বানে ভাসা জীবন
মারুফা আক্তার
প্রকাশ : ৩১ আগস্ট ২০২৪ ১২:১৩ পিএম
আপডেট : ৩১ আগস্ট ২০২৪ ১২:৩৪ পিএম
-ভাই... লালপোল কত দূর? আর কতটুকু হাঁটতে হবে? পানির কী অবস্থা?
-আফা, এখনও তো দশ মাইল! আপনি কি একা? কোথায় যাচ্ছেন?
-আমি ফেনীর মহিপাল যাব। সেখান থেকে ঢাকা।
-ভাসাত (বাসা) থ্যাইক্যা বের হচেন ক্যান? হানি (পানি) কমুক।
-ভাই, আজ সাত দিন (১৮-২৫ আগস্ট পর্যন্ত) বাড়ির মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ নাই। বেঁচে আছি কি না কেউ জানে না!
-আফনে তো মনে হয় এই দিকের মানুষ ন!
-হুম…আমার বাড়ি বগুড়া। সোনাগাজী বখতারমুনশী ফাজিল মাদ্রাসার প্রভাষক আমি।
-আপনি কোথায় যাচ্ছেন ভাই?
-সোনাগাজী থ্যাইকা আজ রওনা দিছি বোনের কাছে। শেষ কথা হইছেÑবোনডা কোনো এক বাড়ির দুই তলাত আচে। কী খাচ্চে! ব্যাঁইচা আছে না মইরা গেল! হের বাড়ি পরশুরাম।
-ভাই... লালপোল কত দূর?
-আরও ৯ কিলো। আপনাক যে সাহায্য করমু গত চার দিন থ্যাইকা মুই শুকনা বিস্কুট খ্যাইয়া আছি। পকেটে কোনো টাহা নাই! মোর বাড়ি বরিশাল! ভাবছি শহরে গিয়া বিকাশের দোকান থ্যাইকা বাড়ির থেকে টাকা নিমু। তারপর এ মরার পানির দেশে আর লয়। আমাগোর নদীর দ্যাশেও ও রকম বন্যা হয় না।
-খালা আপনি কই যান?
-মুই মোর বেটির খবর নিতে যাচ্চি।
-হায় হায়... আপনি তো নিজেই হাঁটতে
পারছেন না!
-কিয়া করাম কেউ না-ই তো। হোলা (ছেলে) কয় খ্যাইয়া কাম নাই এই গলা হানি ডিঙি মুই (আমি) ফুলগাজী যা-ও। পারলে তুই যাগা! মোর বউ-বেটা থুইয়্যা কোনোখানে মুই ন যাইয়্যাম (যাব)।
হানির মধ্যে খালি পা চুলকায়। সাপটাপ কামড়াই দিলে কী অইব?
-সামনে থেকে সরে যান... সরে যান! গাড়ি ঢুকবে। আহারে সরেন না কেন!
-চিৎকার করে বলে উঠি : কোথায় সরে যাব? ডানে বাঁয়ে পানি। সরে যাওয়ার জায়গা আছে?
-আপা! আপনাদের কষ্টে শরিক হওয়ার জন্যই তো আমরা এসেছি।
-বন্যার আর চোখের জল এক হয়ে আমার সঙ্গে সবাই বলে ওঠেÑক্যামেরা বন্ধ করেন। আমাদের এসব ত্রাণের দরকার নাই! আমরা পরিস্থিতির শিকার। টাকা আমাদেরও আছে। ত্রাণের নামে আমাদের নিয়ে আপনারা ব্যবসা শুরু করেছেন!
-ভাই... লালপোল কত দূর?
-আফা… ১ কিলো।
-ভাই, ছবি তুইলেন না। থামান! সত্যিই কি ছবি তুলতে চান! গ্রামের ভেতরে চলে যান। দেখেন মানুষগুলো না খেতে পেয়ে কেমন হাহাকার করছে, হুইলচেয়ারে বসা ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধের দুটি চোখ যে চাউনিতে একটুখানি বেঁচে থাকার আকুতি, ওই ন্যাংটা শিশুর বুকে চেপে ধরে এক বোতল পানি পৌঁছানোর আপ্রাণ চেষ্টা!
অবশেষে লালপোল। আর মাত্র মাইলখানেক পথ। মহিপাল পেয়ে যাব।
দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিয়ে একটু থামলাম। চেয়ে রইলাম! দেখি ফ্লাইওভারের সিঁড়িতে বসে পড়ে থাকা খিচুড়ির প্যাকেট খুলে খেতে লাগল জীর্ণ পোশাক পরা এক লোক! কত দিনের অভুক্ত সেই মানুষ? তার খাবার খাওয়ার ওই দৃশ্য নিজ চোখে না দেখলে ভাষায় বর্ণনা করে বোঝানো যাবে না। দূর থেকে স্বজনরা যোগাযোগ করতে পারছে না। তাই স্বস্তির নিঃশ্বাসও ফেলতে পারছে না। তাই আমিও কোমর-বুক-গলা সমান পানি ভেঙে ফিরে এসেছি স্বজনের কাছে। এর চেয়ে আন্দন্দ আর কী!

লেখক : প্রভাষক, সোনাগাজী বখতারমুনশী ফাজিল মাদ্রাসা, ফেনী