কাজী ইমদাদ
প্রকাশ : ৩১ জুলাই ২০২৪ ১৩:২৫ পিএম
আডা
রাশিয়ার দক্ষিণের অঞ্চল সাইবেরিয়ার দূরবর্তী একটি খামারে আডা নামে একজনকে একটি ছুরি দিয়ে একটি শূকর জবাই করতে বলা হয়। আডা নারী-পুরুষ নির্ধারণের বিশেষ ট্রান্সজেন্ডার শ্রেণির অর্থাৎ তিনি নারীও নন আবার পুরুষও নন। ২৩ বছরের আডাকে বলা হয়, তিনি যদি নারী অথবা পুরুষ হিসেবে পরিচয় নির্দিষ্ট করতে চান তবে একটি অস্ত্রোপচারে অংশ নিতে হবে এবং আগে তাকে শূকরটি হত্যা করতে হবে।
আডা জানান, ট্রান্সজেন্ডার অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে অস্ত্রোপচার করার কথা বলে তার এক আত্মীয় তাকে ফাঁসিয়েছেন। আডা জানান, ২০২১ সালে তার আত্মীয় তাকে সাইবেরিয়ার নভোসিবিরস্ক শহরে অস্ত্রোপচারে তার সঙ্গী হতে বলেন। অস্ত্রোপচারে যাওয়ার পথে সেই আত্মীয় তাকে অন্য একজনের কাছে তুলে দিয়ে নেমে যান। যে অস্ত্রোপচারের কথা তাকে বলা হয়েছিল, পরে তা আর করা হয়নি। আডা জানিয়েছেন, জেন্ডার পরিবর্তন কেন্দ্রে তাকে আটক রেখে শ্রমিকের কাজ করানো হয়েছে। প্রায় নয় মাস পর তিনি সেখান থেকে বেরোতে সক্ষম হন। ওই কেন্দ্রে কেউ একজন একটি ফোন ফেলে যান, যেটি দিয়ে তিনি স্থানীয় পুলিশকে ফোন করেন। পুলিশ ওই কেন্দ্র থেকে আডাকে উদ্ধার করে। ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসির প্রতিনিধি সাইবেরিয়ার ওই কেন্দ্রে গেলে তারা জেন্ডার পরিবর্তনের চিকিৎসার সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করে।
আডা জানিয়েছেন, তিনি তার জীবনে সব সময়ই সংগ্রাম করেছেনÑপ্রথমে তার পরিবারের সঙ্গে, তারপর সমাজের সঙ্গে এবং এখন সমকামী ও ট্রান্সজেন্ডারদের জন্য রাশিয়ার নতুন এলজিবিটি আইনের সঙ্গে। রাষ্ট্রীয় অনেক সুযোগসুবিধা থেকে বাদ রাখা হয়েছে সমকামী ও ট্রান্সজেন্ডারদের। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ গ্রায়েমি রেইড জানিয়েছেন, রাশিয়ার ট্রান্সজেন্ডার মানুষদের মানবিক অধিকারগুলো সরকারই রহিত করে রেখেছে ক্ষুদ্র সমাজের প্রতিনিধিদের আক্রমণ করতে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে।
এক বছর ধরে রাশিয়া জেন্ডার পরিবর্তনসংক্রান্ত অস্ত্রোপচার নিষিদ্ধ। গ্রায়েম জানান, ট্রান্সজেন্ডার রাশিয়ানরা বৈধ পরিচয় এবং স্বাস্থ্যসেবার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। নতুন আইনে নথিতে ব্যক্তিগত পরিচয় পরিবর্তনের সুযোগ নেই। ২০২৩ সালের জুলাইতে এ আইন কার্যকর হওয়ার আগে আডা তার ব্যক্তিগত পরিচয় পরিবর্তন করেছেন।
২০২৩ সালে রাশিয়ার আইন মন্ত্রণালয় নতুন এক সিদ্ধান্তে আন্তর্জাতিক এলজিবিটি আন্দোলনকে চরমপন্থী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করেছে। নতুন আইনে কেউ এ ধরনের সংগঠন সমর্থন করলে সর্বোচ্চ ১২ বছরের জেলের বিধান রয়েছে। রংধনু রঙের পতাকার প্রদর্শনও জরিমানার আওতায় আনা হয়েছে। পাসপোর্ট এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নথি পরিবর্তন করার সুযোগও বন্ধ। কয়েকজন ট্রান্সজেন্ডার নিজের পরিচয় পরিবর্তন করে জটিলতায় পড়েছেন। এলি নামে একজন জানান, ইউক্রেন যুদ্ধ চলমান অবস্থায় অন্য দেশে রাশিয়ান পরিচয় নিয়ে বাস করা কঠিন আর আইনের কারণে নিজ দেশেও বাস করা যাচ্ছে না।
আডা মনে করেন, ‘একজন মানুষ তাই পরবে যা তার ইচ্ছা। তাকে পেটানো হতে পারেÑএমন আশঙ্কা কেন থাকবে?’
আডা জানান, সাইবেরিয়া থেকে বেরিয়ে তিনি মস্কোয় আসেন। তবে নতুন আইনের কারণে তিনি এখন অন্য দেশে দেন। ২০১৮ সালে রাশিয়া ছেড়ে আসা ফ্রান্সিস জানান, নতুন আইন মেনে তিনি সম্ভবত নিজ দেশে ফিরবেন না। ফ্রান্সিস জানান, আইন কার্যকর হওয়ার আগেই তার শহর ইয়েকাটেরিনবার্গ কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে। ফ্রান্সিস জানান, তিনি যতটুকু মনে করতে পারেন, তাতে তার নিজেকে মেয়ে বলে মনে হয়নি। তিনি জ্যাক নামে একজনকে বিয়ে করেছেন এবং সেখানে তার তিনটি সন্তান হয়েছে এবং আরও দুই শিশুকে তারা দত্তক নিয়েছেন। পরে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করলে ফ্রান্সিসকে ট্রান্সজেন্ডার হিসেবে অভিহিত করা হয়।