× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

চকলেটের সাতকাহন

আব্দুল্লাহ আল মামুন

প্রকাশ : ০৬ জুলাই ২০২৪ ১৬:১৩ পিএম

চকলেটের সাতকাহন

বিশ্বজুড়ে স্বাদের ভিন্নতায় মিষ্টি খাবারের তালিকায় জনপ্রিয়তার শীর্ষে রয়েছে চকলেট। বলা হয়, চকলেটের প্রতিদ্বন্দ্বী শুধুই চকলেট। আজকের যে কোমল চকলেট সেটিই একটা সময় ছিল তিতকুটে স্বাদযুক্ত। ব্যবহার হতো ঔষধি পানীয় হিসেবে। আগামীকাল ৭ জুলাই পালিত হবে বিশ্ব চকলেট দিবস। হাজার বছর প্রাচীন চকলেটের ইতিহাস নিয়ে রচনা…

আজকের জনপ্রিয় ‘চকলেট’ অতীতে ব্যবহার হতো সম্মানজনক পানীয় হিসেবে। এখন মিষ্টি স্বাদের চকলেট মুখে দিলেই যে শরীরে ও মনে ভিন্ন অনুভূতির দোলা দিয়ে যায়, সেটিই একসময় ছিল ভীষণ তিতকুটে স্বাদের। ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় নানাবিধ খাবারের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে চকলেটের ব্যবহার ও স্বাদেও এসেছে পরিবর্তন।

ইতিহাস বলছে, মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার প্রাচীন মায়া এবং অ্যাজটেক সভ্যতায় চকলেটের প্রথম ব্যবহার দেখা যায়। এ দুই সভ্যতার সংস্কৃতিতে চকলেটকে দেবতাদের পক্ষ থেকে পাঠানো উপহার হিসেবে গণ্য করার পাশাপাশি ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোয় এর ব্যবহার করা হতো।

কোকো গাছের ফল থেকে তৈরি হয় চকলেট। মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকায় জন্ম নেওয়া এ গাছে গুটি ফলগুলোর একেকটিতে ৪০টির মতো বীজ থাকে; যা শুকিয়ে এবং পুড়িয়ে বানানো হয় কোকো বিন। চকলেটের ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, মায়া ও অ্যাজটেক সভ্যতার মানুষ কোকো বীজ, পানি ও মসলা থেকে একটি তিতা ও ফেনাযুক্ত পানীয় তৈরি করেছিল। তারা বিশ্বাস করত, এ পানীয়র আছে নানা ক্ষমতা। এ ছাড়া তারা মনে করত, চকলেটের রয়েছে ঔষধি গুণাবলি। তারা ওই সময় এটি ব্যবহার করত জ্বর, কাশি, ডায়রিয়ার মতো রোগের চিকিৎসায়।

তবে চকলেটের ব্যবহার এবং আবিষ্কার নিয়ে ভিন্নমতও রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ সাল থেকে প্রাচীন ওলমেক সভ্যতার মানুষ কোকো ফল উৎসব-আয়োজনের বিশেষ পানীয় তৈরি করত। তারাই তাদের এ জ্ঞান মধ্য আমেরিকার মায়া সভ্যতায় ছড়িয়ে দিয়েছিল। মায়া সভ্যতার লিখিত ইতিহাসে উল্লেখ আছে, বিশেষ লেনদেন চূড়ান্ত করার অনুষ্ঠানে চকলেট পানীয় পরিবেশন করা হতো। এ ছাড়া অনেক মায়া পরিবারই প্রতি বেলায় চকলেটের স্বাদ নিত।

১৪২৮ সালে প্রতিষ্ঠিত অ্যাজটেক সভ্যতায় কোকো বিনকে সোনার চেয়ে দামি হিসেবে গণ্য করা হতো। তাদের কাছে এটি ছিল বিলাসী পণ্য। কথিত আছে, অ্যাজটেক শাসক দ্বিতীয় মন্টেজুমার শক্তিমান ও বীর্যবান হতে প্রতিদিন গ্যালন ভর্তি চকলেট পান করতেন। নিজের সামরিক বাহিনীর জন্যও কোকো বিন সংরক্ষণ করতেন তিনি।

তবে এটা অবশ্যই বলা যায়, বিশ্বজুড়ে সমাদৃত আজকের চকলেট মধ্য আমেরিকা থেকেই ইউরোপ হয়ে দুনিয়াব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। তবে ইউরোপে চকলেটের আবির্ভাব কখন ঘটেছে, এ নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। কিন্তু তারা সবাই একবাক্যে স্বীকার করেন, ইউরোপে প্রথম চকলেট পাওয়া যায় স্পেনে। কেউ কেউ মনে করেন, ১৫০২ সাল নাগাদ আমেরিকা পাড়ি দেওয়ার সময় কোকো বিন আবিষ্কার করেন ক্রিস্টোফার কলম্বাস। তিনিই স্পেনে নিয়ে এসেছিলেন চকলেট। আবার কোনো কোনো ইতিহাসবিদ বলেন, মন্টেজুমারের শাসনামলে স্প্যানিশ বীর হারনান কার্টেজ এ চকলেটের খোঁজ পেয়েছিলেন। তিনিই নিজ দেশে এটি নিয়ে আসেন প্রথম। আবার কারও ভাষ্য, স্পেনের রাজা দ্বিতীয় ফিলিপ ১৫৪৪ সালে গুয়াতেমালার মায়া ভিক্ষুদের কাছ থেকে কোকো বিন উপহার পেয়েছিলেন। তবে ইউরোপ তথা স্পেনে চকলেট যেভাবেই আসুক না কেন, ১৫ শতকের শেষের দিকে স্প্যানিশ রাজদরবারে এটি বেশ সমাদৃত ছিল। এ ছাড়া ১৫৮৫ সাল নাগাদ স্পেন চকলেট আমদানি শুরু করে।

পাশাপাশি ইউরোপের অন্যান্য দেশের অভিযাত্রীরাও মধ্য আমেরিকায় ভ্রমণে গেলে সেখান থেকে চকলেট নিজ দেশে নিয়ে আসেন। আর এভাবেই মূলত ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে চকলেটের দারুণ সুখ্যাতি। তবে মায়া কিংবা অ্যাজটেকের চকলেট পানীয় তৈরির রেসিপিতে ইউরোপীয়রা আটকে যায়নি। তারা আখের রস, দারুচিনির পাশাপাশি নিজেদের পছন্দসই অন্যান্য উপাদান মিশিয়ে চকলেট বানাতে শুরু করেন। ফলে কোকোর চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় এটির চাষাবাদ ও চকলেট উৎপাদনে ব্যবহার করা হতো ক্রীতদাসদের। চকলেটের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকায় ইউরোপের বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ দেশ ও শহরগুলোয় চকলেটের দোকান গড়ে উঠতে থাকে। 

ইউরোপে চকলেট যখন তুমুল জনপ্রিয় তখনও আমেরিকায় এটি পৌঁছায়নি। আমেরিকায় প্রথম চকলেটের আগমন ঘটে ১৬৪১ সালে। একটি স্প্যানিশ জাহাজে করে ফ্লোরিডায় প্রথম চকলেটের আগমন ঘটে। ফুড হিস্ট্রিয়ানরা মনে করেন, ১৬৮২ সালে প্রথম বোস্টন শহরে আমেরিকান চকলেট হাউস চালু হয়। ১৭৭৫ থেকে ১৭৮৩ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশের হাত থেকে আমেরিকার স্বাধীনতাযুদ্ধ তথা আমেরিকান বিপ্লবের সময়ে সেনাবাহিনীর রেশন তালিকায় যুক্ত হয় চকলেট। আবার সৈনিকদের বেতন হিসেবেও চকলেট দেওয়ার প্রচলন ছিল। এ ছাড়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ও সৈনিকদের রেশন হিসেবে চকলেট দেওয়া হতো। 

