চারদিকে নীরব ও অন্ধকার রুমালীর ঘর। রুমালীর ঘরের ফ্যান শব্দ করে ঘুরছে। শব্দটা বিরক্তিকর নয়। বদ্ধ ঘরের চার দেয়ালে তীব্র বেগে বাতাস ধাক্কা খাচ্ছে। খেয়াল করে শুনলে মনে হবে ঘড়ির কাঁটার কট কট শব্দ। প্রায় বন্ধ জানালার ছোট্ট ফাঁক দিয়ে সে দেখার চেষ্টা করল, নাহ, বৃষ্টি হচ্ছে না। ফ্যানের শব্দ তাকে ধোঁকা দিয়েছে। বোধহয় সবাই সবাইকে ধোঁকা দেয়। সেই পিনপতন নীরবতার বেড়াজাল ভাঙলেন মা।
তিনি হয়তোবা বলতেই যাচ্ছিলেন, ‘মা খেতে আয়’। রুমালীর কাঁদো কাঁদো মুখ দেখে তিনি আর তা বললেন না। রুমালীর পাশে বসলেন মা। রুমালীর মাথায় হাত রাখলেন। তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন, বললেন, ‘মা রে সব ঠিক হয়ে যাবে। কষ্ট পাস না।’ মা ঘর থেকে বেড়িয়ে গেলেন। যাওয়ার সময় বলে গেলেন খেতে আসতে। তবে রুমালী জানে কিছুই ঠিক হবে না। সবাই তো কথা দেয়, কতজন কথা রাখে?
রুমালীর চাচ্চুর বয়স ২২ বছর। রুমালীর আসল নাম রুমা, তবে ছোটবেলায় দাদির বানানো উলের রুমালের মতন নরম গাল থাকায় চাচ্চু তাকে রুমার বদলে রুমালী বলে ডাকত। দেশের এই অরাজকতায় রুমালীর চাচ্চু নিহত হয়েছেন। রুমালীর ভাই কলাবাগান রোডে রোদে দাঁড়িয়ে সারা দিন ট্রাফিক পুলিশের কাজ করেছেন। ভাই রুমালীকে কথা দিয়েছে আজ কী কী হলো তার সব গল্প করবে। রুমালী নিশ্চিত ভাইয়া ঘরে ফিরে আজ তার সঙ্গে গল্প করবে। সে আজ সারা দিন রোদে দাঁড়িয়ে কষ্ট করেছে। প্রকৃতি কথা দিয়েছে, ‘আজ বৃষ্টি হবে।’ ভাইয়া কথা দিয়েছে ‘সে আজ তাকে গল্প শোনাবে।’ চাচ্চু কথা দিয়েছিলেন ‘সে ঘরে ফিরে আসবে।’
রুমালী জানে তারা কেউ তাদের দেওয়া কোনো কথা রাখতে পারবে না। জানালার ছোট্ট ফাঁক দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা পানি এসে পড়ল রুমালীর গায়ে। রুমালী জানালা খুলে দিল। ডোরবেল বাজল, ভাইয়া এসেছে। ভাইয়া প্রয়োজনের একটু জোরেই বলে উঠল, ‘আমার রুমালী কোথায় রে? গল্প শুনবি না?’
ভাইয়া কথা রেখেছে, প্রকৃতি কথা রেখেছে, চাচ্চুও কি কথা রাখবে? সে কি আবার ফিরে আসবে এই সোনার বাংলায়? সব কি ঠিক হয়ে যাবে একদিন? ছোট্ট রুমালীর স্বপ্ন এখন একটা শান্তির দেশের, সোনার দেশের, এমন একটা দেশের যেখানে সবাই কথা রাখে, যেখানে কোনো রক্তপাত হয় না, যেখানে ছোটরাও স্বপ্ন দেখতে পারে, যে দেশে সবাই একসাথে বলে উঠবে- জয় বাংলা।
ষষ্ঠ শ্রেণি, নালন্দা হাই স্কুল, ঢাকা