বানে ভাসা জীবন
জাফর সাদেক
প্রকাশ : ৩১ আগস্ট ২০২৪ ১২:২০ পিএম
আপডেট : ৩১ আগস্ট ২০২৪ ১২:৪৯ পিএম
২৩ আগস্ট গভীর রাতে আমরা ফেনী শহরে পৌঁছাই। গিয়ে দেখি চারদিক জলে থইথই। শহরের প্রায় সব মানুষ জেগে আছে। আমরা কোথা থেকে শুরু করব, ভেবে পাচ্ছিলাম না। চিন্তায় শরীর অবশ হয়ে যাওয়ার মতো। এর মধ্যে খবর এলো একটি পরিবারকে উদ্ধারে যেতে হবে। সাহস নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। তখন ভোর ৪টা বাজে। লালপুল ব্রিজের সামনে এসে দেখি ফেনী-চট্রগ্রাম মহাসড়কে বুকসমান পানি। গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যে শত শত মানুষ রাস্তায় দাঁড়িয়ে। পানির প্রবল স্রোত। ভেসে যেতে পারি।
তবু কোমরে দড়ি বেঁধে আমরা চারজন পানিতে নামলাম। সামনে কী আছে কেউ জানি না। আমাদের সঙ্গে আরও কয়েকজন যোগ দিলেন। ঘুটঘুটে অন্ধকার। সারিবদ্ধ হয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। কোথায় আছি, কারও সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করতে পারছি না। অবশেষে তিন ঘণ্টা পর লালপুলের পেট্রোলপাম্পের কাছে সেই পরিবারকে খুঁজে পেলাম। তখন মনের মধ্যে একটু স্বস্তি এলো। দুঃসাহসিক একটি রাত শেষ হলো। শুক্রবার সকাল ৬টায় খবর পেলাম, আমরা যে ইঞ্জিনচালিত নৌকা নিয়ে উদ্ধারে নামব সে নৌকা বহনকারী ট্রাকটি চট্টগ্রাম থেকে আসার পথে মুহুরীগঞ্জে জ্যামে আটকা পড়েছে। দিশা হারানোর অবস্থা। মোবাইল নেটওয়ার্কও পাচ্ছি না। দুপুর ১২টা পর্যন্ত অনেক খোঁজাখুঁজি করেও নৌকার কোনো খবর পাওয়া গেল না। অভিযানেও নামতে পারছি না। নৌকা খুঁজব নাকি পানিবন্দি মানুষের পাশে দাঁড়াব! দুর্গতদের উদ্ধার করতে গিয়ে বুঝি নিজেরাই বিপদে পড়ে গেলাম। এদিকে ফেনীর সোনাগাজী, ফুলগাজী ও দাগনভূঞা পানিতে তলিয়ে যাওয়ার খবর এলো। এর মধ্যে অনেক উড়া খবর তো আছে। সবাই আতঙ্কগ্রস্ত। অন্যদিকে জ্যামে আটকে থাকা গাড়িগুলো গন্তব্যে যেতে না পারায় হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছে। তারাও আরেক বিপদে পড়েছে। এদের মধ্যে অনেক নারী, শিশু রয়েছে। ভয়াবহ এক পরিবেশ। বিপুলসংখ্যক পরিবার পানিবন্দি হয়ে আছে। কেউ টিনের চালে, বাড়ির ছাদে উঠে আছে। খবর পাচ্ছি কিন্তু নৌকা বা স্পিডবোটের অভাবে আমরা পুরোপুরি উদ্ধার অভিযানে নামতে পারছিলাম না।
শুক্রবার রাতে আমাদের নৌকাটি হাতে আসে। তখন মনে স্বস্তি পাই। রাতটি ফেনীতে কাটিয়ে শনিবার সকালে রওনা দিই সোনাগাজীর পথে। আমাদের সঙ্গে নৌকা এবং ট্রাক ভর্তি ত্রাণ। লালপুল থেকে সোনাগাজী উপজেলার প্রধান সড়ক ডুবে থাকায় নৌকা চলাচলের উপযোগী ছিল না। তাই ট্রাক থেকে নৌকা পানিতে ভাসানোর সুযোগও নেই। ডাকবাংলোর সামনের রাস্তা থেকে একটু ভেতরে গিয়ে স্থানীয় লোকজনের সহযোগিতায় গলাসমান পানি পাড়ি দিয়ে মঙ্গলকান্দি ইউনিয়নের কয়েকটি আশ্রয়কেন্দ্রে স্পিডবোট নিয়ে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দিই। ফেনীর বন্যাদুর্গতদের কষ্টের যে ভয়াবহতা দেখেছি তা মনে হলে নিজেই দমবন্ধ অবস্থায় পড়ি। কীভাবে যে ওই পরিস্থিতি থেকে আমরা বেঁচে এসেছিÑসেটাই বড় বিস্ময়।

লেখক : পর্বতারোহী