বানে ভাসা জীবন
কাজী রোকেয়া আক্তার
প্রকাশ : ৩১ আগস্ট ২০২৪ ১২:১৮ পিএম
আপডেট : ৩১ আগস্ট ২০২৪ ১২:৩৫ পিএম
ছবি : আরিফুল আমিন
জেলার ছোট ফেনী নদীর ঘা-ঘেঁষা বিরলী গ্রামে আমাদের বাড়ি। বাড়ির পাশে নদী হলেও কখনও এমন সংকটে পড়িনি। এবার যে পরিস্থিতি পার করেছি, সে কথা মনে হলে গা শিউরে ওঠে। ২১ আগস্ট ভোর ৫টায় বাসায় কলিংবেলের শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। এত ভোরবেলা! কিছুটা ভয় নিয়ে দরজা খুলে দেখি পরিচিত কয়েকজন আমাদের এখানে আশ্রয়ের জন্য এসেছেন। জানলাম, তাদের বাড়িঘরে পানি উঠেছে। বাসায় থাকার মতো অবস্থা নেই। হাঁটুসমান পানি। আমাদের বাড়ি অপেক্ষাকৃত উঁচু। তাই তখনও জেগে ছিল। চারপাশে দ্রুত পানি বাড়ার খবর পাচ্ছিলাম। বুঝতে পারছিলাম আমাদের এখানে পানি উঠতে কতক্ষণ! যতটুকু নিঃশ্বাস আছে সবাই একসঙ্গে বেঁচে থাকব। তাই যারা এসেছিল সবাইকে আশ্রয় দিই।
সেদিন সারা দিন ঝুমবৃষ্টি। ধীরে ধীরে পানি বৃদ্ধি পেতে থাকে। খবর পেলাম যাদের বাড়িঘরে পানি উঠেছে তারা অনেকে পাশের মসজিদের দোতলায় আশ্রয় নিয়েছে। ২২ আগস্ট পানি আমাদের উঠোনে চলে আসে। ভয়ে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল। যারা বাসায় আশ্রয় নিয়েছে তাদের মাধ্যমে জানলাম, অনেকেই না খেয়ে আছে। পাশের মসজিদে যারা আশ্রয় নিয়েছে তাদের জন্য খাবার তৈরি করে পাঠালাম। গ্রামজুড়ে ততক্ষণে বিদ্যুৎ এবং নেটওয়ার্ক সংযোগ বিচ্ছিন্ন। পুরো গ্রাম অন্ধকারের মধ্যে। দেশের বাইরে থাকা ছেলেমেয়ে, আত্মীয়স্বজনসহ কারও সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করতে পারছি না। তাদেরও উৎকণ্ঠার ভেতর দিয়ে দিন কাটছিল। এর মধ্যে লোকমারফত খবর পেলাম পাশের উপজেলা পরশুরামের কাছে হাসানপুরে আমার বড়বোন দোতলার ছাদে দুই দিন ধরে পানিবন্দি অবস্থায় আছে। তাদের সঙ্গে কোনোরকম যোগাযোগ করতে পারছিলাম না। বোন এবং নিজের বাড়ির আতঙ্কে ঘোরগ্রস্ত হয়ে পড়ি।
পরদিন পানি আরও বৃদ্ধি পেতে থাকলে আশ্রয় নেওয়া প্রতিবেশীরা অন্যত্র চলে যায়। সারা গ্রাম পানিতে টইটম্বুর। আমাদের বাড়িতেও আর থাকার অবস্থা নেই। পানি ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ছে। সাপ, ব্যাঙ ঢুকে পড়ছে। এতে আরও আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। না খেয়ে নির্ঘুম থেকে কোনোরকমে সে দিনটি পার করলাম। পরদিন বেরিয়ে পড়লাম আশ্রয়ের খোঁজে। বাড়ি থেকে হেঁটে মহাসড়কে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। চারদিকে অথই পানি। তার ওপর স্বামীর অসুস্থতা। কী করব, বুঝতে পারছিলাম না। কোনোরকমে কোমরসমান পানি মাড়িয়ে শেষে একটা ভ্যানের ওপর উঠে রাস্তা পর্যন্ত এলাম। যাত্রাপথে মানুষের দুর্দশা দেখতে দেখতে এগোতে লাগলাম। দেখলাম, এক বয়স্ক অসুস্থ লোককে চার-পাঁচ জন ধরে কোমরসমান পানি ঠেলে হাসপাতালের দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। যদিও জানি না তারা শেষ পর্যন্ত হাসপাতালে পৌঁছাতে পেরেছিল কি না। খাবার সংকটে অনেক বাচ্চার চিৎকার-চেঁচামেচির দৃশ্য দেখে নিজেকে খুব অসহায় লাগছিল। অনেকের গরু-ছাগল সব ভেসে যাচ্ছিল। সবাই নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজ করছিল। কয়েক ঘণ্টা যুদ্ধ শেষে পানিতে ভিজে ফেনী শহরে এক আত্মীয়ের বাসায় আশ্রয় নিই। সেখানে গিয়ে দেখি অনেকে আশ্রয় নিয়েছে। আমরা নিরাপদ আশ্রয় পেলেও প্রতিবেশীদের জন্য অস্থির লাগছিল। জানি না তারা পরে কোথায় আশ্রয় নিয়েছিল।

লেখক : গৃহিণী, বিরলী, ফেনী