সাবরিনা আফরোজ সেবন্তি
প্রকাশ : ১৭ আগস্ট ২০২৪ ১৩:২৪ পিএম
দুই বোনের সঙ্গে মাহামুদুর রহমান সৈকত
ছবির ছেলেটা আমার ভাই, আমাদের দুই বোনের একমাত্র আদরের ভাই। আমরা ওকে কী পরিমাণ ভালোবাসি এটা হয়তো কখনও আর তাকে বলাই হবে না, সুযোগ কই?
যেদিন প্রথম আম্মু তাকে বাসায় আনে, এসেই সে আমাদের দুই বোনের গায়ে সসম্মানে হিসু করে ভালোবাসার জানান দেয়! আমাদের ছোট্ট বাবুটাকে আমরা ভালোবেসে ‘টুনা’ ডাকতাম। ছোট্ট টুনা বড় হয়ে বড় টুনা হলো, কিন্তু সে টুনাই রয়ে গেল আমাদের কাছে, সৈকত হতে পারল না। সেটা নিয়ে কি রাগ তার! বলত, ‘আমাকে বন্ধুদের সামনে টুনা ডাকবা না তো সেবন্তি আপু।’ সামনের ১১ সেপ্টেম্বর তার ২০ বছর হওয়ার কথা ছিল। জন্মদিনের কয়েক দিন আগে থেকেই গান শুরু করত, ‘সেবন্তি আপু, কী কেক বানাবা তুমি?’
কত হাসিখুশি ছিলাম আমরা। এখন বুকজুড়ে শুধুই হাহাকার। কী যেন নেই, নেই তো নেই-ই।
আমাদের কলিজাকে গুলি করে মারা হয়েছে। আমার ফুলের মতো ভাইটাকে ঠান্ডা মাথায় টার্গেট করে মাথায় গুলি করা হয়েছে। বাবার কাঁধে ছেলের লাশের চেয়ে ভারী এ পৃথিবীতে কিছু আছে?
বিচার কাকে দেব? আল্লাহর কাছে দিলাম। আল্লাহ কখনও কারও সঙ্গে অবিচার করেন না।
আমি জানি না আমরা আর কখনও মন খুলে হাসতে পারব কি না, ওর পছন্দের কিছু খেতে পারব কি না, কখনও সত্যিকারের ভালো থাকতে পারব কি না। এসবের কিছু জানি না। শুধু জানি, আমার ছোট্ট ভাইটা নির্দোষ। ছোট্ট ভাইটা আমার বীরের মতো তার বন্ধুকে বাঁচাতে গিয়েছিল। কারণ এটাই তার পারিবারিক শিক্ষা যে কাউকে বিপদে পড়তে দেখলে সাহায্য করতে হয়।
কখনও আর ভাইকে দেখতে পারব না, জড়িয়ে ধরতে পারব না, গালে-কপালে জোর করে চুমু দিতে পারব না, আর কখনও বলতে পারব না, ‘টুনা কয়েল ধরায়ে দে, টুনা পানি দে।’
আমার ভাই শহীদ। ১৯ জুলাই, ২০২৪ শুক্রবার, বিকাল ৩টা ৩৭ মিনিটে আমার ভাইয়ের মাথায় গুলি করা হয়েছে। মুসলমানদের জন্য শুক্রবারে মৃত্যু হচ্ছে স্বপ্ন। জান্নাতে সবুজ পাখি হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে আমার ছোট্ট ভাইটা। আমরাও অপেক্ষায় আছি কবে পাখির সঙ্গে দেখা হবে আবার! সবাইকে জানাতে চাইÑআমার ভাই শহীদ ও নিষ্পাপ। সবাইকে জানাতে চাইÑসে কখনও কারও ক্ষতি করেনি।
আজ ২৯ দিন হয়ে গেল টুনারে দেখি না। ও বাসায় আর ফেরে না! এই যে সবার সঙ্গে হেসে কথা বলছি, বের হচ্ছি বাসা থেকে, বন্ধুদের সঙ্গে দেয়ালে রঙ করে বেড়াচ্ছিÑ ভাবছি একটুখানি শান্তি পাব মনে। কিন্তু না! শান্তি নেই মনে। বুকটা ভার হয়ে আছে, শান্তি নেই, কোনো কিছুতে শান্তি নেই। জানি না কীভাবে জীবনের বাকি দিনগুলো কাটাব। এই একটা গুলি আমাদের সবার জীবনটা তছনছ করে দিল। আম্মু একটু পরপর কান্না করে, আব্বু টুনার কবরে গিয়ে বসে থাকে। এই যে আমার মায়ের আর্তচিৎকার, বাবার বুকভরা হাহাকার আর আফসোস, আমাদের দুই বোনের কান্না- এসবের বিচার কি হবে না ভাবছেন? বিচার অবশ্যই হবে।
১৯ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলনে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে পুলিশের গুলিতে নিহত হন মাহামুদুর রহমান সৈকত। সরকারি মোহাম্মদপুর মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করা সৈকত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। লেখক সাবরিনা আফরোজ সেবন্তি সৈকতের বড় বোন।