আশরাফুজ্জামান উজ্জ্বল
প্রকাশ : ১৫ জুলাই ২০২৪ ১২:২২ পিএম
আপডেট : ১৫ জুলাই ২০২৪ ১২:২৫ পিএম
লাতিন আমেরিকার অন্যতম দেশ আর্জেন্টিনার প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য, সংস্কৃতি এবং ইতিহাস বেশ সমৃদ্ধ
লাতিন আমেরিকার অন্যতম দেশ আর্জেন্টিনা ফুটবলের কারণে আমাদের কাছে অতি পরিচিত একটি নাম। এ দেশের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য, সংস্কৃতি এবং ইতিহাসও বেশ সমৃদ্ধ। ভ্রমণ গাইড হিসেবে আর্জেন্টিনার বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরেছেন ভূ-পর্যটক আশরাফুজ্জামান উজ্জ্বল
আর্জেন্টিনা বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম এবং দক্ষিণ আমেরিকার দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ। আর্জেন্টিনার সঙ্গে পাঁচটি দেশের বর্ডার রয়েছেÑ চিলি, বলিভিয়া, প্যারাগুয়ে, ব্রাজিল ও উরুগুয়ে। আমার ২০০৫ সালে UNWTO-এর কনফারেন্সে ও পরে ২০১৬ সালে আর্জেন্টিনাসহ লাতিন আমেরিকার অন্যান্য দেশে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। আমার দেখা আর্জেন্টিনা পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ দেশ। তার প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য, খাবার, নাচ, মানুষ, আতিথেয়তা, ফুটবল ইত্যাদি নানা গুণে গুণান্বিত। যারা আর্জেন্টিনা যাবেন তাদের জন্য প্রয়োজনীয় কিছু গন্তব্যের নাম ও কিছু তথ্য এ লেখায় ভ্রমণ গাইড হিসেবে দেওয়া হলো। দেশটিতে তিন-চার সপ্তাহ থাকতে পারলে ভালো হয়।
ইগুয়াজু এলে অবশ্যই আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল দুই দিক থেকে দেখার চেষ্টা করবেন।ইগুয়াজু ফলস
বুয়েন্স আয়ার্স থেকে ইগুয়াজু ফলসের দূরত্ব ১২৮৮ কিলেমিটার। বিমানে যেতে সময় লাগে প্রায় দুই ঘণ্টা। বাসে ১৮-১৯ ঘণ্টা সময় লাগে এবং বাস ভাড়া বাসভেদে বাংলাদেশি টাকায় দুই থেকে আট হাজার টাকা। বিমানে যাওয়াই উত্তম। এটি ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা ও প্যারাগুয়ের বর্ডারের কাছে অবস্থিত। ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার পাশে ইগুয়াজু ন্যাশনাল পার্ক রয়েছে। এই জলপ্রপাতগুলো দক্ষিণ আমেরিকার অন্যতম দর্শনীয় স্থান। ইগুয়াজু এলে অবশ্যই আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল দুই দিক থেকে দেখার চেষ্টা করবেন। ব্রাজিলের দিকে রয়েছে অসাধারণ বার্ড পার্ক। পয়সা খরচ করতে পারলে ব্রাজিলের দিক থেকে হেলিকপ্টার রাইডে নেওয়ার চেষ্টা করবেন। ইগুয়াজু জলপ্রপাতের সবচেয়ে উঁচু জলপ্রপাতকে ‘ডেভিলস থ্রোট’ বলা হয় এবং এটি ২৬৯ ফুট (৮২ মিটার) উচ্চতাসম্পন্ন, যা নায়াগ্রা ফলস (১৬৭ ফুট) থেকে ১০০ ফুট বেশি।
পেরিটো মোরেনো হিমবাহপেরিটো মোরেনো হিমবাহ
বুয়েন্স আয়ার্স থেকে প্রথমে বিমানে এল কালাফেতে যেতে হবে এবং পরে সেখান থেকে দেড় ঘণ্টার ড্রাইভে ‘পেরিটো মোরেনো’। এটি এল কালাফেতে থেকে ৭৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। পেরিটো মোরেনো হিমবাহ হলো একটি বরফের হিমবাহ; যা সান্তা ক্রুজ প্রদেশের নাস গ্লাসিয়ারেস ন্যাশনাল পার্কে দেখতে পাওয়া যায়। এখানে দর্শনার্থীরা তিন ঘণ্টার মতন সময় পান হিমবাহের ওপর হাইক করার জন্য। আপনি ছোট দলে পেরিটো মোরেনোতে হাঁটবেন।

