ইকবাল খন্দকার
প্রকাশ : ০৮ আগস্ট ২০২৪ ১১:৫৫ এএম
আপডেট : ০৮ আগস্ট ২০২৪ ১২:৩৭ পিএম
অলংকরণ :জয়ন্ত সরকার
মাঝারি আকারের একটা গুদামঘর। ঘরটাতে বাস করে অনেকেই। যেমন তেলাপোকা, উইপোকা, পিঁপড়া, মশা ও কুনোব্যাঙ। আর বাস করে বড়োসড়ো একটা টিকটিকি। যে টিকটিকির বদভ্যাসের শেষ নেই। সে ভীষণ অলস। নিজের কাজ নিজে করতে চায় না। অন্যদের দিয়ে করাতে চায়। আর ভীষণ অহংকারী। সে কাউকে সম্মান করে না। কেবল সম্মান পেতে চায় সবার।
টিকটিকিটার সবচেয়ে বড় বদভ্যাস হলো সে সারাক্ষণই মিথ্যা বলে। তার মিথ্যা কথার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ গুদামঘরের সবাই। এ ছাড়া সে একেক সময় একেক বিষয় নিয়ে মিথ্যা বলে। যেমন কদিন ধরে বলছে, আমি কিন্তু টিকটিকি না। আমি হচ্ছি কুমির। বয়স কম তো! এজন্য আকারে ছোট। বয়স আরেকটু বাড়লেই বড় আকারের কুমির হয়ে যাব। টিকটিকিটা নিজের পরিচয় নিয়ে মিথ্যা কথা যেমন বলছে, তেমন ভয়ও দেখাচ্ছে সবাইকে। যেমন গতকাল কুনোব্যাঙকে বলল, এখন বাচ্চা আছি তো, এজন্য তোমাকে খেতে পারছি না। কটা দিন যেতে দাও। তারপর যখন বড় কুমির হয়ে যাব, তখন গিলে খেয়ে ফেলব তোমাকে। যদি বাঁচতে চাও, তাহলে এখন থেকেই আমাকে সম্মান করো। আমার কথামতো চলো।
টিকটিকির কথার কোনো প্রতিবাদ করেনি কুনোব্যাঙ। কীভাবে করবে? ভয়ে যে তার বুক কাঁপছিল। আর সেই কাঁপুনি এখনও থামেনি। কারণ সে ভাবছেÑকুমিরের বাচ্চাটা যখন বড় হয়ে যাবে, তখন আর তাকে বেঁচে থাকতে দেবে না। একটু ক্ষুধা লাগলেই চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে। কুমিরদের দাঁত কত ধারালো হয়, তার জানা আছে। কুনোব্যাঙকে ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে বসে থাকতে দেখে তার কাছে এগিয়ে আসে তেলাপোকা। জানতে চায় কী হয়েছে। কুনোব্যাঙ প্রথমে কিছু বলতে না চাইলেও তেলাপোকার চাপাচাপিতে না বলে পারে না। এরপর শুরু করে কান্না। তেলাপোকা তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলে, তুমি যেমন এখানে নিরাপদ না, আমরাও কিন্তু নিরাপদ না। কারণ, সে যখন বড় কুমির হবে, তখন তার ক্ষুধা বেড়ে যাবে। আর এক এক করে আমাদের সবাইকে খেয়ে ফেলবে। কুনোব্যাঙের কান্না আরও বেড়ে যায়। তেলাপোকা এবার আর তাকে সান্ত্বনা দেয় না। বলে, এখানে বসে বসে যতই কাঁদো, বাঁচতে পারবে না। বাঁচতে চাইলে কুমিরের বাচ্চাটা বড় হওয়ার আগেই এ গুদামঘর ছেড়ে চলে যেতে হবে। তুমি একা না, আমরা সবাই যাব। তবে কোথায় যাব, সেটা আগে ঠিক করতে হবে। প্রিয় গুদামঘর ছেড়ে চলে যেতে হবে ভাবতেই বুকটা হুহু করে ওঠে কুনোব্যাঙের। মন খারাপ হয় তেলাপোকারও। এ গুদামঘর যে তাদের জন্মস্থান। কত মধুর স্মৃতি জড়িয়ে আছে এ ঘরের সঙ্গে! এমন ঘর কি আর কোথাও খুঁজে পাবে? পেলেই বা কী? সব জায়গা তো আর জন্মস্থানের মতো প্রিয় হয় না। পরদিন মশা, উইপোকা আর পিঁপড়াকে নিয়ে মিটিংয়ে বসে কুনোব্যাঙ এবং তেলাপোকা। ভয়ে ভয়েই বসে। কারণ, তারা জানে টিকটিকিটা টের পেলে বিপদ হয়ে যাবে। কুনোব্যাঙ কাঁদতে কাঁদতে সবাইকে ঘটনা খুলে বলে। এরপর জানায়, যত তাড়াতাড়ি পারে গুদামঘর ছেড়ে চলে যাবে। কুনোব্যাঙের কথা শুনে অন্যেরাও কাঁদতে থাকে। আর জানায়, তারাও চলে যাবে।
হঠাৎ একটা চিৎকারের শব্দ শোনা যায়। কুনোব্যাঙসহ সবাই হকচকিয়ে ওঠে। উইপোকা আর পিঁপড়া তো ভয়ে গর্তেই ঢুকে যায়। তবে তেলাপোকা বোঝার চেষ্টা করে চিৎকারটা কে দিয়েছে। বোঝার চেষ্টা করে কুনোব্যাঙও। তারপর কয়েক পা সামনে এগিয়ে যেতেই দেখে টিকটিকিটা আধমরার মতো পড়ে আছে। কুনোব্যাঙ আরেকটু এগোয়। তার পেছন পেছন এগোয় অন্যেরাও। তাদের দেখে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে টিকটিকিটা। আর বলে, সর্বনাশ হয়ে গেছে ভাই। আমি দেয়ালের ওপর থেকে নিচে পড়ে গিয়েছিলাম। এতে আমার লেজে খুব চোট লাগে। আর লেজটা কেটে যায়। ওই দেখো। কুনোব্যাঙসহ সবাই দেখতে পায় টিকটিকির কেটে যাওয়া লেজটা অনবরত লাফাচ্ছে। তারপর একসময় থেমেও যায় লাফালাফি। আর তেলাপোকারা তাকাতে থাকে একে অন্যের দিকে। পিঁপড়া তো হেসেই ফেলে ফিক করে। কুনোব্যাঙ টিকটিকিটার সামনে বসে বলে, তুমি না কুমিরের বাচ্চা? তাহলে তোমার লেজ কাটা পড়ল কেন? লেজ তো কাটে টিকটিকিদের। এবার লজ্জায় কোনো কথা বলতে পারে না টিকটিকি। সে বসে থাকে মুখ আড়ালে নিয়ে। কুনোব্যাঙ বলে, আমি এখন ইচ্ছে করলে তোমার কাটা লেজটা খেয়ে নিতে পারি। এমনকি তোমাকেও খেয়ে ফেলতে পারি। কি, খাব নাকি? আবার হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে টিকটিকি। কুনোব্যাঙ বলে, ঠিক আছে, তোমাকে খেলাম না। আর এটাও জেনে রাখো, তোমার লেজ আবার গজাবে। তবে এখন আমাকে একটা কথা দিতে হবে। কোনো দিন মিথ্যে বলবে না, মিথ্যে পরিচয় দেবে না। আরে বাপুরে, তুমি টিকটিকি আছো, টিকটিকিই থাকো না। মিছেমিছি কুমিরের বাচ্চা সাজতে হবে কেন? টিকটিকি কথা দেয় আর কোনো দিন মিথ্যে বলবে না। মিথ্যে পরিচয়ে পরিচিত হতে চাইবে না। আর সবার সঙ্গে মিলেমিশে থাকবে। এবার কুনোব্যাঙসহ সবাই তাকে বুকে জড়িয়ে নেয়।