প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১২:৫৬ পিএম
আপডেট : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১০:১০ এএম
মার্স রোভার টিম ‘মঙ্গলবারতা’
আনাতোলিয়ান রোভার চ্যালেঞ্জে বাংলাদেশ দল মঙ্গলবারতার জয়জয়কার। রানার্সআপ হওয়ার পাশাপাশি জিতে নিয়েছে বিশেষ পুরস্কার
আনাতোলিয়ান রোভার চ্যালেঞ্জ (ARC) ২০২৪-এ রানার্সআপ এবং এআরসি জুনিয়র ২০২৪ এক্সপ্লোরেশন চ্যালেঞ্জে চ্যাম্পিয়ন শিরোপা জিতেছে বাংলাদেশের মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (MIST)-এর মার্স রোভার টিম ‘মঙ্গলবারতা’। স্পেস এক্সপ্লোরেশন সোসাইটি (UKET)-এর পৃষ্ঠপোষকতায় ১৭ থেকে ২১ জুলাই পর্যন্ত তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারার মিডল ইস্ট টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটিতে অনুষ্ঠিত হয় ARC’24। মোট ২৩৫.১৮ পয়েন্ট অর্জন করে তারা ২১টি টিমের মধ্যে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে। এ ছাড়া দলটির দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের কারণে তারা জিতে নেয় ‘বেস্ট টিম স্ট্রাকচার’-এর জন্য ARC স্পেশাল প্রাইজ। এ বিশেষ পুরস্কারটির বিচারক ছিলেন নাসার ডিপ স্পেস কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ার উমুত ইলদিজ।
এমআইএসটির মঙ্গলবারতা প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন প্রকৌশল বিভাগের ৩৮ জন শিক্ষার্থী নিয়ে গঠিত। তাদের সর্বশেষ রোভার ম্যাভেরিকের সঙ্গে এ বছরের এআরসি চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছে। তাদের মধ্যে ছয়জন তুরস্কে দলের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। দলটির নেতৃত্বে ছিলেন কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের মো. জাওয়াদুর রহমান, সহ-নেতা ছিলেন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং (এমই) বিভাগের আলামিন রশিদ তারেক। দলের অন্য সদস্যদের মধ্যে ছিলেন লেফটেন্যান্ট মো. সরোয়ার মোর্শেদ (সিএসই), ইসতিয়াক আহমেদ আরিক (সিএসই), রাইসুল ইসলাম রাহাদ (সিএসই) এবং আহমেদ আহনাফ সাকাফী (এমই)। দলটি তাদের অনুষদ উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট কর্নেল মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম (সিএসই), মেজর মো. শওকত আলী (সিএসই) এবং প্রভাষক শাহ মো. আহসান সিদ্দিক (এমই) দ্বারা পরিচালিত হয়েছিল।
অন্যদিকে ARC জুনিয়র ২০২৪ টিমের নেতৃত্বে ছিলেন প্রভাষক আহসান আলামিন ও সাকাফী। এমআইএসটির সিএসই বিভাগের প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন মূল উপদেষ্টা হিসেবে পুরো যাত্রায় দলকে সমর্থন করেন। দলের সদস্যরা মূল্যবান যান্ত্রিক সুবিধা প্রদানের জন্য এমই বিভাগের প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আনিসুর রহমানের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। এমআইএসটির কমান্ড্যান্টও ARC’24 দলের সাফল্যের প্রশংসা করেন। মঙ্গলবারতা পোল্যান্ড, ভারত ও তুরস্কের মতো দেশগুলোর ২১টি দলের সঙ্গে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখোমুখি হয়েছিল। প্রতিযোগিতার জন্য দলগুলোকে মঙ্গল, চাঁদ এবং পৃথিবীর পরিবেশগত অবস্থার অনুকরণে সেট করা পরিবেশে চারটি মিশন সম্পূর্ণ করতে হয়।

প্রতিযোগিতায় যে চারটি মিশন ছিল সেগুলো হলো সায়েন্স স্যাম্পলার, অটোনোমাস এক্সপ্লোরেশন, লুনার রোবোটিক প্রসপেক্টর ও নাইট লঞ্চ। মঙ্গল বারোতা সব মিশনে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছে। মিশন ১, ২, ৩-এ যথাক্রমে দ্বিতীয়, চতুর্থ এবং দ্বিতীয় অবস্থান অর্জন করেছে। চতুর্থ মিশনে তারা ১০০-এর মধ্যে একটি নিখুঁত ১০০ স্কোর করেছে এবং নির্ধারিত সময়ের ছয় মিনিট আগে কাজটি সম্পূর্ণ করেছে। তাদের রোভারের রাতের ব্যতিক্রমী নেভিগেশন এবং টাস্ক এক্সিকিউশন দক্ষতা প্রদর্শন সবাইকে মুগ্ধ করেছে। কিছু প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ দল সবার সঙ্গেই দারুণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে। তারা ২৩৫.১৮ পয়েন্টের মোট স্কোরসহ দ্বিতীয় সামগ্রিক অবস্থান অর্জন করেছে। দলটি ARC বিশেষ পুরস্কারও পেয়েছে।
১৮ জুলাই নাইট লঞ্চ মিশনের সময় মঙ্গলবারতা বাংলাদেশ থেকে একটি দুঃখজনক সংবাদ পায় যে, এমআইএসটির চতুর্থ বর্ষের সিএসই ছাত্র শাইখ আশাবুল ইয়ামিন কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় দুঃখজনকভাবে জীবন হারিয়েছেন। খবরটি দলের সবার মনে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। রোভারের কমিউনিকেশন লিড রাহাদ বলেন, ‘বাংলাদেশে তখন ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় আমরা বাড়িতে যোগাযোগ করতে না পারার জন্য অত্যন্ত অস্থির বোধ করছিলাম। হাল ছেড়ে দিতে চাইলেও আমরা নিজেদের শান্ত করেছি এবং আমাদের অনুভূতির সঙ্গে লড়াই করেছি। কারণ আমরা জানতাম ইয়ামিন ভাইয়ার জন্য আমাদের এটি জিততে হবে। সেই সঙ্গে অন্য সবার জন্য যারা (বিক্ষোভের সময়) শহীদ হয়েছেন।’
দেশের এমন একটি সংকটময় মুহূর্তেও সাহস ও ঐক্যের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা এ সাফল্য অর্জন করেছেন। এ যেন অটুট দৃঢ়তার প্রতিফলন। MIST-এর মঙ্গলবারতা ARC’24 থেকে তাদের অভিজ্ঞতা ব্যবহার করে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি চালাতে এবং একটি নতুন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গঠনে সহায়তা করতে বদ্ধপরিকর।
উল্লেখ্য, ২০২১ সালে ইউনিভার্সিটি রোভার চ্যালেঞ্জে প্রথম হয়েছিল এমআইএসটি মঙ্গলবারতা। সেবার ইকুইপমেন্ট সার্ভিসিং মিশন পর্বে মার্স রোভারকে মানুষ করতে পারে, এ রকম কিছু কাজ করে দেখাতে হয়েছে। যেমন একটি ড্রয়ার খোলা, ওর ভেতরে একটি টুলবক্স রাখা, তারপর ওটি বন্ধ করে দেওয়া, কি-বোর্ডে নির্দিষ্ট কিছু টাইপ করা প্রভৃতি। এর আগে তুরস্কের রাজধানী ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত আনাতোলিয়ান রোভার চ্যালেঞ্জ (এআরসি) ২০২২-এ বাংলাদেশের ‘এমআইএসটি মঙ্গলবারতা’ দল তৃতীয় স্থান অর্জন করেছিল। সে সময়ও প্রতিটি দলকে চারটি মিশনে অংশগ্রহণ করতে হয়েছে, যেখানে মঙ্গলপৃষ্ঠ, চন্দ্রপৃষ্ঠ ও পৃথিবীপৃষ্ঠের মতো পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছিল।