জেন-জি
গোলাম কিবরিয়া
প্রকাশ : ১১ আগস্ট ২০২৪ ১১:১০ এএম
আপডেট : ০৩ মার্চ ২০২৫ ১৪:৫২ পিএম
জেন-জি প্রজন্ম চাইছে সমাজটাকেই বদলে দিতে।
সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনে ঘুরেফিরে আলোচনায় এসেছে জেনারেশন জেড বা জেন-জি প্রজন্ম। জেন-জি কারা? কোটা সংস্কার আন্দোলন দিয়ে শুরু, সরকার পতন এবং সরকার গঠনেও রয়েছে তাদের অংশগ্রহণ। চাইছে সমাজটাকেই বদলে দিতে। সেই প্রজন্মকে নিয়ে লিখেছেন গোলাম কিবরিয়া
জেনারেশন জেড বা জেন জি কারা?
জেনারেশন জেড বা জেন-জি, যাদের Gen z, Generation, Gen Tech, Gen Wii, Homeland Generation, Net Gen, Digital Natives, Plurals এবং Zoomers নামেও ডাকা হয়। কারণ এ প্রজন্ম বড় হয়েছে ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়ার সঙ্গে। ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের ভেতর যাদের জন্ম, তারাই হলো জেন জি বা জেনারেশন জেড। বর্তমানে এ প্রজন্মের সদস্যদের বয়স ১২ থেকে ২৭ বছর। মূলত এ প্রজন্ম হলো প্রকৃত ডিজিটাল প্রজন্ম। এর আগের প্রজন্ম ইন্টারনেটের উত্থান দেখলেও তারা ডিশ ক্যাবল সংযুক্ত টেলিভিশন দেখেছে, ল্যান্ডফোন ব্যবহার করেছে। কিন্তু জেন জি গোত্রের অধিকাংশই বড় হয়েছে এক ধরনের প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের সময়ের মধ্য দিয়ে। এ প্রজন্মের অনেকেই একেবারে ছোটবেলা থেকে ফেসবুক ব্যবহার করছে, অন্যান্য সমাজমাধ্যমে সময় কাটাচ্ছে; কিন্তু এর আগের প্রজন্মের বেড়ে ওঠা এমন ছিল না।

এখন জেন জির অনেক সদস্যই স্মার্টফোন আসার আগের কোনো জীবনের কথা মনে করতে পারে না। আবার জেন জি বড় হয়েছে আইফোনের যুগে। ২০০৭ সালে অ্যাপলের আইফোন প্রথম বাজারে আসে, যার প্রতিটি সংস্করণই সময়ের চেয়ে এগিয়ে।
জেন জিদের বৈশিষ্ট্য
জেনারেশন জেডের সদস্যরা আগের প্রজন্মের চেয়ে বেশি বাস্তববাদী এবং অল্প বয়সে দ্রুত পরিপক্ব। এ প্রজন্মের মাঝে ক্যারিয়ার নির্ধারণে সতর্কতা, শিক্ষা বা ডিগ্রি অর্জনের হারও বেড়েছে। সবশেষে কোভিড মহামারিও এ প্রজন্মকে নতুন করে প্রভাবিত করেছে। প্রযুক্তি তাদের কাছে সুবিধা নয়, মৌলিক চাহিদার শামিল। মোবাইল ইন্টারনেট ও ব্রডব্যান্ড তাদের বিরামহীন বিনোদন ও তথ্যের প্রবাহে যুক্ত করে রেখেছে; যা অনেক ক্ষেত্রেই মনোযোগের ঘাটতি, ধৈর্যের স্বল্পতা ও অল্পতেই উত্তেজনার মতো বৈশিষ্ট্য তাদের চরিত্রে লক্ষ করা গেছে। স্বতঃস্ফূর্ততা ও গতি তাদের শক্তি। তবে স্বকীয় অস্তিত্বে বিশ্বাসী এ প্রজন্ম একক নেতৃত্ব মানতে নারাজ।
জেন জির হাতেই সরকার পতন
চলতি বছরের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত এক নির্বাচনে টানা চতুর্থবার ক্ষমতায় আসেন শেখ হাসিনা। কোটা সংস্কার কেন্দ্র করে শুরু হয় আন্দোলন; যার নেতৃত্ব দেয় মূলত এ জেন জি প্রজন্ম। আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে পুরো দেশে। সারা দেশ হয়ে উঠেছিল উত্তাল। বিশ্বজুড়ে পূর্ববর্তী প্রজন্মগুলোর কাছে এ জেন জি অলস ও খুবই আলাভোলা হিসেবে পরিচিত। কিন্তু বিস্ময়করভাবে এ প্রজন্মই শেখ হাসিনার ওপর ক্রমাগত চাপ প্রয়োগ করেছে এবং তাকে পদত্যাগে বাধ্য করেছে।
সমাজ সংস্কারে অগ্রণী ভূমিকায়
থানায় হামলা ও সহকর্মীদের হত্যার প্রতিবাদে অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতিতে গেছে ট্রাফিক পুলিশ। থানাগুলোতেও ঝুলছে তালা। এ অবস্থায় রাজধানীর সড়কগুলোয় ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্ব পালন করছেন জেন জি প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা। রাজধানীর ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, শাহবাগ, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, আসাদগেট, শ্যামলী, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডিসহ বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে ট্রাফিকব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতা ও দেয়াললিখনের কাজও করছেন শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের নিয়ন্ত্রণে যেখানে-সেখানে থামতে পারছে না গাড়ি। উল্টোপথে চলার কোনো সুযোগ নেই। হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেল চলা বন্ধ। লাইন ভেঙে তাড়াহুড়ো করে সামনে যাওয়ার তাড়া নেই চালকদেরও। পথচারীরা রাস্তা পার হচ্ছেন শৃঙ্খলা মেনে। যেখানে-সেখানে দাঁড়িয়ে যাত্রীও তুলতে পারেননি বাসের হেলপাররা।
মগবাজার মোড়ে দেখা গেল হেলমেট না থাকায় এক মোটরসাইকেল আরোহীকে ১০ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকার শাস্তি দিলেন শিক্ষার্থীরা। কোথাও কোথাও আইন না মানলে এক ঘণ্টা যানজট নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ইউল্যাব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মরিয়ম জামান বলেন, ‘আমরা রাষ্ট্র মেরামতের কাজে রাস্তায় আছি। যত দিন না ট্রাফিক পুলিশ আসে আমরা রাস্তায় থাকব। তবে রাস্তায় ট্রাফিক পুলিশদের কতটা কষ্ট করতে হয় সে অভিজ্ঞতা হলো।’
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাফিজুর রহমান। থাকেন শনিরআখড়ার জিয়া সরণি এলাকার গ্যাস রোডে। পুলিশ কর্মস্থলে না থাকায় আইনশৃঙ্খলার অবনতির আশঙ্কায় নিজ এলাকায় রাত জেগে দলবেঁধে পাহারা দিয়েছেন। নাফিজুর নিজ অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে বলেন, ‘ডাকাত আতঙ্কের জন্য রাতে মহল্লায় যুব সংগঠন সাঁকো-Shako-এর ভাইয়েরা মিলে ডাকাত দমন কমিশনের কাজ করলাম; একটুও ক্লান্তি আসেনি। মহল্লার মানুষগুলো কতটা আন্তরিক সেটাও দেখলাম। রাতে প্রতিটি গাড়ি চেক করে মহল্লায় ঢোকানো হলো। ড্রাইভাররাও এ কাজের প্রশংসা করলেন। সবশেষে মহল্লার বড় ভাইদের সঙ্গে যে আন্তরিকতা ও শ্রদ্ধার মেলবন্ধন হলো এটাই সবচেয়ে বড় পাওয়া। পাশাপাশি নাইটগার্ডের চাচাদের সঙ্গেও একটা ভালো সময় কাটল।’
সড়কে দায়িত্ব পালন করা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রিমন মাহমুদ বলেন, ‘সবাই আমাদের সহযোগিতা করছেন। সেনাবাহিনীর সদস্যরাও স্যালুট দিচ্ছেন। অভিভাবকরা সাপোর্ট দিচ্ছেন। এ কাজের মাধ্যমে ভিন্নতর অভিজ্ঞতা অর্জনের পাশাপাশি নিজেদের ভেতরেও সচেতনতার ভিত তৈরি হচ্ছে।’
দেশের বিভিন্ন স্থানেও একই দৃশ্য লক্ষ করা গেছে। আশুলিয়া কলেজের শিক্ষার্থী আমেনা আক্তার এ্যানি বলেন, ‘আশুলিয়ায় যে পুলিশ বক্স ভাঙচুর হয়েছে আমরা সেটা পরিষ্কার করেছি এবং ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করেছি। গত ১৫-১৬ বছরে বাংলাদেশের মাঠে ঘাটে ছিল আশঙ্কা আর ভয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীরাই অনেক ক্ষেত্রে ঘুষ আর দুর্নীতি করেছে। এখন আমি মুক্তমনা, কথা বলতে পারি। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলতে পারি। কিছু দিন আগ পর্যন্তও আমি নিজেকে সাধারণ ছাত্র ভাবতাম কিন্তু যেদিন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে যোগ দিয়েছি, আমি যেন আমার আমিকে ফিরে পেয়েছি। আমি এ বাংলাদেশ আর হারাতে চাই না।’

কারওয়ান বাজারে প্ল্যাকার্ড হাতে মিছিল করতে করতে কাঁচাবাজারের ভেতর দিয়ে যেতে দেখা যায় একদল শিক্ষার্থীকে। প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল‘সিন্ডিকেট নিপাত যাক, কারওয়ান বাজার মুক্তি পাক’, ‘চাঁদাবাজির দিন শেষ, গড়ব সোনার বাংলাদেশ’ ইত্যাদি। কয়েকটি স্থানে মিছিল থামিয়ে তারা ব্যবসায়ীদের বলেন, ‘আপনারা আর কাউকে চাঁদা দেবেন না’, ‘সবাই মিলে সিন্ডিকেটমুক্ত বাজার গড়তে এগিয়ে আসুন’। এ তরুণদেরই আবার দেখা যায় রাত জেগে এলাকা পাহারা দিতে এবং সংসদ ভবন পরিষ্কার করতে। তারাই গণভবনের লুট হওয়া জিনিসপত্র সংগ্রহ করে সেনাবাহিনীকে বুঝিয়ে দিচ্ছেন। দেয়ালে, বিভিন্ন স্তম্ভে আঁকছেন নতুন দিনের রঙিন গ্রাফিতি।
পুরান ঢাকায় বিভিন্ন মোড়ে ট্রাফিকের দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায় শিক্ষার্থীদের। রাহি নামে এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘অনেক কষ্ট ও ত্যাগের বিনিময়ে আন্দোলনে সফলতা পেয়েছি। যতটুকু পারি দেশের ভালোর জন্য কাজ করতে চাই। সড়কে শৃঙ্খলা মানলে সবারই লাভ। কাউকেই যানজটে আটকে থাকতে হবে না। তাই সাধারণ মানুষকে সচেতন করার চেষ্টা করছি।’
আন্দোলন থেকে সরকারের অংশ
কোটা সংস্কার আন্দোলন সফল করার পর এখন অন্তর্বর্তী সরকারেও স্থান করে নিয়েছে এ প্রজন্ম। নতুন এ সরকারে ১৭ জন উপদেষ্টা রয়েছেন, যাদের মধ্যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দুজন সমন্বয়কও আছেন। এরা হলেন মো. নাহিদ ইসলাম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। সার্টিফিকেট অনুযায়ী দুজনের বয়সই ২৬। বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ উপদেষ্টা হলেন তারা। অন্তর্বর্তী সরকারের সব মন্ত্রণালয়ের কাজ তদারকিতে আন্দোলনকারী ছাত্র প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করা হবে বলে জানিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম।
আন্দোলনকারীদের কথা
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফারহাত মাইশা বলেন, ‘একজন আইনের শিক্ষার্থীর দৃষ্টিকোণ থেকে আমিচ চাই আইনের প্রয়োজনীয় সংস্কার ও বিচারব্যবস্থার উন্নয়ন করা। বাংলাদেশ সংবিধানের তৃতীয় অংশের ধারা ২৮(১) এবং ধারা ৩৪ নারীর ও শিশুর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে আইনগত প্রতিকার এবং নারীর অধিকার সুরক্ষার নিশ্চয়তা প্রদান করে। তবে বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের ২০২৩ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি বছর সারা দেশে ৪০ থেকে ৫০ হাজার নারীর প্রতি নির্যাতন ও সহিংসতা সংক্রান্ত মামলা দায়ের হয়। এ মামলাগুলোর নিষ্পত্তির হার গড়ে ৫ শতাংশের কম। অর্থাৎ মামলার বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়া ও বিচার বিভাগীয় সুষ্ঠু তদন্তের অভাবে বাংলাদেশের নারীরা ন্যায়বিচার প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হন। এ ছাড়া দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারীরা সামাজিক প্রতিবন্ধকতা এবং আইনি সহায়তার অভাবে আদালতের দ্বারস্থ হতে পারেন না। চাওয়া থাকবে বিচার বিভাগীয় এসব সমস্যার সমাধান ঘটিয়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য ও সহিংসতা বিলুপ্ত করা।’
ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাকিব নিজাম বলেন, ‘আমি চাইব দুর্নীতিমুক্ত একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে সরকারের প্রতিটি সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতিমুক্ত কার্যব্যবস্থা নিশ্চিত হবে।’ এআইইউবির আইনের শিক্ষার্থী সায়মন রহমান আকিব বলেন, ‘আমি চাই নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা। একটি দেশের আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হলে বিচারব্যবস্থা নিরপেক্ষ হওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ।’ ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ প্রয়োজন বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাবিহা আলম। তিনি বলেন, ‘সঠিক নীতি ও পরিকল্পনা করে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। সবকিছুতেই ঢাকামুখী যে ব্যবস্থা, তার পরিবর্তন আনতে হবে। এতে ঢাকার ওপর চাপও কমবে এবং অন্য জেলাসমূহও সমানভাবে উন্নত হবে।’ প্রাথমিক থেকে শুরু করে সকল পর্যায়ে যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা আনা জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পুরোনো জৌলুস ফিরিয়ে আনা ও সবার কর্মসংস্থান নিশ্চিত করে জনসাধারণের জীবনমানের উন্নয়ন নিশ্চিত করতে চান পাবনার শহীদ সরকারি বুলবুল কলেজের শিক্ষার্থী সামিহা তাসনিম ইরা।