাদ ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র দেবজ্যোতি দাস সৌম্যর গল্পের শুরু সেই ছোটবেলায়, সমস্যার সমাধান বা প্রবলেম সলভিংয়ে প্রচণ্ড আনন্দ পান এ তরুণ। তার রেশ ধরেই সপ্তম শ্রেণিতে থাকা অবস্থায় বড় ভাইকে দেখে দেখে নিজেও কোডিং শেখা শুরু করেন।
বিজয়ীদের অভিনন্দন জানিয়েছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা মো. নাহিদ ইসলাম। উপদেষ্টা বলেন, ‘বাংলাদেশের তরুণ মেধাবী শিক্ষার্থীদের এ অর্জন আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের সম্মান বৃদ্ধি করেছে। আমি এ অর্জনে অত্যন্ত আনন্দিত। বাংলাদেশের তরুণরা তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ এবং আগ্রহী এটাই তার প্রমাণ।’ দেশে আসার পর বাংলাদেশ দলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার আগ্রহ ব্যক্ত করেছেন উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম।
মিসরের আলেকজান্দ্রিয়ার আরব অ্যাকাডেমি ফর সায়েন্স, টেকনোলজি অ্যান্ড মেরিটাইম ট্রান্সপোর্টে অনুষ্ঠিত এ আসরে অংশ নেন বাংলাদেশ দলের চার সদস্য। এর মধ্যে স্বর্ণজয়ী সৌম্য ২০২২ সালে ব্রোঞ্জ এবং ২০২৩ সালে রৌপ্যপদক জিতেছিলেন। আর ব্রোঞ্জজয়ী জারিফ ২০২৩ সালেও একই পদক এবং ২০২২ সালে পেয়েছেন অনারেবল মেনশন। আর তূর্য এবারই প্রথম পদক জিতলেন। ১ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া এ আসর শেষ হওয়ার কথা ৮ সেপ্টেম্বর। প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া অন্য সদস্য হলেন দেশ আচার্য। দলনেতা হিসেবে আছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সিএসই বিভাগের অধ্যাপক এম সোহেল রহমান।
প্রথমবার আন্তর্জাতিক ইনফরম্যাটিক্স অলিম্পিয়াড ১৯৮৯ সালে অনুষ্ঠিত হয়েছিল বুলগেরিয়ায়। ২০ বছরের কম বয়সি যারা কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হননি, তারাই এ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে পারেন। আন্তর্জাতিক পর্বে দুই দিন ধরে প্রতিযোগিতাটি অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিদিন প্রত্যেক প্রতিযোগীকে চারটি করে সমস্যা দেওয়া হয়। সমাধান করার জন্য সময় থাকে ৫ ঘণ্টা। এ সময় প্রতিযোগীরা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করতে এবং কোনো বই থেকেও সহায়তা নিতে পারেন না। সমস্যার সমাধান করতে হয় প্রোগ্রামিং ভাষা সি অথবা সি প্লাস প্লাস।
২০ বছর ধরে আন্তর্জাতিক ইনফরম্যাটিক্স অলিম্পিয়াডে অংশগ্রহণ করে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের জয় করা পদকসংখ্যা মোট ৩২টি। এর মধ্যে এবার প্রথম ১টি স্বর্ণপদক এসেছে। এটা ছিল ২০০৪ সালের পর এ ইভেন্টে বাংলাদেশের প্রথম স্বর্ণজয়। এ ছাড়া বাংলাদেশের আছে সিলভার পদক ৬টি, ব্রোঞ্জপদক ২৪টি এবং অনারেবল মেনশন ১টি। আইওআই বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাই স্কুল ইনফরম্যাটিক্স (কম্পিউটার সায়েন্স) প্রতিযোগিতা। শিক্ষার্থীরা প্রোগ্রাম লিখে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জিং সমস্যার সমাধান করেন। প্রতিযোগিতার সমস্যাগুলো অ্যালগরিদমিক হয়ে থাকে; যদিও প্রতিযোগীদের সমস্যা বিশ্লেষণ, প্রয়োজনীয় অ্যালগরিদম পরিকল্পনা, ডেটা স্ট্র্যাকচার, প্রোগ্রামিং, সমাধান যাচাই করার কিছু মৌলিক দক্ষতা দেখাতে হয়। আইওআইয়ের বিজয়ীরা সন্দেহাতীতভাবে পৃথিবীর সেরা তরুণ কম্পিউটারবিজ্ঞানী।
প্রথমবার আইওআই অনুষ্ঠিত হয় বুলগেরিয়ায় ১৯৮৯ সালে। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা (ইউনেসকো) এটির প্রস্তাব দেয়। আইওআই আটটি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান অলিম্পিয়াডের মধ্যে একটি। বাকি সাতটি হচ্ছে গণিত আইঅ্যামও (১৯৫৯ থেকে), পদার্থবিজ্ঞান আইপিএইচও (১৯৬৭ থেকে), রসায়ন আইসিএইচও (১৯৬৮ থেকে), জীববিজ্ঞান আইবিও (১৯৯০ থেকে), জ্যোতির্বিদ্যা আইএও (১৯৯৬ থেকে), ভূগোল আইজিইও (১৯৯৬ থেকে) এবং আন্তর্জাতিক ভাষাতত্ত্ব অলিম্পিয়াড আইএলও (২০০৩ থেকে)। সবকটি প্রতিযোগিতাই স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত, যাদের বয়স ২০-এর কম। প্রতিটি দেশ একটি অফিসিয়াল প্রতিনিধি দল নিয়ে আইওআইতে অংশগ্রহণ করে, যেখানে থাকে চারজন প্রতিযোগী (শিক্ষার্থী), একজন দলনেতা এবং একজন সহদলনেতা। যাদের বয়স ২০-এর কম এবং যারা কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হননি তারাই এ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের যোগ্য। ২০০৫ সালে প্রথমবারের মতো বিডিওআই অনুষ্ঠিত হয়েছিল। আইওআইয়ের লক্ষ্য হলো একত্র করা, চ্যালেঞ্জ দেওয়া এবং পৃথিবীর তরুণ মেধাবী ইনফরম্যাটিক্স (কম্পিউটার সায়েন্স)-এ প্রতিভাধর শিক্ষার্থীদের পরিচিতি দেওয়া এবং ভিন্ন সংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠা শিক্ষার্থীদের মাঝে মেলবন্ধন তৈরি করা। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের এইচএসসি শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে হাই স্কুলের শিক্ষার্থী এবং প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারেন।