× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

আপনার ধূমপানে শিশুর আয়ু কমে

সাধন সরকার

প্রকাশ : ২১ আগস্ট ২০২৪ ১৫:৪৭ পিএম

আপডেট : ২১ আগস্ট ২০২৪ ১৬:১৪ পিএম

আপনার ধূমপানে শিশুর আয়ু কমে

উপজেলা সদরের রাস্তা দিয়ে তিন চাকার অটো গাড়ি এগিয়ে চলেছে। গাড়িতে ড্রাইভার বাদে মোট যাত্রী পাঁচজন। তিনজন স্কুল শিক্ষার্থী আর দুজন সাধারণ যাত্রী। পুরুষ ড্রাইভার মনের সুখে সিগারেট টানছেন। সিগারেটের পরোক্ষ ধোঁয়ায় স্কুলগামী শিশু শিক্ষার্থীদের চোখেমুখে বিরক্তির ছাপ। কেউ হাত দিয়ে নাক চেপে রাখার চেষ্টা করছে, কেউ আবার অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে বারবার থু থু ফেলছে। এ ধরনের চিত্র এখন এলাকায় হামেশাই চোখে পড়ে। জনপরিসরে ধূমপান নিষিদ্ধ হলেও এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ দেখা যায় না। প্রকাশ্যে ধূমপান বন্ধ না হওয়ার দুটি কারণ রয়েছে। এক. তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বেশিরভাগ মানুষ জানে না। দুই. সবাই ধূমপানকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নিয়েছে!

‘তামাক’ ছোট্ট একটি শব্দ হলেও এর ক্ষতিকর প্রভাব ব্যাপক। শুধু প্রাপ্তবয়স্করা নন, শিশু-কিশোররাও পরোক্ষভাবে তামাকের সংস্পর্শে আসছে। ঘরে এবং ঘরের বাইরে শিশুরা পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হচ্ছে। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার বড় একটা অংশ তামাক সেবনের সঙ্গে যুক্ত। এ তামাক সেবনকারীর বেশিরভাগই জানেন না, প্রকাশ্যে ধূমপান করা আইনগতভাবে নিষিদ্ধ! অনেক পরিবারে পুরুষ সদস্য ঘরের মধ্যেও ধূমপান করেন। তারা জেনেবুঝে হোক আর অজান্তেই হোক, পরিবারের শিশুসহ অনন্যদের ক্ষতি করছেন। শহরের শিশুরা পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। রাস্তাঘাটে, যানবাহনে, দোকানে, ঘরের মধ্যে শিশু-কিশোররা ধূমপানের শিক্ষার হচ্ছে।

‘সেকেন্ডহ্যান্ড স্মোক এক্সপোজার ইন প্রাইমারি স্কুল চিলড্রেন : আ সার্ভে ইন ঢাকা, বাংলাদেশ’ শিরোনামে গবেষণাপত্রে বলা হয়, রাজধানী ঢাকা শহরের ৯৫ ভাগ শিশুর শরীরে নিকোটিনের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। নিকোটিনের উপস্থিতির প্রধান কারণ পরোক্ষ ধূমপান। এ গবেষণা পরিচালনা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ইয়র্ক, ইউনিভার্সিটি অব এডিনবার্গ ও লিডস সিটি কাউন্সিলের জনস্বাস্থ্য বিভাগ। গবেষণাপত্রে আরও বলা হয়, ৪৩ ভাগ শিশু জানিয়েছে তাদের পরিবারে কমপক্ষে একজন ধূমপানের সঙ্গে জড়িত। ৮৭ শতাংশ শিশু বলেছে, তারা জনসমাগম স্থানে অন্যের ধূমপানের শিকার হয়েছে। নিকোটিনের আরেক নাম বিষ। এ বিষ খুব ছোটবেলা থেকে শিশুর শরীর ধারাবাহিকভাবে গ্রহণ করতে থাকলে একসময় তার পরিমাণ ভয়াবহ হবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। ধূমপায়ী ব্যক্তি শুধু নিজের ক্ষতি করছেন না, ক্ষতি করছেন আশপাশের শিশু ও অন্যান্য অধূমপায়ী ব্যক্তির। ঘরের মধ্যে ধূমপানের ধোঁয়ার কারণে শিশুর তো ক্ষতি হচ্ছেই তা ছাড়া সিগারেট, বিড়ির ছাই ঘরে থাকা আসবাবপত্র ও জামাকাপড়ে জমা হচ্ছে। শিশুরা কোনো না কোনোভাবে এসব জিনিসপত্রের সংস্পর্শে আসছে। শিশুদের হাত থেকে মুখে প্রবেশ করে এসব ছাই। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সিগারেট, বিড়ির ছাইয়ের মধ্যে প্রায় ২৫০ ধরনের ক্ষতিকর রাসায়নিক থাকে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে নিকোটিন, ফরমালডিহাইড, ন্যাপথলিন ও ক্যানসার তৈরির বিভিন্ন উপাদান।

পুরো বিশ্বে প্রায় ৪০ শতাংশ শিশু পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হলেও বাংলাদেশে শহরাঞ্চলে এ হার প্রায় দ্বিগুণ। এর কারণ বাংলাদেশে ধূমপায়ীর সংখ্যা বেশি। এ ছাড়া রয়েছে অসচেতনতা ও বিদ্যমান তামাক আইন প্রয়োগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনীহা। তামাক থেকে দূরে থাকার অধিকার শিশুদের অবশ্যই রয়েছে। তবে সে অধিকারটুকু শিশুরা পাচ্ছে তো? পরিবারের যে আপনজন ঘরের মধ্যে ধূমপান করছেন তিনি কি ধূমপানে শিশুর ক্ষতি সম্পর্কে অবগত? রাস্তায় প্রকাশ্যে যিনি ধূমপান করছেন তিনি কি প্রকাশ্যে ধূমপানের শাস্তি সম্পর্কে জানেন? ধূমপান এমনিতেই স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকরÑ এ কথা কমবেশি সবাই জানে। যিনি ধূমপান করছেন তিনি তো নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কেই সচেতন নন। তাহলে একজন ধূমপায়ী ব্যক্তি শিশুর পরোক্ষ ধূমপানের ক্ষতির কথা কীভাবে ভাববেন? ফুসফুসের ক্যানসারের জন্য ৯০ ভাগ দায়ী তামাক। তাই পরোক্ষ ধূমপান থেকে অবশ্যই সবার আগে শিশুদের রক্ষার পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের নির্দেশনা অনুযায়ী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ১০০ মিটারের মধ্যে তামাকজাত পণ্যের বিক্রি নিষিদ্ধ। কিন্তু ‘কাজির গরু কেতাবে আছে, গোয়ালে নেই’, অবস্থা। শহরের অনেক বিদ্যালয়ের সামনেই বিক্রি হচ্ছে সিগারেট। এ দৃশ্য শুধু শহরে নয়, গ্রামেও বিদ্যালয়ের ১০০ মিটারের মধ্যে তামাকজাত পণ্য বিক্রি হচ্ছে। শিশুরা সাধারণত কৌতূহলী হয়। রাস্তাঘাটে, ঘরের মধ্যে পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হতে হতে কিংবা ধূমপান দেখতে দেখতে অনেক সময় শিশু-কিশোরদের মধ্যে ধূমপানের কৌতূহল জাগ্রত হয়। এটা সবচেয়ে বিপজ্জনক! পরিবারের আপনজনকে বছরের পর বছর ধূমপান করতে দেখতে দেখতে শিশু-কিশোরদের ধূমপানের ইচ্ছা পোষণ করা অস্বাভাবিক কিছু নয়!

বাংলাদেশে তামাকজাত পণ্য উৎপাদন, প্রচার-প্রসারের পেছনে তামাক কোম্পানিগুলোর ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে। কোম্পানিগুলো নিজেদের ব্যবসার স্বার্থে সমাজের ক্ষতির কথা চিন্তা করে না! কোম্পানিগুলো তামাক উৎপাদনও করে আবার তার ক্ষতির কথাও বলে! কৃষককে সুযোগসুবিধা দিয়ে কোম্পানিগুলো দেদার তামাক উৎপাদন করে যাচ্ছে। কৃষক ধান, পাট বাদ দিয়ে অতিরিক্ত লাভের জন্য জমিতে তামাক চাষ করছেন। তামাক কোম্পানিগুলো বিভিন্ন কৌশলে কিশোরদের টার্গেট করে। কেননা শিশু-কিশোরদের তামাক ধরিয়ে দিতে পারলে নিশ্চিতে বহু বছর তাদের ক্রেতা হিসেবে পাওয়া যাবে। একদিকে সরকারি-বেসরকারি সংস্থা তামাকের কুফল তুলে ধরে দেশের সবাইকে তামাক থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানাচ্ছে, অন্যদিকে তামাক কোম্পানিগুলোকে প্রকাশে ব্যবসার সুযোগ দিচ্ছে। সিগারেট, বিড়ি ও অন্যান্য তামাকপণ্যের নেশা এমন একটি ব্যাপার যেটা শুধু পণ্যের কর বাড়িয়ে প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়।

জনপরিসরে তামাকজাত পণ্য ও ধূমপান নিষিদ্ধ হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটা মানা হয় না। তামাকজাত পণ্যের বিজ্ঞাপন ও প্রদর্শন নিষিদ্ধ হলেও তা থেমে নেই। ‘গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে’র সর্বশেষ ২০১৭ সালের রিপোর্ট বলছে, ১৩ থেকে ১৫ বছর বয়সি শিক্ষার্থীর মধ্যে তামাক ব্যবহারের হার ৯ শতাংশ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৩ সালের প্রতিবেদন বলছে, বিশ্বে প্রতি বছর তামাক ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহারের ফলে প্রায় ৮৫ লাখ মানুষ মারা যায়। তথ্য বলছে, সারা বিশ্বে ১৩ থেকে ১৫ বছরের প্রায় ৩ কোটি শিশু তামাক সেবন করছে। তামাককে বলা হয় মাদকের প্রবেশদ্বার। তামাক ও তামাকজাত দ্রব্য গ্রহণ করতে করতে অনেকে মাদকের পথে পা বাড়ায়। অনেক সময় তামাক ক্ষেতে শিশুশ্রমিক হিসেবে গরিব শিশুদের কাজ করতে দেখা যায়। এটা আরও ভয়াবহ ব্যাপার। তামাক ক্ষেতে কাজ করার কারণে শিশুরা সরাসরি তামাকের সংস্পর্শে আসে। তামাক চাষ বৃদ্ধির ফলে খাদ্যসংকট দেখা দেয়। এ ছাড়া পরিবেশের জন্যও তামাক চাষ ক্ষতিকর।

সুস্থ ও মেধাবী জাতি গঠন করতে হলে শিশুদের তামাক থেকে দূরে রাখতেই হবে। ২০৪০ সালের মধ্যে দেশকে তামাকমুক্ত করার অঙ্গীকার করা হয়েছে। শিশুদের ওপর তামাকের আগ্রাসন বন্ধ এবং পর্যায়ক্রমে দেশ তামাকমুক্ত করতে হলে প্রথমেই তামাক চাষ বন্ধ করতে হবে। ঘরে কিংবা ঘরের বাইরে শিশুদের সামনে ধূমপান থেকে বিরত থাকতে হবে। ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন-২০০৫-এর যথাযথ প্রয়োগের পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়াতে হবে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা