প্রান্তিক উদ্যোগ
রাজু আহমেদ
প্রকাশ : ২৬ জুন ২০২৪ ১২:৫৪ পিএম
শত বাধা পেরিয়ে সফল তরুণ উদ্যোক্তা পরিনা
রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বানেশ্বর হাটে আমের বাজারে ছুটে বেড়াচ্ছেন কর্মস্পৃহায় ভরপুর চঞ্চল এক নারী; চোখে খয়েরি সানগ্লাস, মুখ ভর্তি হাসি। দেখে বোঝার উপায় নেই জন্মের পর থেকেই এ নারীকে বেঁচে থাকতে ও পথ চলতে পদে পদে কতটা সংগ্রাম করে এগিয়ে যেতে হচ্ছে। বলছি পরিনার কথা।
শৈশবে পরিনাকে কুড়িয়ে পান তার পোষ্য বাবা আবদুল ওহাব। গা ভর্তি পাঁচড়া, বাঁচার যেন কোনো আশাই ছিল না। রাস্তায় কুড়িয়ে পাওয়া ওই শিশুকে আগলে ধরে নিজেদের বাঁচার স্বপ্ন বুনতে থাকেন ওই নিঃসন্তান দম্পতি। সেই পরিনাই অন্ধের লাঠি হয়ে ওঠেন ওই নিঃসন্তান দম্পতির। শৈশবে পরিনা যখন স্কুলে সমবয়সিদের সঙ্গে সময় কাটাত, সবাই ‘কুড়িয়ে পাওয়া মেয়ে’ বলে তিরস্কার করত। বাবার ঘরে নুন আনতে পান্তা ফুরায়। একদিকে দারিদ্র্য, অন্যদিকে সামাজিক বঞ্চনাÑএভাবেই বন্ধুহীন জীবনে শৈশবের না-পাওয়াগুলো সঙ্গী করে বেড়ে উঠতে থাকেন পরিনা।
২০০৭ সালে পরিনা এসএসসি পরীক্ষা দেন। বার্ধক্যের কারণে তার পোষ্য বাবা কাজ ছাড়তে বাধ্য হন। পরিনাও লেখাপড়া ছেড়ে বেছে নেন গার্মেন্টস পেশা। তবে ঢাকায় গিয়ে পরিনা প্রতারণার শিকার হন। ফিরে আসেন রাজশাহী। চাকরি নেন নাটোরে একটি ফুড প্রসেসিং কোম্পানিতে। এ চাকরি করতে করতেই উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। এরপর ডিগ্রি পাস করেন।
এর মাঝে করোনা মহামারিতে চাকরি হারান পরিনা। তবে দমে যাওয়ার মেয়ে নন তিনি। চাকরি হারিয়ে আশ্রয় নেন এক বান্ধবীর বাড়িতে। দুজন মিলে ঠিক করেন এবার নিজেদেরই কিছু করতে হবে। ওই সময়টায় দেশে অনলাইনে প্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রি ও চাহিদা বৃদ্ধি পায়। সে সুযোগে পরিনা শুরু করেন অনলাইনে রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী আম, গুড়, ঘি এবং সিল্ক শাড়ির ব্যবসা। তার সরবরাহকৃত পণ্যের মধ্যে আম ও গুড় জনপ্রিয়। এখন দেশজুড়ে রয়েছে তার হাজারো ক্রেতা।
পরিনা বলেন, প্রথম দিকে প্রতিবন্ধকতা আসে, এসবের প্রতিবাদ করায় এখন কুনজর দিতে ভয় পায়। এলাকার সবাই আমাকে এক নামে চেনে। আর এ চেনাটা আমার জীবনসংগ্রামের কারণে।
বছরে দুটি সময় পরিনা দারুণ ব্যস্ত থাকেন। আম ও গুড়ের এ সময় ছয় মাস। পরিনা দুর্বিষহ সময় পার করে এখন ভালো আছেন। চালু রেখেছেন সাহিত্যচর্চা। রয়েছে নিজের লেখা বই।
পরিনা জানান, জীবনে যখন তিনি প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছেন ঠিক তখনই তাকে আশ্রয় দেওয়া সেই বাবা ক্যানসারে মারা যান। মাকে জয়পুরহাটে একটুকরো জমিতে বাড়ি করে দিয়েছেন সরকারি সহায়তায়। এখন পরিনার পরিকল্পনা সমাজসেবায় নিজেকে নিয়োজিত করা। সমাজের অসহায় বৃদ্ধদের নিয়ে একটি বৃদ্ধাশ্রম করার পরিকল্পনা রয়েছে তার। কাজও অনেকটা গুছিয়ে এনেছেন। জমির দামের কারণে রাজশাহীতে না কিনে জয়পুরহাটে কিনেছেন ৫ শতক। আরও ৩ শতক কেনার প্রক্রিয়া চলছে। অবশ্য এটাকে বৃদ্ধাশ্রম না বলে তিনি এর নাম দিয়েছেন ‘পিএস আনন্দ আশ্রম’। এ কাজে সফল হলে জীবনের বাকিটা সময় আনন্দ আশ্রমেই কাটাতে চান পরিনা।
লেখক : প্রতিবেদক, রাজশাহী অফিস