মোস্তাফিজুর রহমান
প্রকাশ : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১১:৫৪ এএম
আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১২:১৩ পিএম
বন্যাকবলিত একটি ভবনের সিঁড়ি থেকে শিশুটিকে উদ্ধার করে মায়ের কাছে পৌঁছে দেন স্বেচ্ছাসেবী মোস্তাফিজুর ছবি: লেখকের সৌজন্যে
একটানা ১২ ঘণ্টা উদ্ধারকাজ চালিয়ে আমরা যখন অনেক ক্লান্ত, তখনই শিশুটিকে আমরা উদ্ধার করি। তাকে উদ্ধার করতেই আমাদের মনে হচ্ছিল, সব ক্লান্তি যেন দূর হয়ে গেছে। শিশুটি কান্না করছিল না, কিন্তু আমরা না গেলে হয়তো কিছুক্ষণের মধ্যে পানিতে ভেসে যেত।
২১ আগস্ট সকালে হঠাৎ বেশকিছু ভিডিও ফেসবুকে দেখি- ফেনীতে পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে, শিশুরা পানিতে ভাসছে। তখনই স্থির করলাম ফেনীতে যাব, মানুষ বাঁচাতে। বেশ কয়েকজনকে বললাম যাওয়ার জন্য, কেউ আগ্রহ দেখায়নি; কিন্তু যেতেই তো হবে মানুষ বাঁচাতে। আমাদের সুইচ বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের দুজন কাছের বন্ধুসুলভ স্বেচ্ছাসেবককে রাজি করালাম। কিন্তু পকেটশূন্য, ওই মুহূর্তে একদম শূন্য। হঠাৎ যাওয়ার মতো কোনোরকম টাকা নেই। সুইচ বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের অন্য একটি প্রজেক্টের কিছু টাকা নিয়েই বেরিয়ে যাই। সঙ্গে গুলিস্তান থেকে কিনে নিয়েছি দুটি লাইফ জ্যাকেট। নৌকা ও স্পিডবোটের খোঁজ করেছিলাম ঢাকার বিভিন্ন জায়গায়, গিয়েছি মেঘনাঘাটেও।
মেঘনা থেকে ফেনী যেতে একটা পিকআপ রাজি হয়। সেটা আবার কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট পর্যন্ত যাবে, উঠে পড়লাম। ওখানে গিয়ে বহু চেষ্টার পর আমরা উঠে যাই আরেকটি পিকআপে, পরে কথা বলে জানতে পারি উনি মূলত নৌকা নিচ্ছেন ফেনীতে বিক্রি করার জন্য। কিছুদূর পার হওয়ার পর প্রচুর জ্যাম, রাস্তার কোনো অংশ ডুবে গেছে তাই দুই পাশেই হাইওয়ে রোডে জ্যাম। বেশকিছু স্বেচ্ছাসেবক এবং সেনাবাহিনীর গাড়ি যাচ্ছে উদ্ধার করতে। আমরা নেমে সেনাবাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে ওনাদের সহযোগিতা নিয়ে গাড়ির দুই পাশে চাপিয়ে ইমারজেন্সি লেন তৈরি করা ছাড়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। প্রায় ১০ কিলোমিটার রাস্তা বিকাল থেকে হেঁটে সেনাবাহিনীর সহযোগিতা এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবীর অংশগ্রহণে আমরা ইমারজেন্সি লেন তৈরি করি (বিকাল ৪টা থেকে রাত ১০টা বেজে যায় লেন তৈরি করতেই)। হাইওয়ে রোড থেকে ফেনীর রাস্তায় ঢুকেই আরেক বিপদ। রাস্তার ওপর বেশ পানি, পিকআপ যেতে চাচ্ছে না, ঝগড়াঝাঁটি করে পিকআপ নিয়ে শহরে মিজান রোড এলাম। চারদিকে অন্ধকার, বিদ্যুৎ নেই, মোবাইলে নেটওয়ার্ক নেই, সব দোকানপাট বন্ধ, কিছু স্বেচ্ছাসেবক এসেছেন এবং সেনাবাহিনীর স্পিডবোট নামাচ্ছে তখন। কিন্তু আমরা তো সঙ্গে কিছু নিয়ে আসিনি; মিজান রোডে কোমরপানি! আমরা যে পিকআপে এসেছিলাম উনি চারটি নৌকা এনেছিলেন বিক্রি করার জন্য। সেগুলো পানিতে নামালাম। মালিককে বললাম আপনি কাস্টমার দেখেন আমরা দুটি নৌকা নিয়ে একটু ঘুরে আসি। ঘুরে আসার কথা বলে বিভিন্ন গলিতে ঢুকে যাই। পানির স্রোত এত বেশি যে ডিঙি চালানো বেশ কষ্ট হচ্ছিল, তখন নৌকা থেকে নেমে গলাপানিতে হেঁটে হেঁটে হাতে টেনে নিয়ে যাচ্ছি নৌকা। চারপাশে মানুষের আর্তচিৎকার বিশুদ্ধ পানির জন্য এবং বাঁচানোর জন্য। আমাদের পরিকল্পনা ছিল নৌকা যেহেতু নেই, কেনার মতো টাকাও নেই; টাকা যে নেব যোগাযোগ করতেও পারছি না; নৌকা নিয়ে আমরা পালাব ওনার নম্বর রেখেছিলাম পরে টাকা দিয়ে দেব বলে। কিন্তু উনি অপরিচিত এভাবে তো দেবেন না তাই নৌকা নিয়ে ভেতরে ঢুকে যাই। তখন ১২টা বাজে। আমরা তিনজন। একজনের কাছে ব্যাগ, মোবাইলগুলো রেখে একটা নির্দিষ্ট জায়গায় থাকতে বলেছি।

আমাদের সঙ্গে কিছু শুকনো খাবার, মেডিসিন, রাস্তা থেকে নিয়ে গিয়েছিলাম কিছু পানি; সেগুলো নিজেদের খাবারের জন্য। সব বিলি করে দিই। হঠাৎ দেখি এক গলিতে একজন বৃদ্ধ লোক আমাদের নৌকা দেখে ডাকতেছেÑবাবা আমাকে বাঁচাও অনুরোধ করছি, আমি সেনাবাহিনীর রিটায়ার্ড অফিসার। কাছে গিয়ে দেখি ডুবে ডুবে উনি বাসার দিকে যাচ্ছেন। উনি বললেন আমার পরিবার এখানে তিন তলায় রয়েছে, আমি ঢাকা থেকে এসেছি, ওদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নাই। কিন্তু এখন আর পানির কারণে যেতে পারছি না বাসায়। যে পরিমাণ পানি এবং স্রোত দেখলাম মুরুব্বি মানুষ কোনোভাবেই যেতে পারবেন না, উনি বারবার বলতেছিলেনÑমরলে একসাথে মরব পরিবারসহ, শুধু আমার বাসায় দিয়ে আসো। ধরে নৌকায় ওঠালাম।
প্রায় ২ কিলোমিটার স্রোতের বিপরীতে নৌকা নিয়ে বহু কষ্ট করে বাসার কাছে গিয়ে দেখি বাসার এক তলা পর্যন্ত ডুবে গেছে; গেট খুঁজে পাচ্ছি না ভেতরে ঢোকার, আমরা ডুবে ডুবে খুঁজে বের করে বহু কষ্টে বাসায় পৌঁছে দিলাম। নৌকা সামনে বাড়াতেই দেখি একটি ছেলে কান্না করতেছে। বলতেছে- আমার বোনের বাড়ি ডুবে গেছে। ওনাদের কোনো খুঁজ পাচ্ছি না, কোনো যোগাযোগ নাই, আছে কি না মারা গেছে জানিও না। ওনাকে সঙ্গে করে ধীরে ধীরে নৌকা নিয়ে বাসায় গিয়ে দেখি এক তলা বিল্ডিংয়ের ওপর পানির ট্যাংকির ওপর উঠে বসে আছে তিনজন শিশুসন্তানসহ। আমাদের নৌকা ছোট হওয়ায় এতগুলো একসঙ্গে বসলে ডুবে যাবে তাই দুই বারে ওনাদের উদ্ধার করে পৌঁছে দিয়েছি শহরের মেইন রোডে।
রাত প্রায় ৪টা। সেনাবাহিনী কিছু ত্রাণ এবং পানি নিয়ে যাচ্ছে স্পিডবোটে। ওনাদের কাছ থেকে আমরা কিছু নিয়ে আমরাও যাচ্ছি। স্পিডবোট ছোট গলি দিয়ে ঢুকতে পারে না, আমরা নৌকা নিয়ে ঢুকতে পারতেছিলাম। রাত ৪টার পর হঠাৎ একজন মহিলার চিৎকার শুনতে পাই। ওনার প্রসবব্যথা শুরু হয়েছে। পাগলের মতো করতেছিলেন। আমরা দুজন ভয় পেয়ে যাই; মনে শক্তি নিয়ে গিয়ে কোলে করে নিয়ে নৌকায় আসি। ওনাকে নৌকায় শুইয়ে দিয়ে আমরা পানিতে সাঁতরে নৌকা টেনে নিয়ে হসপিটালে নিয়ে যাই। পানিতে যখন ভাসছি দুর্গন্ধ, বাথরুমের ময়লা নাকের কাছ দিয়ে যাচ্ছে, মাঝেমধ্যে মুখেও ঢুকে যাচ্ছে কিন্তু একবারের মতোও খারাপ লাগেনি। কারণ মানুষকে উদ্ধার করতেছি। সারা রাত গেল কোনো ঘুম নেই, খাওয়া নেই এভাবে, সকালে একজন ডাকতেছে সিঁড়ির মধ্যে একটা বাচ্চা পড়ে রয়েছে।
বাবা-মা কেউ নেই, পানি ছুঁইছুঁই অবস্থা। একটানা ১২ ঘণ্টা উদ্ধারকাজ চালিয়ে আমরা যখন অনেক ক্লান্ত, তখনই শিশুটিকে আমরা উদ্ধার করি। তাকে উদ্ধার করতেই আমাদের মনে হচ্ছিল, সব ক্লান্তি যেন দূর হয়ে গেছে। শিশুটি কান্না করছিল না, কিন্তু আমরা না গেলে হয়তো কিছুক্ষণের মধ্যে পানিতে ভেসে যেত। শিশুটিকে আমরা কোলে করে নৌকায় নিয়ে বসাই। পাশের বিল্ডিংয়ে জিজ্ঞেস করি শিশুটি কার, শিশুটির বাবা ছিল না, মা সাঁতার জানে না, এখানে শুইয়ে রেখেই কোথায় যেন গেছেন আর সন্তানকে নিতে পারেননি। আমরা আশপাশের কয়েক বিল্ডিং খুঁজে শিশুটির মায়ের কাছে পৌঁছে দিয়েছি। তারপর উদ্ধার করে শহরে নিয়ে এসেছি।
২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১ মিনিটের জন্যও বসার সুযোগ হয়নি। ৩৫ জনকে উদ্ধার করেছি, রাতে এত ভয়ংকর পরিস্থিতি ছিল যে পানির ছবি ভিডিও করা সম্ভব হয়নি। বেশিরভাগ মানুষ ত্রাণ বিতরণ করেছে রাস্তার পাশে, কিন্তু আমরা কষ্ট করে নৌকা দিয়ে ভেতরে বাসায় গিয়ে পৌঁছে দিয়েছি। আমরা কাজ করেছি ফেনী শহরে, আলোকদিয়ার ভেতরে, লালপোল, ছাগলনাইয়া, লক্ষ্মীপুরে।