রক্তের অক্ষরে লেখা নাম
আল-আমিন
প্রকাশ : ০৪ আগস্ট ২০২৪ ১০:৪০ এএম
শাবিপ্রবির শিক্ষার্থী রুদ্র সেন
কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সারা দেশ হয়ে উঠেছিল উত্তাল। এই অস্থির সময়ে অনেক শিক্ষার্থীই হারিয়েছেন তাদের সহপাঠী বন্ধুকে। এমনই সহপাঠী বন্ধু শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রুদ্র সেনের কথা স্মৃতিচারণ করেছেন তার সহপাঠী আল-আমিন
রুদ্রের সঙ্গে আমার পরিচয় সেই ভর্তির প্রথম দিন থেকেই। রুদ্র বলেছিল সে ঢাবি, রাবি, হাজী দানেশসহ আরও অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়েছে। সে শুধু সাস্টে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হয়েছে; কারণ তার স্কলারশিপ নিয়ে দেশের বাইরে যাওয়ার ইচ্ছা আছে। দুজনে একসঙ্গে ট্রেনে ফিরছিলাম। যদিও তখন আমি অন্য ডিপার্টমেন্টে ছিলাম। সেদিন বুঝতে পারিনি এই মানুষটির সঙ্গে একসময় আমার এত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক হবে। সেই শুরু দুজনের একসঙ্গে চলা। সর্বদা সাদাসিধে হাসিখুশি মানুষ ছিল রুদ্র। যতই বিপর্যয় নিজের ওপর দিয়ে যাক না কেন, কখনও বিমর্ষ দেখেছি এ রকম কিছু মনে পড়ে না। দুজনই নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে হওয়ায় পরস্পর পরস্পরকে অনেক বেশি বুঝতে পারতাম। ঘনিষ্ঠ বন্ধু হওয়ায় রুদ্রের জীবন খুব কাছে থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল।
ক্লাস শুরু হওয়ার মাস তিনেক পর থেকেই আমরা একই বিভাগের ১০ জন একটি ফ্ল্যাটে থাকতাম। আমাদের মধ্যে সবচেয়ে আমুদে ব্যক্তিটি ছিল রুদ্র। সব সময় হাস্যোজ্জ্বল রুদ্রের উপস্থিতি ছাড়া কখনোই কোনো আড্ডা জমত না। আমরা একসঙ্গে ভার্সিটিতে ক্লাস করতে যেতাম, একসঙ্গে রেস্টুরেন্টে খেতে যেতাম, কারও জন্মদিন হলে সবাই ফ্ল্যাটে একসঙ্গে কেক কাটতাম, একসঙ্গে ট্যুরে যেতাম। ট্যুরের বিভিন্ন আইডিয়া দিত রুদ্র। এমনও হয়েছে যে, কাল আমাদের পরীক্ষা তার পরও আমরা সবাই ট্যুরের প্ল্যান করছি এবং রুদ্রের বিভিন্ন মজার আইডিয়া শুনে হাসাহাসি করছি সবাই। এ প্রচণ্ড হাসিখুশি বন্ধুসুলভ মানুষটির পেছনেও ছিল এক সংগ্রামী জীবন। নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হওয়ায় আর সবার মতোই রুদ্রকেও টিউশন করিয়ে চলতে হতো।
সারা দিন ক্লাস-ল্যাব করেও বিকাল থেকে টিউশন করিয়ে যখন রাত ১১টা-১২টায় রুমে ফিরত তখনও ওর মুখে কোনো ক্লান্তির ছায়া থাকত না। রুমে ফিরেই আমাদের বলত, জানিস আজ কী হয়েছে। এরপর ও ওর সারা দিনের ঘটনা আমাদের বলত। কোটা আন্দোলন শুরু হওয়ার অনেক আগে থেকেই এ সাদাসিধে সরলমনের রুদ্র দেশ নিয়ে অনেক ভাবত। আমাদের বলত একটি বৈষম্যহীন বাংলাদেশের কথা। অত্যন্ত মেধাবী-পরিশ্রমী এ রুদ্র তার নিজের উত্তরাঞ্চলের দরিদ্র মানুষের জীবন নির্বাহ নিয়ে অনেক ব্যথিত ছিল। রুদ্রের অনেক স্বপ্ন ছিল তার নিজের অঞ্চলের মানুষের জন্য কিছু একটা করার। রুদ্রের আরেকটি খুব ছোট্ট স্বপ্ন ছিল পাস করে বেরোনোর পর চাকরি করে নিজের বাবা-মার মুখে দুই মুঠো অন্ন তুলে দেওয়ার। বাবা-মাকে অনেক বেশি ভালোবাসত রুদ্র। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস! আজ অন্যায়ের কাছে মাথা না নোয়ানো রুদ্র অন্য এক জগতের বাসিন্দা। আর কখনোই আমাদের মাঝে ফিরবে না সেই চিরহাসিখুশি মুখটি।