বাসন্তি সাহা
প্রকাশ : ১২ জুন ২০২৪ ১০:২২ এএম
জেলা পর্যায়ে শিশুদের শ্রম হ্রাস পেলেও ঢাকা শহরে শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে নিয়োগ এখনও বন্ধ হয়নি। ছবি : সংগৃহীত
আজ ১২ জুন, বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘শিশুশ্রম বন্ধ করি, প্রতিশ্রুতি রক্ষা করি’। ২০০২ সাল থেকে দিবসটি পালন করছে ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন (আইএলও)। শিশুশ্রমের কারণে বাচ্চাদের দুর্দশার কথা তুলে ধরাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য। শিশুশ্রম নিরসনে বাংলাদেশ সরকারের আছে বিভিন্ন উদ্যোগ। তবুও আর্থ-সামাজিক ও পরিবেশগত প্রতিবন্ধকতার দরুন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শিশুদের অংশগ্রহণ কমছে না। এ বিষয়ে লিখেছেন বাসন্তি সাহা
একেকটা দুর্যোগ, মহামারি শিশুদের আরও বেশি নিঃস্ব করে দিয়ে যায়! অনেক শিশু মারা যায়। যারা বাবা-মাকে হারায়, অভিভাবকহীন হয়ে বেঁচে থাকে। বাধ্য হয়ে উপার্জনের পথ বেছে নিতে হয়। পেছনে পড়ে থাকে স্কুল, খেলার মাঠ, সকালবেলার ঘুম, তার পুরো শৈশব। সম্প্রতি দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড় রেমাল আঘাত হানে। এতে ৮৪ লাখের বেশি মানুষ স্বাস্থ্য, পুষ্টি, স্যানিটেশন ও নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকিতে পড়েছে, যার মধ্যে রয়েছে ৩২ লাখ শিশুও।
কোভিড-১৯-এ লকডাউনের কারণে বাবার টেইলারিং দোকানটি বন্ধ হয়ে যায়। ফলে স্কুলের সপ্তম শ্রেণির পাট চুকিয়ে কাজে যোগ দিতে হয় হাতিয়ার ওসখালীর হৃদয় দাসকে (১৪)। ছোট দুটি বোনকে নিয়ে সংসারে আর্থিক সহায়তার জন্য পেটেভাতে একটি ওয়েলডিং কারখানায় কাজে যুক্ত হতে হয়েছে তাকে। পড়াশোনায় আর ফেরা হয়নি।
সবশেষ বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর জাতীয় শিশুশ্রম সমীক্ষা ২০১৩ অনুসারে, দেশে ৩৪ লাখ ৫০ হাজার শিশু কর্মরত রয়েছে। এর মধ্যে সাড়ে ১৭ লাখ শিশুশ্রমের আওতায় পড়েছে। বাকি শিশুদের কাজ অনুমোদনযোগ্য। কর্মরত শিশুদের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত আছে ১২ লাখ ৮০ হাজার। আর ২ লাখ ৬০ হাজার শিশু অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করে। ইউনিসেফের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে ৩৪ লাখের বেশি শিশু বাবা-মা ছাড়া একা রাস্তায় বসবাস করে।
গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়া ট্রলারগুলোয় একটি-দুটি কম বয়সি ছেলে দরকার হয়; যারা পানি দেওয়া, জাল মেরামত করা, সুতা প্যাঁচানোর মতো কাজ করে। এ ছেলেগুলোর বয়স ১২ থেকে ১৬ বছর। পারিশ্রমিক দেওয়া হয় মাসে ১৫-২০ হাজার টাকার মতো। বাবা-মাকে অগ্রিম টাকা দিয়ে তাদের নিয়ে যাওয়া হয় ট্রলারগুলোয়। নগদ টাকা ও দারিদ্র্য এ শিশুদের শিক্ষা ও অন্য সব অধিকার থেকে বঞ্চিত করে।
হাতিয়ার ভাঙনপ্রবণ এলাকাগুলোর পরিবারগুলোকে দু-তিন বার থাকার জায়গা পরিবর্তন করতে হয়েছে। যখন ভিটেমাটি ভেসে যায় তখন পরিবারগুলো আশ্রয়ের জন্য অন্য জায়গায় যেতে হয়। ছেলেমেয়েদের বাসাবাড়ি অথবা লঞ্চঘাটে কুলির কাজের জন্য পাঠাতে হয়। নদীভাঙন, দারিদ্র্য এ শিশুদের সব রকম বিকাশের পথ রুদ্ধ করে কঠিন শ্রমের দিকে ঠেলে দেয়। কথাগুলো বলছিলেন হাতিয়ার সমাজকর্মী গোলাম কিবরিয়া স্বপন। নদীভাঙনপ্রবণ অঞ্চলগুলোর স্বাভাবিক চিত্র এগুলো।

উন্নয়ন সংস্থা কোস্ট ফাউন্ডেশন ভোলার চরফ্যাশনসহ উপকূলে ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে মানুষের জীবনজীবিকার ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে কাজ করছে। জলবায়ু পরিবর্তন শিশুদের কীভাবে বঞ্চিত করেÑসে প্রসঙ্গে কোস্ট ফাউন্ডেশনের উপনির্বাহী পরিচালক সনত কুমার ভৌমিক বলেন, শিশুরা জলবায়ুর নেতিবাচক প্রভাব দ্বারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নদীভাঙনের কারণে পরিবারগুলো মাইগ্রেশনে বাধ্য হয়। বাবা-মায়ের জীবনজীবিকা হুমকির মুখে পড়ায় বাধ্য হয়ে শিশুদের স্কুল ছাড়তে হয়, বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে যুক্ত হতে হয়। এ অবস্থায় জলবায়ুসংক্রান্ত যে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব রয়েছে, তা মোকাবিলায় এসব শিশুর সমস্যা আলাদাভাবে চিহ্নিত করে বাজেটে আলাদা বরাদ্দ রাখা জরুরি। কারণ বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে একটি। ২০২১ সালে ইউনিসেফের শিশুদের জলবায়ু ঝুঁকি সূচকে ১৬৩ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫তম।
নিঝুমদ্বীপে কাজ করেন দুলাল উদ্দিন। তিনি বলেন, নিঝুমদ্বীপের বেশিরভাগ শিশুই মাছের পোনা, মাছ ধরা ও ট্রলারে বাবুর্চির কাজ করে। এগুলোয় নগদ টাকা পাওয়া যায় বিধায় ছেলেরা একটু বড় হলেই বাবা-মা এসব কাজে দিয়ে দেন। শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি নিয়ে সরকারি কার্যক্রমের সুবিধা এ প্রান্তের শিশুরা পায় না। কিন্তু এসব শিশুদের সংখ্যা কম নয়। জাতীয় উন্নয়নে তাদেরও যুক্ত করতে হবে। এ ছাড়া দরিদ্র পরিবারের শিশুরা যাতে প্রয়োজনীয় পুষ্টি ও সেবার আওতায় আসতে পারে, সেদিক বিবেচনা করে উন্নয়ন কর্মসূচিগুলোর লক্ষ্যমাত্রা এবং তহবিল বরাদ্দ করা প্রয়োজন।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৪ সালে শিশুদের উন্নয়ন ও বিকাশে শিশু আইন প্রণয়ন ও প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করেন। তিনি সংবিধানে শিশু অধিকার সমুন্নত রাখেন। সরকার শিশুশ্রম নিরসনের লক্ষ্যে ‘জাতীয় শিশুশ্রম নিরসন নীতি-২০১০’ প্রণয়ন করেছে। এ ছাড়া শিশুদের উন্নয়ন ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ‘জাতীয় শিশুনীতি-২০১১’, ‘শিশু আইন-২০১৩’, ‘বাল্যবিবাহ বিরোধ আইন-২০১৭’ এবং গৃহকর্মে নিয়োজিত শিশুদের অধিকার ও সুরক্ষায় ‘গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতি-২০১৫’ প্রণয়ন করা হয়েছে।
যশোর জেলা শিশু বিষয়ক কর্মকর্তা সাধন দাশ বলেন, এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ২০২৫ সালের মধ্যে দেশকে শিশুশ্রম মুক্ত করতে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা ২০২১-২৫ প্রণয়ন করা হয়েছে। যা বাস্তবায়নে কাজ করছে জাতীয় শিশুশ্রম কল্যাণ পরিষদ। বাংলাদেশ জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ ও ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম বিষয়ক আইএলও কনভেনশন অনুসমর্থন করেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শিশুশ্রম সমীক্ষা-২০০৩ অনুযায়ী বাংলাদেশে শ্রমে নিয়োজিত শিশুর সংখ্যা ছিল প্রায় ৩২ লাখ। সরকারের সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে ২০২৩ সালে শিশুশ্রম সমীক্ষা অনুযায়ী শ্রমে নিয়োজিত শিশুর সংখ্যা হ্রাস পেয়ে ১৭ লাখে দাঁড়িয়েছে।

শিশুর ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম বন্ধ করতে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনে প্রতি জেলায় একটি শিশুশ্রম পরিবীক্ষণ কমিটি নামে স্থানীয় জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি রয়েছে, যেখানে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপমহাপরিচালকসহ নাগরিক সমাজের নেতৃবৃন্দ রয়েছেন। এ কমিটি প্রতি মাসে সভা করে জেলার শিশুদের শ্রম পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে। ফলে জেলা পর্যায়ে শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে নিয়োজিত হওয়া অনেকটাই কমে আসছে।
জেলা পর্যায়ে শিশুদের শ্রম হ্রাস পেলেও ঢাকা শহরে শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে নিয়োগ এখনও বন্ধ হয়নি। ঢাকা শহরের লেগুনা চালক ও হেল্পারের বেশিরভাগই শিশু। একমাত্র গার্মেন্ট সেক্টরে শিশুশ্রম প্রায় বন্ধ করা গেছে। এর কারণ হচ্ছে, বায়ারদের চাপ ও মালিকপক্ষের সচেতনতা। কিন্তু অন্যান্য কারখানায় শিশুরা এখনও ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে নিয়োজিত। যেমন ২০২২ সালে হাশেম ফুড ফ্যাক্টরিতে আগুন লাগার ঘটনায় দেখা গেল ৫৪ জন পুড়ে মারা গেছে। তাদের বেশিরভাগ শিশু। বলছিলেন গ্রুপ কিউএ’র কানিজ গার্মেন্টস লিমিটেডের মার্চেন্ডাইজিং ও মার্কেটিংয়ের সিনিয়র ব্যবস্থাপক বিপুল কুমার সাহা।
বাংলাদেশের সংবিধানে শিশুসহ সব নাগরিকের মৌলিক অধিকার স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১১, ১৪, ১৫, ১৬, ১৭, ১৮, ১৯, ২০ অর্থাৎ রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি অংশে শিশুদের জন্য বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষাসহ শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। মৌলিক অধিকার অংশের অনুচ্ছেদ ২৭, ২৮, ২৯, ৩১, ৩৪, ৩৭, ৩৮, ৩৯, ৪০, ৪১-এ মানুষ হিসেবে সব নাগরিকের মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। জবরদস্তিমূলক শ্রম পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
বাংলাদেশে নদীভাঙন, বন্যা, খরা, জলোচ্ছ্বাস ও ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটছে। এ দুর্যোগগুলো শিশুদের কায়িক শ্রমের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বাংলাদেশে ২০৪১ সালের মধ্যে শিশুশ্রম জিরোতে নিয়ে আসার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে বর্তমান সরকার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জন্য ৫ হাজার ২২২ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এ বরাদ্দ ছিল ৪ হাজার ৭৫৫ কোটি। কিন্তু বাজেটে বরাদ্দ রাখাই কেবল যথেষ্ট নয়, এর যথাযথ ব্যবহারও নিশ্চিত করতে হবে।