আমিরুল আবেদীন আকাশ
প্রকাশ : ১০ জুলাই ২০২৪ ১৩:৩০ পিএম
২০২১ সালে তালেবানের ক্ষমতা দখলের পর থেকে আফগান নারীদের আছে শুধু জীবনকে বয়ে বেড়ানোর ক্ষমত্টুকুই
রুক্ষ এক এলাকাই বটে। গ্রীষ্মে ভয়াবহ গরম আর শীতকালে কনকনে শীত। রুক্ষতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক সংকট। সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়া অভিবাসী আফগানিস্তানের নারীরা শরণার্থী ক্রিকেট দল গঠনের আবেদন জানিয়েছেন আইসিসির কাছে। আচমকা গোটা বিশ্বের সবাই একটু নড়েচড়ে বসলেন। সমগ্র বিশ্বে দুটি যুদ্ধ চলমান। বিশ্বজুড়ে নির্বাচনের বছর। নির্বাচনের হাওয়ায় বিশ্ব অভিবাসী সংকটের যে তীব্র স্রোত সেদিকে মনোযোগ পড়ছে না অনেকেরই। ২০২১ সালের ১৫ আগস্ট তালেবানের ক্ষমতা দখলের পর থেকেই আফগান নারীদের জীবনকে বয়ে বেড়ানোর ক্ষমতাটুকুই শুধু আছে। মন খুলে দুটি কথা বলা দূরের কথা, ন্যূনতম নাগরিক অধিকারটুকুও কেড়ে নিয়েছে দেশটির ফতোয়াবাজ তালেবান সরকার।
দিনদিন অবস্থা এমন পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে যে, নিজ দেশে তারা অসহায় পরবাসী। সীমান্তে সীমান্তে কড়া পাহারা। তার পরও অনেক নারী কোনোভাবে দেশত্যাগ করতে বাধ্য হচ্ছেন। সম্প্রতি পাকিস্তান দ্বিতীয় ধাপে দেশটিতে অবস্থানরত আফগান অবৈধ অভিবাসীদের স্বদেশে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অধিকাংশ অভিবাসীই নারী, শিশু কিংবা বৃদ্ধÑএমনটিই জানিয়েছে বেশ কয়েকটি সংবাদমাধ্যম। আলজাজিরার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এক নারীর হাস্যোজ্জ্বল মুখ দেখা যায়। রুক্ষতার মধ্যেও সুন্দর একটি হাসি। কাবুলে আচার বিক্রি করেই তার সংসার চলে। অথচ ইচ্ছে ছিল ডাক্তার হওয়ার।
তালেবান সরকার আসার আগ পর্যন্তও জাতিসংঘের স্কুলে পড়ালেখা করে সেই স্বপ্নপূরণের অনেকটা সুযোগ ছিল। কিন্তু তা-ও বন্ধ হয়ে গেল। ডাক্তার হওয়ার খ্যাতির বদলে কাবুলে অখ্যাত আচার দোকানি হওয়া স্বদেশে পরভূমের মতোই। পাকিস্তানে অভিবাসনের পথ অনেকটা রুদ্ধ হওয়ায় অনেক নারী ইরানে আশ্রয় নিতে চাচ্ছেন। কেউ চাইলে হয়তো আরও দূরে, জটিল পথ পাড়ি দিয়ে। কিন্তু ইরান? এ ইরানেও তো নারীর স্বাধীনতা পুরোপুরি নেই। কিন্তু আফগানিস্তানের নারীরা যখন ইরানেও পাড়ি জমাতে তাড়াহুড়ো করেন তখন বোঝা যায়, দেশটিতে নারী অধিকার কী পর্যায়ে রয়েছে।
ক্ষমতা দখলের পরপরই ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে মেয়েদের স্কুলে যাওয়া নিষিদ্ধ করা হয়। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে নারীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া নিষিদ্ধ করা হয়। মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে বন্ধ করে দেওয়া হয় বিশ্ববিদ্যালয়। জাতিসংঘসহ এনজিওতে কাজ করাও নিষিদ্ধ করা হয়। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক জরিপে উঠে আসে আরও ভয়াবহ তথ্য। আফগানিস্তানের অর্থনীতিতে নারীর শ্রমবিনিয়োগ ৪ দশমিক ৮ শতাংশ মাত্র। তালেবান সরকারের নানা ফতোয়ার অধীনে প্রায় ২ লাখ নারী চাইলেও কর্মক্ষেত্রে যুক্ত হতে পারছেন না। এ ২ লাখ নারীর মধ্যে এমন অনেকেই আছেন যাদের পুরো পরিবারে তিনিই একমাত্র আয়ক্ষম সদস্য। অনেক স্থানে নারীদের কিছুটা কাজ মেলে। কিন্তু পারিশ্রমিকটা ঠিকমতো পান না। যেটুকু পান, সেখানেও ভাগ দিতে হয় যিনি কাজ জুটিয়ে দিয়েছেন তাকে। ওয়ার্ক পারমিট পাওয়াটাই এখন স্বপ্নের টিকিট। তালেবানদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা জানিয়েছেন, সরকারি বা বেসরকারি কর্মক্ষেত্রে থাকা নারীদের বেতনের নির্দিষ্ট অংশ কর্তন করা হবে। নারীদের যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা কিংবা আনুষঙ্গিক যা-ই থাকুক না কেন, এ নীতি চালু হবেই। ফলে আফগান নারীদের মাসিক মাথাপিছু আয় এখন ৭০ মার্কিন ডলারে নেমে এসেছে।
আফগানিস্তান নারীদের জন্য নোমেন্স ল্যান্ড। শব্দটি হাস্যকর। মেন্স ল্যান্ডে উইমেনদের এমন অবস্থা শোচনীয়। আফগানিস্তানে অধিকাংশ পুরুষই নীতিগতভাবে রাজনৈতিক সংগঠনের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করতে গিয়ে নারী স্বাধীনতার বিষয়ে মাথা ঘামাচ্ছে না। ইউনিসেফ নানা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ফিলিস্তিন ও আফগানিস্তান-এ দুটি দেশেই নারীর শিক্ষার বিষয়ে সংস্থাটির কার্যক্রম সংকটের মধ্যে রয়েছে। আফগানিস্তানে নারীর স্বাধীনতাই নয়, তাদের ন্যূনতম অধিকারটুকুই নেই। এ সংকটের মুহূর্তে দিন গুজরানোর জন্য হলেও তাদের পালাতে হয়। কেউ ইরানে বা আরও রক্ষণপন্থি ভাগে। কারণ সেখানে অন্তত আফগানিস্তানের মতো কাজে অত কড়াকড়ি নেই।