জাহিদ খান
প্রকাশ : ০৭ জুলাই ২০২৪ ১৩:০২ পিএম
আপডেট : ০৭ জুলাই ২০২৪ ১৩:০২ পিএম
হলিউডে আফসারা আলভী ছবি: ফেসবুক থেকে
হলিউডে আফসারা আলভীর স্বপ্নযাত্রা হয় ২০১৯ সালে। হলিউডে ‘দ্য মাপেটস মেইহেম’, ‘গাইস গ্রোসারি গেমস’, ‘টুর্নামেন্ট অব দ্য চ্যাম্পিয়নস’ ও ‘স্টার ওয়ারস’-এর চরিত্র নিয়ে কাজ করেছেন তিনি। সম্প্রতি করেছেন ‘ব্যাড বয়েজ রাইড অর ডাই’-এর কাজ। বিস্তারিত লিখেছেন জাহিদ খান
হলিউডে আফসারা আলভীর স্বপ্নযাত্রা হয় ২০১৯ সালে। স্নাতক শেষ করেই শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ শুরু করেন সনির ‘ফাদারহুড’-এ। এর মধ্যে টিভি সিরিজ ‘ওবি-ওয়ান কেনোবি’তেও কাজ করেছেন। ‘দ্য মাপেটস মেইহেম’, ‘গাইস গ্রোসারি গেমস’, ‘টুর্নামেন্ট অব দ্য চ্যাম্পিয়নস’ ও ‘স্টার ওয়ারস’-এর চরিত্র নিয়ে কাজ করেছেন তিনি। এ ছাড়া ‘রিভেঞ্জ অব দ্য সি’তে কাজ করেছেন। ২০২৩ সালের মার্চ থেকে ‘ব্যাড বয়েজ রাইড অর ডাই’-এর কাজ শুরু হয়। শেষ হয় ২০২৪ সালের মে-তে এসে।

স্বপ্নযাত্রা যেভাবে
সিনেমায় কেমন করে এলেন আলভী আর হলিউডে গেলেনই বা কেমন করে- এমন প্রশ্নে আলভী বলেন, ছোটবেলায় পরিবার থেকেই সিনেমার প্রতি ভালোবাসা তৈরি হয়। মায়ের পাশে বসে দেখেছি সত্যজিৎ রায়ের ছবি। তারেক মাসুদের ‘রানওয়ে’। মা হলে নিয়ে দেখিয়েছিলেন ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’, ‘দুই দুয়ারী’র মতো সিনেমা। ছোটবেলায় যে ভালোবাসা তৈরি হয় সিনেমার প্রতি, সেই ভালোবাসার বিষয়টিই এখন পেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে আমার।
জন্ম ও বেড়ে ওঠা
আলভীর জন্ম খুলনায়। দাদুবাড়িতে। দাদা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। তাই দাদাকে দেখা হয়নি আলভীর। তবে বড্ড আদুরে ছিলেন দাদির। শৈশবের কথা মনে করিয়ে দিতেই আলভী বলেন, ‘বড্ড চঞ্চল ছিলাম শৈশবে। আমার দুষ্টুমির যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে যেতেন মা!’ তবে শৈশবের বড় একটা সময় কেটেছে যশোরে, নানাবাড়িতে। সেখানেও ছিল আলভীর দুরন্তপনা। একটু মাথা তোলা হতেই আলভীকে ভর্তি করানো হয় খুলনার এসওএস হারম্যান মেইনার স্কুলে।মাধ্যমিকে ভর্তি হন যশোর বিএএফ শাহীন স্কুল অ্যান্ড কলেজে। এখান থেকেই স্কুল ও কলেজের পাট চুকিয়ে মায়ের হাত ধরে ২০১৩ সালে পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। আলভীর বাবা মেসবাহুল হাসান। তিনি দেশেই ব্যবসা করেন। মা আফরিনা পারভীন অ্যানিমেল টেকনিশিয়ান। ২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বাংকার হিল কলেজে ভর্তি হন আলভী। কিছুদিন পর আবেদন করেন বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়, ইউম্যাস বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয় ও এমারসন কলেজে।
আগে ডাক আসে বোস্টন থেকে। সেখানে ভর্তি হন পছন্দের বিষয় মিডিয়া আর্টস প্রডাকশনে। এর মধ্যেই ডাক আসে এমারসন কলেজ থেকে। তাই ডাক পেয়ে বোস্টনের ভর্তি বাতিল করে ছুটে যান এমারসনে। ২০১৫ সালে প্রিয় এমারসন কলেজে ভর্তি হন পছন্দের বিষয় মিডিয়া আর্টস প্রডাকশনে।

স্বপ্নছোঁয়ার বছর
আলভীর তখনও স্নাতক শেষ হয়নি। ২০১৯ সালের কথা। এর মধ্যেই শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজের সুযোগ পেয়ে যান সনিতে। কিছুদিন পর স্নাতক শেষ হতেই প্রস্তাব পান ফাদারহুডে পোস্ট-প্রডাকশন অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করার। নিজের সবটুকু দিয়ে কাজ করতে থাকেন আলভী। কাজে তার সৃজনশীলতা, দক্ষতা এবং একাগ্রতা দেখে পরের বছর তাকে দেওয়া হয় আরও বড় সুযোগ। নিজের পছন্দের এবং বিশ্ববিখ্যাত চিত্রসম্পাদক পিয়েত্র স্কেলিয়ার সঙ্গে কাজ করতে দেওয়া হয় আলভীকে। এ পিয়েত্রের মায়াবী হাতে তৈরি হয় ‘জেএফকে’, ‘লিটল বুদ্ধা’, ‘গ্ল্যাডিয়েটর’, ‘আমেরিকান গ্যাংস্টার’, ‘দি অ্যামেজিং স্পাইডারম্যান’, ‘দ্য মার্শিয়ান’, ‘সলো : এ স্টার ওয়ারস স্টোরি’র মতো বিশ্ববিখ্যাত সব ছবি। নিজের প্রিয় চিত্রসম্পাদকের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে আলভী বলেন, ‘চোখের সামনে হেঁটে বেড়াচ্ছেন, কাজ করছেন বিশ্ববিখ্যাত চিত্রসম্পাদক পিয়েত্র স্কেলিয়ার-এর চেয়ে আনন্দের আর কিছুই হতে পারে না। তার সঙ্গে সনির স্পাইডারম্যান ইউনিভার্সের ছবিতে কাজ করছি; বলতে পারেন এটা আমার কাছে স্বপ্নের মতোই।’
ব্যাড বয়েজ রাইড অর ডাই
আলভী বলেন, আসলে এখানে এমন সব লোকের সঙ্গে কাজ করেছি, যা আমার কাছে অনেকটা স্বপ্নের মতো। আমি পুরো পোস্ট-প্রডাকশন টিমে কাজ করেছি। দুজন মূল এডিটর ছিলেন। তারা হচ্ছেন ড্যান লেবেন্টাল ও আসাফ ইসারবার্গ। আমরা পাঁচজন অ্যাসিস্ট করেছি। ড্যান লেবেন্টাল একজন লিজেন্ডারি এডিটর। তিনি ‘আয়রনম্যান’ থেকে ‘স্পাইডারম্যান’ এডিট করেছেন। ড্যান লেবেন্টালের সঙ্গে কাজ করেছি মানে তার কাজ দেখে শিখেছি আমরা। সপ্তাহের টানা সাত দিন কাজ করেছি সকাল থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত। একেকটি দৃশ্য নিয়ে অনেক পরীক্ষানিরীক্ষা করেছি। এজন্য যে, কীভাবে উপস্থাপন করলে দর্শক সেটি উপভোগ করবে। কীভাবে গল্পটি আরও ফুটিয়ে তোলা যায়।

কাজ করছেন সামাজিক ইস্যুতেও
আলভীর হাত ধরে প্রতিষ্ঠা হয়েছে ‘কান্ডারি’ নামে সামাজিক সংগঠন। যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী হলেও যখন সুযোগ হয় তখনই দেশের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর শিক্ষার মানোন্নয়নে কাজ করেন। ২০২১ সালে কান্ডারি দেলুটী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পাশাপাশি কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার ব্রহ্মপুত্রবেষ্টিত সাহেবের আলগা ইউনিয়নের দৈ-খাওয়ার চর নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে কাজ শুরু করে। সেখানে যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম ট্রলার। ব্রহ্মপুত্র পাড়ি দিয়ে সেখানে যেতে লাগে প্রায় দুই ঘণ্টা। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তবর্তী এ অঞ্চলে কাজ করা ছিল কান্ডারির ছেলেমেয়েদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ বিদ্যালয়টিও ২০২০ সালের বন্যা আর পাহাড়ি ঢলে বিলীন হয়ে যায়।
ব্রহ্মপুত্রবেষ্টিত ১২টি চরের একমাত্র নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়টির পুনরায় সব ধরনের ফার্নিচার, শিক্ষা উপকরণ ও ছাত্রছাত্রীদের নদী পার হয়ে স্কুলে যাওয়া-আসার জন্য একটি ট্রলার বানিয়ে দেয় কান্ডারি। এ জনপদে প্রথমবারের মতো ‘বিদ্যাপীঠ পাঠাগার’ নামে একটি পাঠাগার স্থাপন করে কান্ডারি। এ ছাড়া তুরস্ক-সিরিয়া সীমান্তে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ত্রাণ তৎপরতায় অংশ নেয় তারুণ্যদীপ্ত এ সংগঠনটি।
আগামীর স্বপ্ন
স্বপ্নের কথা জানতে চাইলে আলভী বলেন, ‘আগামীতে আরও বড় সিনেমায় কাজ করতে চাই এডিটর হিসেবে। আমার চাকরি যেমন দুটি, তেমন স্বপ্নও দুটি। চিত্রসম্পাদক হিসেবে কাজ করতে চাই মারবেলে। তাও স্পাইডারম্যানের ছবিতে। সেটা পাঁচ বছর পর হোক কিংবা ১০ বছর। কোস্টাল এরিয়ায় জলবায়ু পরিবর্তনের ওপর সাসটেইনেবল কিছু করতে চাই। দেশের পিছিয়ে পড়া মানুষ ও তরুণদের শিক্ষার উন্নয়নে কাজ করতে চাই। আমাদের শিক্ষার্থীদের নিয়ে একটি লার্নিং প্রোগ্রাম করতে চাই। কারণ তরুণরা বদলালেই বদলে যাবে সমাজ, বদলে যাবে দেশ।’