তিয়েরা দেল ফুয়েগো ন্যাশনাল পার্ক
এটি আর্জেন্টিনার সর্ব দক্ষিণের শহর উশুয়ায়া থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এই অঞ্চলটি প্রায়শই তার অনন্য প্রাকৃতিক আকর্ষণ এবং অ্যান্টার্কটিকার প্রবেশদ্বার হিসেবে বিখ্যাত। ১ লাখ ৫৬ হাজার একর তিয়েরা দেল ফুয়েগো ন্যাশনাল পার্কটি, বিগল চ্যানেল থেকে চিলির সীমান্ত পর্যন্ত এবং উত্তর দিকে লাগো কামি পর্যন্ত বিস্তৃত। এটি হাইকারদের জন্য একটি স্বর্গ।
উশুয়ায়া
উশুয়ায়া বিশ্বের সর্ব দক্ষিণের শহর আর্জেন্টিনার পাটাগোনিয়ার তিয়েরা দেল ফুয়েগোর রাজধানী। এটি তার প্রাকৃতিক দৃশ্যের জন্য বিখ্যাত। যারা ‘অ্যান্টার্কটিকায়’ যান তারা এই উশুয়ায়া থেকে যাত্রা শুরু করেন বছরের নভেম্বর থেকে মার্চ মাস অবধি। আমার জানামতে, প্রায় ১০-১১ জন বাংলাদেশি এবং প্রবাসী বাংলাদেশি অ্যান্টার্কটিকায় ভ্রমণ করেছেন এবং ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আরও ২০ জনের অধিক একটি বাংলাদেশি অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় দল অ্যান্টার্কটিকার উদ্দেশে রওনা দেবেন। বাংলাদেশ থেকে বঙ্গোপসাগর হয়ে ভারত মহাসাগর হয়ে, দক্ষিণ মহাসাগর হয়ে অ্যান্টার্কটিকা যাওয়া সম্ভব। উশুয়ায়া থেকে অ্যান্টার্কটিকায় যাওয়ার শ্রেষ্ঠ সময় ডিসেম্বর-জানুয়ারি, তবে নভেম্বর থেকে মার্চ অবধি অনেক জাহাজ চলাচল করে।

পুয়ের্তো মাদ্রিন অ্যান্ড দ্যা ভালদেস পেনিনসুলা
পুয়ের্তো মাদ্রিন শহরটি গলফো নুয়েভোর তীরে পাটাগোনিয়ান উপকূলে অবস্থিত। এটি ১৮৮৬ সালে ওয়েলশ বসতি স্থাপনকারীদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত শহরের গভীর জলের বন্দর এবং প্রচুর প্রাকৃতির রিজার্ভ এটিকে আর্জেন্টিনার অন্যতম ক্রুজ গন্তব্যে পরিণত করছে। পাটাগোনিয়ার পেনিনসুলা ভালদোস সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণীদের সংরক্ষণের জন্য বিশ্বব্যাপী তাৎপর্যপূর্ণ এক স্থান।
-6694bc3f51021.png)
কুইব্রাডা দে লাস কনচাস
গাড়ি চালাতে/ড্রাইভিং করতে ভালোবাসেন তাদের জন্য আর্জেন্টিনার সবচেয়ে সুন্দর জায়গা হলো কুইব্রাডা দে লাস কনচাস। এটি আর্জেন্টিনায় সাল্টা শহর থেকে দক্ষিণে দেড় ঘণ্টা দূরত্বে অবস্থিত। এটি Ruta ৮৬ ধরে ড্রাইভ করতে হয়, যা ৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ পথ লালচে পাথরের গঠনের জন্য পরিচিত একটি এলাকা।

ক্যুইব্রাডা দে হুমাহুয়াকা
ক্যুইব্রাডা যার অর্থ ভাঙা, আর্জেন্টিনার গভীর খাদ বোঝাতে ব্যবহৃত এক নাম। এটি দেশের উত্তর-পশ্চিমে ১৫৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ক্যুইব্রাডা দে হুমাহুয়াকা একটি সুন্দর গিরিখাতের নিখুঁত উদহারণ। যেখানে গ্রীষ্মের নদী বয়ে যায় (শীতে নদীটি শুকিয়ে যায়)। এটি ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান, এই শুষ্ক উপত্যকাটি একসময় ইনকা সামাজের অংশ ছিল এবং গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য পথ ছিল। শিলার গঠন এবং বহুবর্ণবিশিষ্ট পাহাড়ের চাকচিক্যে এটি দর্শনীয় স্থান হিসেবে গড়ে উঠেছে।
-6694bca613f51.png)
ট্যাঙ্গো
রাস্তায় ট্যাঙ্গো নাচ দেখার জন্য আর্জেন্টিনার সেরা জায়গা হলো বুয়েন্স আয়ার্স। ট্যাঙ্গো একটি অনন্য নৃত্যশৈলী। ট্যাঙ্গো আফ্রিকান আর্জেন্টিনার ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। ট্যাঙ্গো নাচের কথা বললেই কার্লোস গাডেলের কথা বলতে হয়। উনি ছিলেন একজন ফরাসি বংশোদ্ভূত আর্জেন্টিনার গায়ক, গীতিকার, সুরকার এবং অভিনেতা। গার্ডেল সর্বকালের সবচেয়ে বিখ্যাত জনপ্রিয় ট্যাঙ্গো গায়ক এবং সারা বিশ্বে স্বীকৃত। বুয়েন্স আয়ার্সের ‘লা বোকার’-এর আশপাশে রাস্তায় ট্যাঙ্গো এবং কাই মিনিটো নামে পরিচিত, একটি প্রাণবন্ত রাস্তার পারফর্মাদের হোস্ট করে এবং দর্শকদের ট্যাঙ্গো নাচে যোগ দিতে উৎসাহিত করে।

চে গুয়েভারা
রোসারিও আর্জেন্টিনার সান্তা ফে প্রদেশের তৃতীয় বৃহত্তম শহর বুয়েন্স আয়ার্স থেকে ৩০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এই শহরেই জন্মেছিলেন মুক্তিকামী নেতা চে গুয়েভারা (১৪ জুন, ১৯২৮)। এ ছাড়াও বিশ্ববিখ্যাত ফুটবল খেলোয়াড় লিওনেল মেসিরও জন্মস্থান এখানে। ২০০৫ সালে আমার আর্জেন্টিনা ভ্রমণে চে গুয়েভারার জন্মস্থানটি দেখার সুযোগ হয়েছিল।
-6694bd11b7b26.png)
ভিলা ওকাম্পো
ভিলা ওকাম্পো হলো ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর প্রাক্তন বাড়ি। তিনি ছিলেন আর্জেন্টিনার অন্যতম সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। সুর ম্যাগাজিনের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সপক্ষে তিনি বুয়েন্স আয়ার্সের রাস্তায় বিক্ষোভ মিছিল করেন। বাড়িটি বুয়েন্স আয়ার্সের সান ইসিদ্রেতে অবস্থিত। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ৬৩ বছর বয়সে পেরু ও মেক্সিকো সরকারের আমন্ত্রণে যাত্রাপথে অসুস্থ হয়ে যাওয়ায় আর্জেন্টিনার ভিক্টোরিয়া ওকাম্পার আতিথেয়তায় ৫৮ দিন থাকেন ভিলা ওকাম্পোতে। ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে তার দেখাশোনা করেছিলেন। ভারত ও আর্জেন্টিনার যৌথ উদ্যোগে ‘Thinking of Him’ নামে একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করা হয়েছে।

কিছু তথ্য
যে কারণে ভ্রমণ করবেন
আর্জেন্টিনাকে বিশ্বের মাংসের রাজধানী বলা হয়, কারণ সেখানে উৎপাদিত উচ্চ মানের গরুর মাংস রয়েছে।ফুটবল কিংবদন্তিদের এ দেশের ফুটবল ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ। আর্জেন্টিনায় যে ধরনের স্পানিশ কথা বলা হয় তাকে বলা হয় ‘ক্যাস্টেলানো’ এবং স্থানীয়রা বিশ্বাস করে যে এটি স্প্যানিশ ভাষার বিশুদ্ধ রূপ। বুয়েন্স আয়ার্সকে বলা হয় ‘El Pais cun buena gente’ অর্থাৎ মহান মানুষের সঙ্গে একটি দেশ। আর্জেন্টিনার ট্যাঙ্গো এমন একটি নৃত্যশৈলী যা দেখতে ও শিখতেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে পর্যটক এখানে ভ্রমণ করেন। বুয়েন্স আয়ার্সে লাতিন আমেরিকান ফ্যাশন এবং ডিজাইনের নেতৃত্ব দেয়। বুয়েন্স আয়ার্সের পালমারো ফ্যাশনপ্রেমীদের জন্য একটি স্বর্গ, যা পর্যটকদের জন্য অফুরন্ত কেনাকাটার সুযোগ করে দেয়।
ঢাকা থেকে কাতার এয়ারওয়েজ; ইমিরেটস, টার্কিশ এয়ারলাইনস। আফ্রিকার ইথিওপিয়া থেকে সরাসরি ইথিওপিয়ান এয়ারলাইনসে বুয়েন্স আয়ার্স যাওয়া যায়। ব্রাজিলের সাওপাওলো থেকে তিন ঘণ্টার বিমানযাত্রায় বুয়েন্স আয়ার্সে যাওয়া যায়।
লেখক : প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ ট্রাভেল রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশন