× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

২৬ হাজার ফুট উচ্চতায় ‘অক্সিজেন ছাড়া ২২ ঘণ্টা’

হাবিব ওয়াহিদ

প্রকাশ : ২৪ জুন ২০২৪ ০৯:৫৪ এএম

আপডেট : ২৪ জুন ২০২৪ ১২:৫৭ পিএম

পিয়ালি বসাক পেশায় শিক্ষকতা হলেও নেশায় পুরোদস্তুর পাহাড়ি। ‘পাহাড় প্রেম’ যার সমস্ত কল্পনাজুড়ে । পাহাড়ই তার ধ্যান-জ্ঞান। ছবি : পিয়ালি বসাকের সৌজন্যে

পিয়ালি বসাক পেশায় শিক্ষকতা হলেও নেশায় পুরোদস্তুর পাহাড়ি। ‘পাহাড় প্রেম’ যার সমস্ত কল্পনাজুড়ে । পাহাড়ই তার ধ্যান-জ্ঞান। ছবি : পিয়ালি বসাকের সৌজন্যে

বিশ্বের শীর্ষ ৬টি পর্বতশৃঙ্গে পা রেখেছেন কলকাতার পিয়ালি বসাক। মাকালু অভিযানে রয়েছে রোমহর্ষক ঘটনা। অতিরিক্ত বা সাপ্লিমেন্টারি অক্সিজেন ছাড়াই ২৬ হাজার ফুট উচ্চতায় তার থাকতে হয়েছে ২২ ঘণ্টা। সেই রোমাঞ্চকর ও ভয়ংকর অভিজ্ঞতা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানিয়েছেন তিনি। লিখেছেন হাবিব ওয়াহিদ

ছোটবেলা থেকেই তার স্বপ্নে আসতেন তেনজিং নোরগে, এডমন্ড হিলারিরা। স্কুলে পড়ার সময় এভারেস্ট জয়ের এক গল্প পড়ার পর থেকেই মনে জেগেছিল বাসনা। যেখানে তেনজিং নোরগে, এডমন্ড হিলারিরা পা রেখেছিলেন সেই শৃঙ্গে পা রাখবেন তিনিও। সেই বাসনা পূরণের জন্য ছোট থেকেই নিজেকে তৈরি করেছিলেন তিনি। আর্থিক সমস্যা, সামাজিক বাধা- কোনো প্রতিকূলতাই তাকে আটকে রাখতে পারেনি।
২৬ হাজার ফুট উচ্চতায় অক্সিজেন ছাড়া ২২ ঘণ্টা থাকার পর যখন পিয়ালি বসাককে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
দরিদ্রতা ও অন্যান্য প্রতিবন্ধতাকে ছাপিয়ে পৌঁছেছেন এভারেস্ট চূড়ায়। শৈশব থেকেই পাহাড়ের প্রতি যার ছিল অসম্ভব টান। ট্রেনের শৌচালয়ের পাশে কাগজ বিছিয়ে শুরু হয়েছিল এভারেস্ট জয়ের সফর। তুষার ঝড়ও তার স্বপ্নপূরণে বাধা হয়ে উঠতে পারেনি। স্নো ব্লাইন্ডনেস, ক্লান্তিও হার মেনেছিল পিয়ালির ইচ্ছাশক্তির কাছে। যত বাধাই আসুক, পর্বতারোহণ না ছাড়ার শপথ নিয়েছেন পিয়ালি।

অক্সিজেন ছাড়া তুষার ঝড়ে আটকে থাকার দুঃসহ অভিজ্ঞতা গা শিওরে ওঠার মতো। সেই গল্পই শোনাচ্ছেন আমাদের।
মাকালু বেসক্যাম্পে পৌঁছানো বেশ কঠিন। অন্যান্য চূড়ার বেসক্যাম্পে অনেকে শখের বসে গেলেও এখানে কেউ যায় না। তার কারণ বেশ দুর্গম ও বিপজ্জনক। মাকালু অভিযানে সাত দিন ট্র্যাকিং করে বেসক্যাম্পে পৌঁছলাম। এরপর ক্লাইম্বিং শুরু। ক্যাম্প ১, ২ ও ৩ সামিট করলাম। ক্যাম্প ৪ অন্যান্য টিম লাগিয়েছিল। কিন্তু আমরা ক্যাম্প ৩ থেকে মাকালু চূড়ার উদ্দেশে রওনা দিলাম। ১৬ মে ২০২৩ সন্ধ্যাবেলা বেরিয়ে সারা রাত আরোহণ করলাম। অক্সিজেন ছাড়াই আমি যাচ্ছিলাম। ওয়েদার ফোরকাস্টের ওয়েদার সঙ্গে মিলছে না, গ্লোবাল ওয়ার্মিয়ের কারণে। ২০ কিলোমিটার বেগে হাওয়া থাকার কথা থাকলে হাওয়া চলছে ৭০-৮০ কিলোমিটার বেগে। অক্সিজেন ছাড়া এই আবহাওয়ায় সারা রাত ট্র্যাকিং করেছি। বাতাসের বেগ প্রায় ১০০ কিলোমিটার থাকার কারণে চূড়ার কাছাকাছি গিয়ে অক্সিজেন নিয়েছি। তুষার ঝড়ের বেগ ক্রমশ বাড়ছেই। পরিশেষে পৌঁছলাম মাকালু চূড়ায়। আমরা চারজন ছিলাম। একটা দড়ি কোমরে বেঁধে নামছি।


বরফের কারণে ফাটল বোঝা যাচ্ছে না, তাই এভাবে নামার পরিকল্পনা করলাম। একজন বিদেশি পর্বতারোহী ফাটলে পড়ে আছে। সে ঝুলছে। জুতা থেকে ক্রাম্পন খুলে গেছে। আমাদের আগে সাতজনের একটা টিম যাচ্ছিল তারাও তাকে তোলেনি। ওখানে সাধারণত কেউ কাউকে সাহায্য করতে চান না। তুলতে গেলে অনেক সময় কেটে যাবে এবং অক্সিজেন ফুরিয়ে যাওয়ার একটা শঙ্কা থাকে। কারণ সবারই তো প্রাণের ভয় আছে। মানবিক কারণে তাকে টেনে তুললাম। কেন জানি বিবেক সায় দিচ্ছিল না এই অবস্থায় উনাকে রেখে যেতে। উনাকে তুলতে তুলতে আমাদের পাঁচ ঘণ্টা চলে গেল। এর মধ্যে আমাদের অক্সিজেন ফুরিয়ে গেছে। সময় সন্ধ্যা ৭টা। আমার চোখে ‘স্নো ব্লাইল্ডনেস’ তুষার অন্ধত্ব। চোখে না দেখার কারণে শেরপাদের সঙ্গে যেতে পারছি না। ধরে ধরে নিয়ে যাওয়ার জন্য শেরপাদের বললাম কিন্তু তারা নিলেন না। শেরপাদেরও অক্সিজেন শেষ হয়ে গিয়েছিল। তারা খুব ভয় পাচ্ছিল। ক্যাম্প ৩ পৌঁছাতে এখনও বেশ সময় লাগবে। এত লম্বা পথ তারা আমাকে ধরে ধরে নিয়ে যেতে অস্বীকৃতি জানাল। আমাকে ওখানে রেখে তারা চলে গেল।


৮ হাজার মিটার উচ্চতায় খোলা আকাশের নিচে বরফের দেয়ালে আমি একা। তার মধ্যে তুষার ঝড়। শেরপাদের অনুরোধ করলাম একটা ওয়াকিটকি দিয়ে যাওয়ার জন্য, কিন্তু তারা দিল না। তারা হয়তো ভেবেছে যদি তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিই। বরফের দেয়ালে পায়ের টো ক্রাম্পনের ফ্রন্ট পয়েন্ট দিয়ে গেঁথে বরফের মুখোমুখি হাফ বসা। কোনো রকমে নড়াচড়াও করছিলাম না, কারণ ক্রাম্পন খুলে যদি বরফ থেকে বেরিয়ে আসে তাহলে স্লিপ খেয়ে ফাটলে পড়ে যাব। চারপাশে ফাটলে ভরা। এভাবে ২২ ঘণ্টা। সকালেও শেরপারা আমাকে নিতে আসেনি। তারা ভেবেছিল আমি হয়তো বেঁচে নেই। আবহাওয়া অতিমাত্রায় খারাপ থাকার কারণে কেউ সামিটে যায়নি। সব টিম সামিট বাতিল করেছিল। একজন রাশিয়ান ও তার শেরপা গিয়েছিল। তারা যাওয়ার সময় ভেবেছিল শেরপারা হয়তো আমাকে পরে এসে উদ্ধার করে নিয়ে যাবে। ১৮ তারিখ রাশিয়ান পর্বতারোহী এবং তার শেরপা যখন সামিট করে ফিরেছিলেন তখন তারা দেখলেন আমি কথা বলছি, বেঁচে আছি। 
সব ঠিকঠাকিই ছিল শুধু চোখে দেখতে পাচ্ছিলাম না। চোখে দেখতে পেলে আমি একাই নেমে যেতে পারতাম। তারপর তারা স্যাটেলাইট ফোনে যোগাযোগ করল। আমি বেঁচে আছি, আমাকে এখনও কেউ উদ্ধার করতে আসেনি। তারপর উদ্ধারকারী শেরপারা এসে আমাকে ধরে ধরে ক্যাম্প ৩-এ আনলেন। এরপর বেসক্যাম্পে। চোখে না দেখেই শেরপাদের নির্দেশনায় বেসক্যাম্পে নেমে আসলাম। হেলিকপ্টারে বেসক্যাম্প থেকে লুকলা হয়ে কাঠমান্ডু পৌঁছেছি। হাসপাতালের ডাক্তার বলেছেন, ফ্রস্টবাইট তেমন গুরুতর নয়। কয়েক দিন পরই বাড়ি ফিরতে পারব।

দুর্বিষহ সেই রাতে সঙ্গী সৃষ্টিকর্তা। সৃষ্টিকর্তার অশেষ কৃপায় আর মানুষের ভালোবাসায় ফিরে আসা। শেরপারাও অবাক হয়েছিল। তাদের ভাষায় ‘মিরাকেল’।
ছয়টি আট হাজারি শৃঙ্গ ছোঁয়া হয়ে গেছে কলকাতার চন্দননগরের পিয়ালি বসাকের। ২০১৮ সালে মানাসুলু, ২০২১ সালে ধবলাগিরি, ২০২২ সালে এভারেস্ট ও লোৎসে জয়। তার পর ২০২৩-এর এপ্রিল ও মে মাসে অন্নপূর্ণা ও মাকালু জয় করেন অপরাজিতা পিয়ালি বসাক।
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা