হারুন মিয়া
প্রকাশ : ১৭ জুলাই ২০২৪ ১৩:৩১ পিএম
জুতা মেরামতে ব্যস্ত বাবুলাল রবিদাস
ভাষা সংগ্রামের বছর জন্ম বাবুলাল রবিদাসের। গত ৫০ বছর ধরে অন্যের জায়গায় জুতা সেলাইয়ের কাজ করছেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই বিয়ে করেন। এর পর থেকে জীবনজীবিকার তাগিদে এ পেশায় নিয়োজিত আছেন। প্রাতিষ্ঠানিক কোনো শিক্ষা নেই। বাবুলাল রবিদাসের বাড়ি ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার বোকাইনগর ইউনিয়নের মোমিনপুর গ্রামে। সকাল ১০টায় কর্মস্থলে আসেন। সূর্য ডোবার পর বাড়ি ফিরেন। দুপুরে খাবার বলতে ২ টাকা দামের দুটি বিস্কুট ও এক কাপ চা।
পাঁচ ছেলে ও তিন মেয়ে নিয়ে পরিবারের মোট সদস্য ১০ জন। ১০ সদস্যের এ পরিবারকে এ পেশায় উপার্জিত অর্থে দিনের পর দিন চালিয়ে নিচ্ছেন। বাবুলালের বাবা মৃত সুন্দর রবিদাসের এক ছেলে, এক মেয়ের মধ্যে বাবুলাল রবিদাস সবার বড়। বিয়ের পর এ কাজে ব্যবহৃত সরঞ্জাম কিনে দেন তার বাবা। কয়েক বছর পর বাবাও মারা যান। এরপর চার সদস্যের পরিবারের হাল ধরেন তিনি।
পেশা ছোট হওয়ায় এবং পরিবারের সবার মুখে আহার তুলে দেওয়ার পর অবশিষ্ট কিছু না থাকায় অর্থ ব্যয় করে কোনো দোকান ভাড়া নিতে পারেননি তিনি। নুন আনতে পান্তা ফুরোয় অবস্থা।
জালাল হোটেলের মালিক শেখ জালাল উদ্দিন জীবিত থাকাকালে তার দোকানের বারান্দায় বাবুলালকে বসার সুযোগ করে দেন।
বাবুলাল রবিদাসের পাঁচ ছেলের মধ্যে তিনজন বিয়ে করে আলাদা সংসার করছেন। তিন মেয়ের মধ্যে দুজনকে বিয়ে দিয়েছেন। ছোট মেয়েকে বিয়ে দিতে গিয়ে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায় তার। স্থানীয় সংবাদকর্মী, শিক্ষক ও সুশীল মানুষের সহযোগিতায় বিয়ে দেন মেয়েকে।
বাবুলাল বলেন, ‘আমাদের সম্প্রদায়ে বিয়ে দিতে গেলে কমপক্ষে হলেও লাখ টাকা খরচ হয়। কারণ আমাদের মেয়েদের বাবার বাড়ি থেকে সম্পত্তির কোনো ভাগ দেওয়া হয় না। যে কারণে অর্থ ব্যয় হয় বেশি।’
বাবুলালের নিজস্ব কোনো সম্পত্তি নেই। বাবা সুন্দর রবিদাসের রেখে যাওয়া ১৫ শতাংশ জমি ২০২০ সালে পাঁচ ছেলের মধ্যে বণ্টন করে দেন। অন্যত্র সংসার করা তার তিন ছেলের মধ্যে কেউ তাকে সহযোগিতা করে না। বর্তমানে স্ত্রী এবং দুই ছেলে নিয়ে চারজনের সংসার। এক ছেলে সেলুনে এবং অন্য ছেলে একটি ওয়ার্কশপে কাজ করেন।
বাবুলাল বলেন, ‘একসময় ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা আয় হতো। কিন্তু এখন মানুষ জুতা ছিঁড়ে গেলে ফেলে দেয়; কেউ কেউ ঘরেই জুতা পালিশের সরঞ্জাম কিনে রাখে যে কারণে আগের মতো আর ইনকাম নেই।’
বর্তমানে সকাল থেকে তার দৈনিক আয় ৭০-৮০ টাকার মতো। এমনও দিন যায় ৫০ টাকা উপার্জন করা কষ্টসাধ্য হয়ে যায়। তবে ঈদ-পূজায় ৩০০ থেকে ৪০০ টাকার মতো আয়ের দেখা পান। বয়স্কভাতার পাশাপাশি এ আয় দিয়েই ডালভাত খেয়ে চলছে তাদের জীবন। বাবুলাল বলেন, ‘আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের মিল না থাকায় আমাদের নতুন বংশধরদের মধ্যে কেউ আর এ পেশায় আসছে না। সবাই ঝুঁকছে শীল সম্প্রদায়ের সেলুনের কাজকর্মে কেউবা রাজমিস্ত্রি অথবা ওয়ার্কশপে কাজ করে এখন জীবিকা নির্বাহ করছে।’ তবে কয়েক বছর আগে জালাল হোটেলের বারান্দায় একটি চায়ের স্টল ও পান দোকান ভাড়া হয়ে যাওয়ায় বসার জায়গা ছোট হয়ে এলে সমস্যার সম্মুখীন হন বাবুলাল। এসময় তার পাশে দাঁড়ান স্থানীয় মোবাইল ব্যবসায়ী জয়া টেলিকমের কর্ণধার জুয়েল কুমার ঘোষ। বর্তমানে তার বারান্দায় বসেই জুতা সেলাইয় করেন তিনি। জুয়েল কুমার ঘোষ বলেন, ‘বাবুলাল কাকা জুতা সেলাইয়ের কাজ করলেও তার মাঝে আছে সততা এবং বিশ্বস্ততা। আমার এক ছেলে পড়াশোনায় ব্যস্ত এবং ছোট হওয়ায় দোকানে বসতে দিই না। যে কারণে দোকান রেখে দুপুরে পাশের হোটেলে খাবার খেতে গেলে অথবা জরুরি কোনো কাজে দোকান থেকে বেরোলে বাবুলাল কাকা দোকানের খেয়াল রাখেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘বাবুলাল কাকা নিচু সম্প্রদায়ের মানুষ হলেও সমাজের উচ্চ শ্রেণি-পেশার মানুষ থাকে সম্মানের সঙ্গে দেখে।’
গৌরীপুর প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি শফিকুল ইসলাম মিন্টু বলেন, ‘আমি ৪৫ বছর ধরে দেখছি তিনি এ পেশায় নিয়োজিত থেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে লড়াই করছেন।’
বাবুলাল রবিদাসের ভোটার আইডি কার্ড অনুযায়ী তার জন্ম ১৯৫২ সালে। ভাষা আন্দোলনের সময় জন্ম গ্রহণ করা বাবুলাল রবিদাস তার মার্জিত ভাষা এবং সততার কারণে জুতা সেলাই করে জীবিকা নির্বাহ করলেও সবার ভালোবাসা পেয়েছেন। এলাকাবাসী তাকে সৎ মানুষ উপাধিও দিয়েছে। জীবনের শেষ ইচ্ছা সম্পর্কে বলেন, ‘সুস্থ অবস্থায় যেন আমার মৃত্যু হয়, ওপরওয়ালার কাছে এটাই প্রার্থনা।’