১৮ শতকের শুরুর সময় পর্যন্ত ইউরোপ-আমেরিকায় এটি বিলাসদ্রব্য হিসেবেই পরিগণিত হতো। পকেট ভরা টাকা যাদের ছিল, তারাই শুধু নিতে পারত এর স্বাদ। কিন্তু ১৮২৮ সালে ডাচ্‌ রসায়নবিদ কোয়েনরাড জোহানেস ভ্যান হাউটেন লবণের ক্ষারের সঙ্গে কোকো বিন মিশিয়ে এক ধরনের পাউডার চকলেট উদ্ভাবন করেন, যেটি সহজেই পানিতে মিশিয়ে পান করা যেত। যা ‘ডাচ্‌ প্রসেসিং’ নামে জনপ্রিয়তা পায়। ধারণা করা হয়, কোকো প্রেসেরও উদ্ভাবন করেছিলেন ভ্যান হাউটেন; যদিও কেউ কেউ মনে করেন সেই যন্ত্রের উদ্ভাবক আসলে ভ্যানের বাবা। কোকো প্রেসের মাধ্যমে রোস্টেড কোকো বিনগুলো থেকে কোকো বাটার আলাদা করা হতো। ফলে কোকো পাউডার বানানো সহজ হয়ে ওঠে। এভাবে নানা স্বাদের, নানা ধরনের চকলেট তৈরি হতে থাকে। এ দুই প্রক্রিয়া চকলেটকে সাধারণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নিয়ে আসে; যার মাধ্যমে চকলেটের উৎপাদনও বেড়ে যায় বহুগুণ।

ঊনবিংশ শতকের অধিংকাশ সময়জুড়ে পানীয় হিসেবেই ব্যবহার ছিল চকলেটের। ১৮৪৭ সালে ব্রিটিশ চকলেট কোম্পানি জে এস ফ্রাই অ্যান্ড সনস প্রথমবার চিনি, তরল চকলেট ও কোকো বাটার মিশিয়ে চকলেট বার উৎপাদন করে। এর কয়েক বছর পর ১৮৭৬ সালে সুইস চকলেট ব্যবসায়ী ড্যানিয়েল পিটার প্রথম চকলেটের সঙ্গে দুধের গুঁড়া মিশিয়ে মিল্ক চকলেট উৎপাদন করেন। এর কয়েক বছর পরই বন্ধু হেনরি নেস্‌লের সঙ্গে তিনি নেস্‌লে কোম্পানি গড়ে তোলেন এবং মিল্ক চকলেটকে বড় পরিসরে বাজারে ছড়িয়ে দেন। ঊনবিংশ শতক ধরেই বাজারে চকলেট বেশ দাপট দেখালেও তখনও সেটি ছিল শক্ত, চুষে খাওয়ার অনুপযুক্ত। ১৮৭৯ সালে আরেক সুইস চকলেট ব্যবসায়ী রুডল্‌ফ লিন্ড এমন এক মেশিন উদ্ভাবন করেন, যেটি এমনভাবে মিশ্রণ ঘটাতে সক্ষম, যার ফলে চকলেট হয়ে ওঠে মসৃণ ও কোমল।

পৃথিবীজুড়ে চকলেটের ব্যাপক জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও এর মূল উপাদান কোকো বিনের উৎপাদন মধ্য এবং দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা ও এশিয়ার গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলগুলোর মাঝেই সীমাবদ্ধ। কারণ এ অঞ্চলগুলোতেই সবচেয়ে বেশি কোকো গাছ জন্মায়। তবে সবার প্রিয় চকলেট নিয়ে আছে বিতর্কও। বলা হয়, কোকো চাষে শিশুশ্রমের ব্যবহার হয় সবচেয়ে বেশি। সেই সঙ্গে পরিবেশের ওপর কোকো উৎপাদনের প্রভাব নিয়েও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পরিবেশ সংরক্ষণ বিষয়ক সংস্থাগুলোও নিজেদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছে।

এসবের পরও বিশ্বজুড়ে খাবারের তালিকায় জনপ্রিয়তার শীর্ষে চকলেটের কোনো শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী যে তৈরি হয়নি, তা বলাই বাহুল্য।


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা