প্রন্তিক উদ্যোগ
শাহ্ আলম শাহী
প্রকাশ : ২৬ জুন ২০২৪ ১২:৩৭ পিএম
আপডেট : ২৬ জুন ২০২৪ ১২:৪৬ পিএম
নিজ চেষ্টায় সফল নারী উদ্যোক্তা সাকেরা তুহিন আহসান
হঠাৎ মৃত্যুতে শোকাবহ জীবন আর নিঃসঙ্গতায় একা পথচলা শুরু করেন তিনি। থেমে যাননি, বরং এগিয়েছেন অনেক দূর। নিজ চেষ্টায় হয়েছেন সফল নারী উদ্যোক্তা। দেশীয় পাবদা মাছ চাষ করে পেয়েছেন সাফল্য। বলছি সাকেরা তুহিন আহসানের কথা। যার দেখানো পথ ধরে এলাকায় অনেকেই এখন স্বাবলম্বী।
১১ বছর আগে স্বামী আহসান সিদ্দিক মারা যান। স্বামীর মৃত্যুতে সন্তান আর সংসার নিয়ে বিপাকে পড়েন সাকেরা। শোকাবহ জীবন আর নিঃসঙ্গতা তাকে ভাবিয়ে তোলে। কিছু একটা করতে হবে। পথ চলতে হবে। উদ্যোগ নেন মাছ চাষের। স্বামীর রেখে যাওয়া ১৬ একর আয়তনের সাতটি পুকুরের মধ্যে দুটি পুকুরে মাছ চাষ শুরু করেন। লাভের মুখ দেখে বাকি পাঁচটি পুকুর সংস্কার করেন। সেই পুকুরগুলোতেও শুরু করেন মাছ চাষ।
দিনাজপুর জেলার পার্বতীপুর উপজেলার ৬ নম্বর মোমিনপুর ইউনিয়নের ভবেরবাজার ইন্দ্রপুর গ্রামে ছোটবড় মিলিয়ে মোট সাতটি পুকুর রয়েছে মৎস্য উদ্যোক্তা খাামারি সাকেরা তুহিন আহসানের। ছোট পুকুরগুলোতে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের চাষ করলেও এক বছর ধরে বড় তিনটি পুকুরে চাষ করছেন দেশীয় পাবদা। এতে স্বল্প খরচে হয়েছেন লাভবান। তার সফলতায় অনুপ্রাণিত হয়ে অনেকেই ঝুঁকছেন এই পাবদা মাছ চাষে।
মাছ চাষ করে রাজধানী ঢাকার মিরপুরে জমি ক্রয় করে পাঁচতলা বাড়ি করেছেন। দুবার হজ পালন করেছেন। অত্যন্ত ধর্মভীরু সাকেরা গ্রামকেই ভালোবাসেন। প্রকৃতিকে জড়িয়ে রাখেন। তাই ছেলেমেয়ে ঢাকায় থাকলেও তিনি থাকেন গ্রামে। প্রকৃতি তার ভালো লাগে। তার বাড়ির আশপাশ প্রকৃতির অপরূপে সাজিয়েছেন। পুকুরের ধারে তালগাছ, সুপারিগাছ লাগিয়েছেন। আম-লিচুর বাগান গড়েছেন। প্রতি বছর দুই থেকে তিন লাখ টাকার আম-লিচু বিক্রি করেন। এভাবেই পথ চলছেন উদ্যমী নারী সাকেরা।
সাকেরা আহসান বলেন, ‘প্রায় ১০ বছর ধরে চাষ করছি মাছ। বিভিন্ন প্রজাতির মাছ চাষ করলেও এই প্রথম চাষ করছি পাবদা মাছ। এই মাছ চাষে খরচ ও শ্রম কম। তবে লাভ বেশি। মাছ বিক্রেতা পুকুরে এসেই মাছ ক্রয় করে নিয়ে যান। কিছু টাকা বাকি রাখলেও আবারও মাছ নিতে এলে সেই টাকা দিয়ে দেন পরের দফায়।’
মাছ ক্রয় করতে আসা নিখিল চন্দ্র বলেন, ‘পুকুরের পাবদার চাহিদা বেশি। এর স্বাদ বেশি হওয়ায় ক্রেতারা দাম বেশি হলেও নিয়ে যায়। ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী এই মাছ বিক্রি করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি।’
এ মাছ চাষ করে স্বাবলম্বী হয়েছেন সাকেরা। তার সফলতায় অনুপ্রাণিত হয়ে অনেকেই ঝুঁকেছেন পাবদা মাছ চাষে। এলাকার কামরুল ইসলাম জানান, তিনিও সাকেরার সাফল্য দেখে তার দুটি পুকুরে দেশীয় পাবদা মাছ চাষ করছেন। ইতোমধ্যে দুবার মাছ উত্তোলন করেছেন। এখনও অনেক পাবদা পুকুরে আছে। যা বিক্রি করেছেন এবং এখনও পুকুরে যা অবশিষ্ট আছে, তাতে লাভ ভালোই হবে বলে মনে করছেন তিনি।
দিনাজপুর শহর থেকে সাকেরার খামার দেখতে আসা নুর আলম বলেন, ‘আমি লোকমুখে শুনে এই পুকুরে পাবদা মাছ চাষ দেখতে এসেছি। দেখে খুবই ভালো লাগল। অত্যাধুনিক পদ্ধতিতে কীভাবে পুকুরে দেশীয় পাবদা মাছ চাষ করা যায় তা সরেজমিনে এসে দেখলাম। আমিও আমার একটি পুকুরে পাবদা মাছ চাষ করব।’
সাকেরা আহসানকে প্রথম থেকেই সহায়তা করে আসছেন মৎস্য বিভাগের পাশাপাশি গ্রাম বিকাশ কেন্দ্র-জিবিকে এবং পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন।
গ্রাম বিকাশ কেন্দ্রের মৎস্য কর্মকর্তা জাহেদুল ইসলাম বলেন, ‘দেশীয় পাবদা বেশ সুস্বাদু। বাজারে এই মাছের চাহিদাও ভালো। পাবদা চাষে খামারিদের বাড়তি ঝামেলা পোহাতে হয় না। দিনাজপুরের পার্বতীপুরে অর্ধশতাধিক পুকুরে পাবদা মাছের চাষ হচ্ছে। আগামীতে চাষের পরিধি বাড়বে। পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন সহায়তায় পাবদা চাষে খামারিদের সহায়তা ও পরামর্শ দিয়ে আসছি।’
সফল নারী উদ্যোক্তা সাকেরা তুহিন আহসানের সাফল্য এখন অনেকের অনুপ্রেরণা। তার সাফল্য দেখে এলাকায় অনেকে মৎস্য চাষে ঝুঁকেছেন। কেউ কেউ বাজিমাত করেছেন দেশীয় পাবদা মাছ চাষ করে।
লেখক : প্রতিবেদক, দিনাজপুর