ছাত্র-জনতার জুলাই অভ্যুত্থানের ভেতর দিয়ে আমরা এক ভীষণ অগোছালো আর সহস্র অমীমাংসিত প্রশ্ন নিয়ে দাঁড়িয়েছি। আমাদের আকাঙ্ক্ষা এক বহুত্ববাদী রূপান্তর। আমরা রাষ্ট্রব্যবস্থা সংস্কারে এখন তৎপর। ঠিক এমন সময়টাতেই আমাদের সামাল দিতে হচ্ছে এক নিদারুণ বন্যা।
আমরা কেমন রাষ্ট্র চাই? এই আমরা মানে কারা? বাংলাদেশে কেবল ১৮ কোটি মানুষ বাস করে না। এখানে ১ হাজার ৮টি নদ-নদী, বিশ্বের বৃহত্তম বাদাবন, ৩০টি কৃষিপ্রতিবেশ অঞ্চল, ৮ হাজার ধানের জাত, ঝিরি, হাওর, বাঁওড়, অরণ্য, বিল, বরেন্দ্র, গড়, পাখি, মাছ, পতঙ্গ কি অণুজীব সবাই বসবাস করে। এ দেশ গঠনে, গড়নে এবং বাঁচিয়ে রাখতে এদের সবার জীবনজয়ী অবদান আছে। আমরা এক প্রবল কর্তৃত্ববাদী জুলুমের শাসন খানখান করেছি। যারা মানুষ ছাড়া দেশের প্রাণ-প্রকৃতি আর প্রতিবেশের সঙ্গে প্রতিনিয়ত নৃশংসতা করেছে। অন্যায় লুটতরাজ, দখল, দূষণ আর খুনখারাবি করেছে। নতুন রাষ্ট্রসংস্কারের প্রশ্নে আমরা কি কোনোভাবেই সেই পতিত রেজিমের বাহাদুরি কপি-পেস্ট করতে পারি? পারি না। কারণ জেন-জি বা সর্বোপরি সব প্রজন্মের লড়াই ছাত্র-জনতা ফ্যাসিবাদী ক্ষমতার বিপরীতে এক অন্তর্ভুক্তিমূলক বয়ান হাজির করছে। সাংস্কৃতিক ও প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের বাধাহীন মর্যাদাপূর্ণ সহাবস্থানকে তারা প্রচার করেছে। ধর্মীয়, জেন্ডার ও জাতিগত ঐক্যকে তারা বাংলাদেশের মৌলিক চেহারা হিসেবে দেখতে চায়। ‘প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ বাংলাদেশ’ এমন গ্রাফিতিও আঁকা হয়েছে।
ছাত্র-জনতার ভাষ্য ও উচ্চারণ পাঠ করে বলতে চাই- ন্যায্যতা, সাম্য ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় চাই সর্বপ্রাণের ও সর্বজনের বাংলাদেশ। এ আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে প্রাণ-প্রকৃতি, প্রতিবেশ-পরিবেশ, কৃষি, খাদ্যব্যবস্থা, জলবায়ু ন্যায্যতা এবং আদিবাসী অধিকার সুরক্ষায় আমাদের ধারাবাহিক কাজ করে যেতে হবে। একটি মৌমাছি বা বটগাছকে পেছনে ফেলে বা কোনো একজন সাঁওতাল বা ম্রো মানুষকে পেছনে রেখে কোনোভাবেই সামনে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান আমাদের এ সহজ বার্তাটিই দিতে পেরেছে। রাষ্ট্র ও ব্যবস্থার মৌলিক সংস্কারের জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট বিষয়ে এ রূপান্তরের রূপরেখা। অন্তর্বর্তী সরকার, ছাত্র-জনতা কিংবা দৃশ্যমান কি অদৃশ্য মানুষসহ সব প্রাণ-প্রজাতি ও বাস্তুতন্ত্র এ রূপরেখা প্রতিদিন জাগিয়ে রাখবে আশা করি।
কৃষিপ্রতিবেশ ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে স্বীকৃতি দিয়ে কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা বিকশিত করতে হবে
প্রাণ-প্রকৃতি-প্রতিবেশ ও পরিবেশ ন্যায়বিচারবিষয়ক প্রস্তাব
প্রাণ, প্রকৃতি, প্রতিবেশ এবং বাস্তুতন্ত্র সুরক্ষায় রাষ্ট্র ‘ইকোসেন্ট্রিক (প্রতিবেশবাদী)’ দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করবে। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সব প্রাণসত্তার/প্রাণবৈচিত্র্যের (প্রাকৃতিক ও জীনগতবৈচিত্র্য) অবদান এবং পরস্পরনির্ভরশীলতাকে স্বীকৃতি দিয়ে সর্বপ্রাণের সুরক্ষা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবে।
প্রাণবচিত্র্য, প্রতিবেশ ও পরিবেশ সম্পর্কিত কর্মসূচিসহ রাষ্ট্রের সব উন্নয়নচিন্তায় প্রবলভাবে অধিষ্ঠিত কতৃর্ত্ববাদী ‘মানুষকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি (এথনোপোসেন্ট্রিক)’ খারিজ করে সব উন্নয়নচিন্তা ও তৎপরতায় মানুষসহ সর্বপ্রাণের বৈচিত্র্যের অস্তিত্ব, বিকাশ ও অধিকারকে গুরুত্ব দিতে হবে।
দেশের জনগণের মতামত, সক্রিয় অংশগ্রহণ ও পরামর্শের ভিত্তিতে গৃহীত আইনের মাধ্যমে প্রাণবচিত্র্য, বাস্তুতন্ত্র/পরিবেশগত বৈচিত্র্য (ইকোসিস্টেম), বৃক্ষ, বন্য প্রাণী সবার ব্যক্তিসত্তাকেই আইনগতভাবে স্বীকৃতি দিতে হবে।
সংবিধানের ১৮(ক) ধারা সংশোধন করে উল্লেখ করতে হবে, ‘...রাষ্ট্র বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য প্রাণ, প্রকৃতি, প্রতিবেশ ও পরিবেশের সুরক্ষা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করিবেন। প্রাণবৈচিত্র্য, জীনগতবৈচিত্র্য, বাস্তুতন্ত্র, দেশি বীজসম্পদ, কৃষিপ্রতিবেশ অঞ্চল, বনাঞ্চল, বৃক্ষ, বন্য প্রাণী, পাহাড়, গড়, বরেন্দ্র, চরাঞ্চল, দ্বীপ, টিলা, ঝিরি, বিল, ঝরনা, নদনদী, ছড়া, দিঘি, হাওর, বাঁওড়, খাল, উদ্যান, পার্ক, সবুজবলয়, উন্মুক্ত জনচত্বর, সাংস্কৃতিকভাবে সুরক্ষিত পবিত্র অঞ্চল, গ্রামীণ বন এবং প্রাকৃতিক সম্পদের সুরক্ষা ও প্রাকৃতিক বিকাশের ধারাবাহিকতার নিরাপত্তা বিধান করিবেন’।
বন, পরিবেশ, প্রাণবৈচিত্র্য, বাস্তুতন্ত্র সুরক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় আদিবাসীসহ স্থানীয় গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যগত সম্পর্ক ও অবদানকে স্বীকৃতি দিয়ে অংশগ্রহণমূলক পরিবেশগত জনব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে।
কৃষিপ্রতিবেশ, প্রাকৃতিক বনাঞ্চল, জলাভূমি বেদখল ও বিনষ্ট করে কোনো ধরনের উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা যাবে না। প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য বিপন্নকারী সব নকশা, স্থাপত্য পরিকল্পনা এবং উন্নয়ন তৎপরতাগুলো বাতিল করতে হবে। যেকোনো উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণের আগে বিশ্বস্ত জনমত জরিপ, পরিবেশগত-প্রতিবেশগত-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব যাচাই নিশ্চিত করতে হবে এবং সব পরিকল্পনা ও প্রতিবেদন ধারাবাহিকভাবে জনগণের সামনে উন্মুক্ত করতে হবে।
আদিবাসীসহ বননির্ভর স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং জনগণের পূর্বানুমোদন, প্রস্তাব ও সুপারিশের ভিত্তিতে বন আইনের আমূল সংস্কার করতে হবে। পাশাপাশি প্রাণবৈচিত্র্য, নদী, জলাভূমি এবং বাস্তুতন্ত্র ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত নীতি ও আইনসমূহ জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণে সংস্কার করে কার্যকর করতে হবে।
অবৈধ ও মিথ্যা বন মামলা বাতিল করে সব ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট প্রমাণসহ পরিবেশ ও বন সম্পর্কিত আইন ও বিচার কাঠামো জনবান্ধব করতে হবে।
সব সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিকের ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। দেশব্যাপী একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিক-পলিথিনের উৎপাদন, বিপণন ও ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। প্লাস্টিকের বিকল্প পরিবেশবান্ধব বিকল্প ব্যবহারগুলোকে রাষ্ট্রীয়ভাবে উৎসাহিত করতে হবে।
প্রাকৃতিক সম্পদ ও বাস্তুতন্ত্রের বৈচিত্র্য দখল ও দূষণ মুক্ত করতে হবে। শিল্প ও রাসায়নিক দূষণ, বায়ুদূষণ, পানিদূষণ, দৃশ্যদূষণ, আলোকদূষণ, শব্দদূষণ রোধে দখলদার ও দূষণকারীদের আইন ও বিচারের আওতায় আনতে হবে। প্রমাণিত প্রাণবৈচিত্র্য ও পরিবেশ ধ্বংসকারীদের কোনোভাবেই পুনরায় কোনো সরকারি ও বেসরকারি কর্মসূচিতে পুনর্বাসন ও প্রতিষ্ঠা করা যাবে না।
বৃক্ষ ও প্রাণীর সুনির্দিষ্ট তালিকাসহ আগ্রাসি (ইনভেসিভ/অ্যালিয়েন স্পেসিস) প্রজাতি নিষিদ্ধ করতে হবে। বিভিন্ন নার্সারি, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি, বাগান, উদ্যান, সামাজিক বনায়ন, মৎস্য-পোল্ট্রি ও প্রাণিসম্পদ খামার থেকে ধারাবাহিকভাবে আগ্রাসি প্রজাতি হ্রাসকরণে সুনির্দিষ্ট জনপরিকল্পনা ও কর্মসূচি তৈরি করতে হবে।
নদী ও হাওর ব্যবস্থাপনা, বন্য প্রাণী পাচার এবং দূষণ রোধে জনগণের সামনে সব তথ্য অবাধ ও উন্মুক্ত করে আন্তঃরাষ্ট্রিক কূটনীতি সক্রিয় করতে হবে। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের বাণিজ্যিক খনন, বৃহৎ বাঁধ এবং উন্নয়ন অবকাঠামো, উজানের পানি প্রত্যাহার এবং অন্যায় নদীশাসনকে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিহত করতে হবে।
দেশব্যাপী উদ্যান, পার্ক, উন্মুক্ত জনচত্বর এবং সবুজবলয় সর্বসাধারণের জন্য বিনামূল্যে উন্মুক্ত থাকতে হবে। এসব জনসম্পদ ও অঞ্চল ব্যবস্থাপনায় শিক্ষার্থী, নগর দরিদ্র জনগোষ্ঠীসহ নগরবাসীকে স্থানীয় সরকারের কর্মতৎপরতায় যুক্ত করতে হবে।
প্রাক-প্রাথমিক থেকে উচ্চ শিক্ষার সব সিলেবাস এবং পাঠ্যক্রমে প্রাণপ্রকৃতি ও পরিবেশ অসংবেদনশীল কোনো কনটেন্ট এবং দৃষ্টিভঙ্গিকে উৎসাহিত করা যাবে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সকল পর্যায়ে প্রাণপ্রকৃতি ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনাকে শিক্ষা ও শ্রেণি কার্যক্রমে যুক্ত করতে হবে।
জলবায়ু সংকটের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠী
বৈশ্বিক উষ্ণতা ও জলবায়ু ন্যায্যতাবিষয়ক প্রস্তাব
ধনী রাষ্ট্রের লাগামহীন করপোরেট ভোগবিলাসিতা এবং নতুন উদারবাদী ব্যবস্থার কারণে প্রশ্নহীনভাবে বৃদ্ধি পাওয়া কার্বণ নিঃসরণ বৈশ্বিক উষ্ণতা ঘটাচ্ছে এবং যা সামগ্রিকভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের সংকট ও অভিঘাতকে গুরুত্ব দিয়ে সব মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের পরিকল্পনায় সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি ও দায়িত্ব যুক্ত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে দেশের ভুক্তভোগী জনগণের সপক্ষে জলবায়ু ন্যায্যতা (ক্লাইমেট জাস্টিস) প্রতিষ্ঠাকে রাষ্ট্রের মৌলিক জলবায়ু-অঙ্গীকার হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
খরা, তীব্র দাবদাহ, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা, জোয়ারের উচ্চতা বৃদ্ধি, বন্যা, পাহাড়ি ঢল, অকালবন্যা, অনাবৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি, শৈত্যপ্রবাহ, বজ্রপাতসহ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সব আপদ-বিপদকে সুনির্দিষ্টভাবে বিবেচনায় নিয়ে দেশের কৃষিপ্রতিবেশভিন্নতায় জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক জনবান্ধব কর্মকৌশল প্রণয়ন করতে হবে। জলবায়ু সংকটের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠী ও অঞ্চলের সামগ্রিক বিষয় বিবেচনায় এনে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ধারাবাহিক কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে।
জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক প্রাণবৈচিত্র্য সনদ ১৯৯২ এবং প্যারিস জলবায়ু চুক্তিকে (২০১৫) গুরুত্ব দিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অভিযোজন চর্চা ও লোকায়ত জ্ঞানকে স্বীকৃতি দিয়ে জলবায়ু উপযোগী দেশি শস্যফসল ও স্থানীয় প্রযুক্তির উন্নয়ন ঘটিয়ে জাতীয় অভিযোজন পদক্ষেপ ও নীতি গ্রহণ করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সংকটাপন্ন গ্রামীণ সংস্কৃতি এবং শিল্পকর্ম বিকাশে সহযোগিতা করতে হবে। এলাকাভিত্তিক অন্তর্ভুক্তিমূলক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে।
বৈশ্বিক প্রশমন উদ্যোগসমূহ প্রত্যক্ষভাবে দৃশ্যমানকরণ এবং বৈশ্বিক জলবায়ু তহবিল নিশ্চিতকরণে রাষ্ট্রের জলবায়ু-কূটনীতি জোরদার করতে হবে। জলবায়ু সম্মেলনে (কনফারেন্স অব পার্টিস/কপ) রাষ্ট্রপক্ষের প্রতিনিধিদলে দেশের ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামীণ জনগোষ্ঠী, যুবসমাজ এবং নাগরিকসমাজের প্রতিনিধি যুক্ত করতে হবে।
বহুজাতিক কোম্পানি ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠাননির্ভর মিথ্যা জলবায়ু সমাধানগুলোকে কোনোভাবেই প্রকল্প হিসেবে গ্রহণ এবং কার্বন-বাণিজ্যের মতো বিষয়কে উৎসাহিত করা যাবে না।
‘বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড অ্যাকশন প্ল্যান (২০০৯)’, ‘ন্যাশনাল অ্যাডাপটেশন প্ল্যান অব বাংলাদেশ (২০২৩-২০৫০)’ এবং ‘ন্যাশনালি ডিটারমাইন্ড কন্ট্রিবিউশন’সহ জলবায়ুসংশ্লিষ্ট আইন, নীতি, পরিকল্পনা, অর্থায়ন ও কর্মসূচিতে জনগণের মতামত, বাস্তবতা, সুপারিশ, উদ্যোগ এবং অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশ জলবায়ু ট্রাস্ট ফান্ডসহ বৈশ্বিক জলবায়ু তহবিল, অভিযোজন তহবিল এবং অর্থায়নকে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ও জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনা করে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর নেতৃত্বে প্রকল্প ও কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে এবং সব ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পেশার পরিবর্তনশীলতা ও স্থানান্তর এবং বাস্তুচ্যুতির ঘটনা গভীরভাবে অনুধাবন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে জলবায়ুর কারণে জলবায়ু-উদ্বাস্তু মানুষের জন্য নতুন অভিবাসনস্থল নিরাপদ করতে হবে এবং এসব মানুষের জন্য মর্যাদার কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে হবে। জলবায়ু-উদ্বাস্তু হয়ে নগর এলাকায় বসবাসরত নগরদরিদ্রদের জন্য নাগরিক অধিকারের সুরক্ষা দিতে হবে।
জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার শূণ্যকরণে এবং নবায়নযোগ্য সবুজ জ্বালানি শক্তির রূপান্তরে জনবান্ধব জ্বালানি রূপান্তর কর্মকৌশল প্রণয়ন করতে হবে। কৃষিজমি-জলাভূমি বিনষ্ট না করে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে গ্রাম ও নগরের দরিদ্র জনগণের প্রবেশাধিকার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিশ্চিত করতে হবে।
কৃষিব্যবস্থায় লিঙ্গ-জাতি-বয়স ও আঞ্চলিক বৈষম্য দূর করে পারিবারিক কৃষিকে উৎসাহিত করতে হবে
কৃষি উৎপাদন ও খাদ্যব্যবস্থা বিষয়ক প্রস্তাব
কেবল মানুষ নয়; সব প্রাণ-প্রজাতির খাদ্য উৎস এবং প্রাকৃতিক খাদ্যশৃঙ্খল ব্যবস্থা সমুন্নত রেখে কৃষিপ্রতিবেশ ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে স্বীকৃতি দিয়ে কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা বিকশিত করতে হবে। কেবল মানুষ নয়; সব প্রাণসত্তার আকাঙ্ক্ষিত খাদ্য শর্তহীনভাবে নিশ্চিতকরণের ধারাবাহিকতা বজায় থাকতে হবে। এ ক্ষেত্রে কৃষিপ্রতিবেশবিদ্যাকে (অ্যাগ্রোইকোলজি) বাংলাদেশের কৃষিচর্চা ও উৎপাদনের মূল দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
কৃষিতে স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সংহারী সব ধরনের রাসায়নিক কীটনাশাক, বৃদ্ধিকারক হরমোন, গবাদি প্রাণিসম্পদের ভ্যাকসিন, ওষুধ, আগাছানাশক, সিনথেটিক সারের ব্যবহার পর্যায়ক্রমিকভাবে হ্রাসকরণের জন্য অঞ্চলভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি প্রাকৃতিক মাটি ও পুষ্টি ব্যবস্থাপনাকে গুরুত্ব দিয়ে শস্যবৈচিত্র্য, শস্য আবর্তন, দেশি শস্যফসলের বৈচিত্র্য, ভূ-উপরিস্থ পানিসেচ ব্যবস্থাপনা, কুড়িয়ে পাওয়া অচাষকৃত বিকল্প খাদ্য উৎস সংরক্ষণ, অপ্রচলিত ফসল চাষ, সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা, পারিবারিক পুষ্টিবাগান, প্রাকৃতিক দমন ও লোকায়ত অনুশীলন এবং কৃষক ও যুবদের নেতৃত্বে সৃজনশীল উপযোগী প্রায়োগিক কৃষি গবেষণাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে উৎসাহিত করতে হবে।
কৃষিব্যবস্থায় লিঙ্গ-জাতি-বয়স ও আঞ্চলিক বৈষম্য দূর করে পারিবারিক কৃষিকে উৎসাহিত করতে হবে এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে কৃষক-জেলে ও প্রাকৃতিক সম্পদনির্ভর পেশাজীবীদের সামাজিক সম্মান কাঠামোগতভাবে স্বীকৃতি দিতে হবে। কৃষিতে যুব- তরুণ সমাজের যুক্ততার জন্য প্রণোদনা ও সহায়তা অব্যাহত রাখতে হবে।
‘কৃষিজমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার আইন-২০১৯’-এর খসড়া বিলটি দেশব্যাপী জনমত যাচাইয়ের মাধ্যমে দ্রুত চূড়ান্ত করতে হবে। কোনো উন্নয়ন অবকাঠামো ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য কৃষিজমির অধিগ্রহণ বাতিল করতে হবে এবং কৃষিজমিকে দেশের জাতীয়সম্পদ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।
নারী কৃষকের বীজ সার্বভৌমত্বকে মূল বীজচিন্তা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। কৃষকের ঘরে ঘরে, গ্রামভিত্তিক এবং সমাজভিত্তিক বীজাগার গড়ে তোলার জন্য রাষ্ট্রীয় সহায়তা নিশ্চিত হতে হবে। কোনো কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠান নয়, বীজ থাকবে গ্রামীণ কৃষকের মালিকানায়। বেসরকারি বীজ খাত অনুৎসাহিত করে বীজ উৎপাদনে কৃষকসহ দেশি সরকারি প্রতিষ্ঠান ও বীজাগার শক্তিশালী করতে হবে। হাইব্রিড বীজ সম্প্রসারণকে অনুৎসাহিত করে উচ্চফলনশীল (উফশী) জাত এবং দেশি (ন্যাটিভ ট্রাডিশনাল লোকাল সিড) বীজবৈচিত্র্য উৎপাদন, গবেষণা, উন্নয়ন, বিপণন ও চাষাবাদ বাড়াতে হবে। জেনেটিক্যালি মডিফায়েড অর্গানিজম (জিনপ্রযুক্তিতে বিকৃত বীজ) কিংবা জিএম ফসল ও বীজকে অনুমোদন দেওয়া যাবে না এবং এ-সংক্রান্ত সব গবেষণা সুস্পষ্ট আইন মেনে জনসাধারণের কাছে কোনো তথ্য গোপন না করে করতে হবে।
স্থানীয় দেশি মাছবৈচিত্র্য সুরক্ষায় জলাভূমি, মাছ, অভয়াশ্রম নীতিমালার সংস্কার করতে হবে এবং এলাকাভিত্তিক মাছবৈচিত্র্য সুরক্ষাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সহায়তা করা দরকার। দেশি জাতের গবাদি প্রাণিসম্পদ বৈচিত্র্য সুরক্ষায় কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। পরিবেশ ও বৈচিত্র্য বিনষ্ট না করে জোনিং নীতিমালার মাধ্যমে স্থানীয় জনগণের মতামতের ভিত্তিতে বাণিজ্যিক চিংড়ি ঘের এবং মাছের খামারের অনুমোদন দিতে হবে।
গ্রামীণ জনগোষ্ঠী এবং স্থানীয় সরকার ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে এলাকাভিত্তিক বার্ষিক কৃষিপরিকল্পনা করতে হবে, যা জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা সূচক এবং জাতীয় চাহিদা পূরণ করে। গ্রামীণ বেকার তরুণ-যুবদের নিরাপদ মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খামার গড়ে তোলা এবং বিপণনের ক্ষেত্রে ধারাবাহিক সহায়তা অব্যাহত রাখতে হবে।
পাহাড়ি অঞ্চলের জুম চাষসহ আদিবাসীদের বৈচিত্র্যপূর্ণ কৃষি উৎপাদন, আঞ্চলিক ভিন্নতায় বিশেষ কৃষি উৎপাদনসমূহকে বৈষম্যহীনভাবে রাষ্ট্রীয় সহায়তা অব্যাহত রাখতে হবে।
হাঁস, মুরগি, গরু, ছাগল, ভেড়া, শূকর, কবুতর ইত্যাদি গবাদি প্রাণিসম্পদ এবং মাছ চাষে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর কোনো খাদ্য, রাসায়নিক বিষ ইত্যাদি ব্যবহার করা যাবে না। স্থানীয় কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ অফিসকে প্রতিনিয়ত তার এলাকায় নজরদারি করতে হবে।
বীজসম্পদ ও কৃষিসম্পর্কিত লোকায়ত জ্ঞান ও অনুশীলন এবং দেশজ প্রযুক্তির একতরফা বাণিজ্যিক পেটেন্টের বিরুদ্ধে এবং কৃষকের মেধাস্বত্ব অধিকার সুরক্ষায় রাষ্ট্রীয় আইন ও কর্মসূচি দৃশ্যমান হতে হবে। কৃষকের অনুমতি ছাড়া কোনো দেশি জিনসম্পদ ব্যবহার করা যাবে না। এ ক্ষেত্রে ‘কৃষকের জাত সংরক্ষণ আইন-২০১৯’ জনগণের মতামত ও পরামর্শে পুনঃসংশোধন করতে হবে।
মানুষসহ সব প্রাণপ্রজাতির খাদ্য সুরক্ষা নিশ্চিতকরণে ভবিষ্যৎ খাদ্যব্যবস্থার রূপান্তর হিসেবে ‘খাদ্য সার্বভৌমত্ব’ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করতে হবে। সংবিধানে ‘খাদ্য সার্বভৌমত্ব’ এবং ‘খাদ্য অধিকার’কে মৌলিক অধিকার হিসেবে যুক্ত করতে হবে।
উৎপাদন থেকে উত্তোলন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন, বিপণন ও পরিবেশনের সকল পর্যায়ে খাদ্যকে নিরাপদ হতে হবে। খাদ্যদ্রব্যে কোনো ধরনের ভেজাল, বিষাক্ত দ্রব্য, কৃত্রিম প্রিজারভেটিভ, ট্রান্সফ্যাট, কীটনাশক পরীক্ষাকে স্থানীয় জনগণের মাধ্যমে কমিটি তৈরি করে ‘দেশব্যাপী সামাজিক নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনা’ গড়ে তুলেতে হবে। নিরাপদ খাদ্য আইন সংস্কারসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দুর্নীতিমুক্ত জবাবদিহি ব্যবস্থার ভেতর আনতে হবে।
আঞ্চলিক ও সাংস্কৃতিক খাদ্যবৈচিত্র্যকে রাষ্ট্রীয়ভাবে উৎসাহিতকরণের মাধ্যমে করপোরেট স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ ফাস্টফুড আগ্রাসন রুখে দাঁড়াতে হবে। নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর, দেশি সৃজনশীল খাবারকে (স্লো ফুড) নতুন প্রজন্মের ভেতর উপযোগী ও গ্রহণযোগ্য করে প্রচারের ক্ষেত্রে নানা ধরনের গণমাধ্যম কাজ করতে পারে।
প্রস্তাবনা : আদিবাসী অধিকার
বাংলাদেশের আদিবাসী জনগণ একক আত্মপরিচয় হিসেবে ‘আদিবাসী’ প্রত্যয়টি ব্যবহার করছে। ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে যার নজির ও নথি আছে। জাতিসংঘ-প্রদত্ত ‘ইনডিজেনাস পিপলস’-এর সংজ্ঞায়নের সঙ্গে ‘আদিবাসী’ প্রত্যয়ের মিল আছে। রাষ্ট্রকে আদিবাসী জনগণের আদিবাসী আত্মপরিচয়কে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিতে হবে। সংবিধানের ২৩ক ধারা সংশোধন করে লিখতে হবে, ...রাষ্ট্র আদিবাসী জনগণের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আঞ্চলিক সংস্কৃতি, মাতৃভাষা, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং প্রথাগত সামাজিক আইনের অধিকার সুরক্ষা, উন্নয়ন ও বিকাশের ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন’।
পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি কমিশন সক্রিয়করণসহ সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক স্বাধীন সক্রিয় ভূমি কমিশন গঠনের মাধ্যমে আদিবাসী অঞ্চলে সংঘটিত সব ভূমিদখল ও ভূমিবঞ্চনার অবসান করতে হবে। আদিবাসী জনগণের প্রথাগত ভূমি অধিকার আইনগতভাবে স্বীকৃতি দিতে হবে। রাষ্ট্রীয় প্রজাস্বত্ব আইনের সুস্পষ্ট প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
আদিবাসী জনগণের জুম, কৃষি, কুটিরশিল্প, প্রাকৃতিক সম্পদনির্ভর জীবনব্যবস্থা আইনগতভাবে স্বীকৃতিসহ রাষ্ট্রীয় সহায়তা চলমান রাখতে হবে।
আদিবাসী অঞ্চলে যেকোনো ধরনের উন্নয়ন পরিকল্পনা, স্থাপনা, অবকাঠামো নির্মাণের আগে অবশ্যই আদিবাসী সমাজের পূর্ণ সম্মতি ও মতামত থাকতে হবে। সে ক্ষেত্রে সব তথ্য ও পরিকল্পনা অবাধ, উন্মুক্তভাবে আদিবাসী জনগণের সঙ্গে সহজভাবে জানাতে হবে। প্রাণপ্রকৃতি ও আদিবাসী জীবনসংস্কৃতি বিপন্নকারী সব বাণিজ্যিক বিনোদন কেন্দ্র, আগ্রাসি গাছের মনোকালচার কিংবা সাংস্কৃতিক আগ্রাসন বন্ধ করতে হবে।
আদিবাসী অঞ্চলে নানা সময়ে সংঘটিত প্রতিটি খুন, গুম, ধর্ষণ, অগ্নিকাণ্ড, হামলা, জবরদখল ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র আদিবাসী কমিশন গঠন করা যেতে পারে।
রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠানে আদিবাসী জনগণের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সুনির্দিষ্ট ‘কোটাব্যবস্থা’ বহাল করতে হবে, যা অনগ্রসর করে রাখা আদিবাসী জনগণকে রাষ্ট্রের মূলধারায় যুক্তকরণে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে কাজ করবে।
দেশের সব আদিবাসী জাতির নিজ নিজ মাতৃভাষা সুরক্ষা ও বিকাশের ক্ষেত্রে মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষাসহ নানাবিধ সৃজনশীল শিল্প-সাংস্কৃতিক তৎপরতাকে উৎসাহিত করতে হবে। আদিবাসী শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি উৎসাহিতকরণের ক্ষেত্রে জাতীয়ভাবে পদক, সম্মাননা এবং নানা ক্ষেত্রে দুস্থ শিল্পীদের জন্য সম্মানজনক অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে।