আকাশ ভূইয়া
প্রকাশ : ১০ জুন ২০২৪ ১০:০৪ এএম
দুর্গম পাহাড়ে লুকিয়ে থাকা মনোমুগ্ধকর আমিয়াখুম জলপ্রপাত। ছবি : লেখক
গহিন থেকে গহিনে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এক বান্দরবান জেলাতেই আছে অসংখ্য ভ্রমণস্থান। যেখানে অনেকের পা পড়েনি। নয়নাভিরাম স্থানগুলো সব সময় পাহাড় প্রেমীদের মুগ্ধতায় ভাসায়। এমনই এক অভিযানে সাকা হাফং ও তানজিংডং সামিট ছিল রোমাঞ্চকর এক অনুভূতি
রোমাঞ্চকর ও দুঃসাহসী অভিযান করতে ভালোবাসি। আমার ট্যুর সাধারণত পাহাড়কেন্দ্রিক। এক্সট্রিম লেভেলের ট্রেকিংগুলো করা হয়। বাংলাদেশের প্রায় অর্ধেক জেলা ঘুরলেও আমার চোখ আটকে গেছে বান্দরবানে। কথায় আছে, যে বান্দরবান দেখেনি, সে বাংলাদেশও দেখেনি।
গহিন থেকে গহিনে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এক বান্দরবান জেলাতেই আছে অসংখ্য ভ্রমণস্থান। যেখানে অনেকের পা পড়েনি। যত কষ্ট করে ওইসব জায়গায় পৌঁছেছি, স্বাদ নিয়েছি, স্পর্শ করেছি ততই যেন মুগ্ধ হয়েছি। নয়নাভিরাম স্থানগুলো সব সময় আমাকে মুগ্ধতায় ভাসায়।
আমাদের যাত্রা হয় আলীকদম থেকে। আমাদের যাওয়ার রুট ছিল- আলীকদম- একুশ কিলো- তিন্দুবাজার- সাঙ্গু নদ- রেমাক্রি- নাফাখুম পাড়ায় রাতযাপন- জিনাপাড়া- নিকোলাসপাড়া- দেবতা পাহাড়- আমিয়াখুম- ভেলাখুম- নাইক্ষংকমুখ- বুলোংপাড়ায় রাতযাপন- নেপিউ ঝিরি- জুমঘরে রাতযাপনÑসাকা হাফং সামিট- সিম্পত্ল্যাম্পি পাড়া- তাজিংডং সামিট- শেরকর পাড়ায় রাতযাপন- থানচি।
প্রথম দিন : যাত্রা হলো শুরু
বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকা থেকে বান্দরবানের বাসে রওনা। পরদিন শুক্রবার সকাল ৮টায় বান্দরবানের আলীকদম। নাশতা সেরে টিম লিডার জনি ভাইয়ের নেতৃত্বে আমরা ১১ জন চান্দের গাড়িতে সকাল ১০টার দিকে আলীকদম-থানচির একুশ কিলোতে পৌঁছাই। সাধারণত সবাই থানচি থেকে সেনাবাহিনীর এন্ট্রি করে রেমাক্রির দিকে যায়। কিন্তু আমাদের ছিল উল্টো। আমাদের গন্তব্য ছিল নিষিদ্ধ সাকা হাফং। আলীকদমÑথানচি রাস্তার একুশ কিলো থেকে আমাদের ট্যাকিং শুরু। ৩-৪ ঘণ্টা হাঁটার পর দুপুর ২টায় তিন্দুবাজারে পৌঁছাই।
তিন্দু হচ্ছে থানচির চারটি ইউনিয়নের একটি। এখানে মারমা, ম্রো, বম, খেয়াং, কুমি, ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের বসবাস চোখে পড়ল। তাদের অতিসাধারণ জীবন। দুপুরে খাওয়া শেষে আমরা লোকাল একটা নৌকা করে রেমাক্রির উদ্দেশে রওনা হই। জীবনে যাদের সাঙ্গু নদ ভ্রমণের সুযোগ হয়েছে, তারাই বলতে পারবেন এত রূপলাবণ্য অন্য কোথাও আছে কি না। রেমাক্রি যেতে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় লাগে আড়াই ঘণ্টা। বাজারের দক্ষিণ পাশে রেমাক্রি জলপ্রপাত।

রেমাক্রি ঝরনার পাশ দিয়েই হেঁটে যেতে হয় নাফাখুম জলপ্রপাতে। রেমাক্রি থেকে নাফাখুমের পথটা আরও দুর্গম। তবে পথ যত দুর্গম হচ্ছিল, ততই বাড়ছিল প্রকৃতির সৌন্দর্য। খাল পাড়ি দিতে দিতে চোখে পড়ল অসংখ্য জলপ্রপাত ও পাথর। পাহাড়ের মাঝে ঘন জঙ্গলের ফাঁক দিয়ে বয়ে চলেছে জলস্রোত। খালের পাড় দিয়ে হেঁটে চলার পথ। প্রায় ২ ঘণ্টা হাঁটার পর কানে এলো প্রবল জলপতনের শব্দ। গর্জনে কানে তালা লেগে যাচ্ছিল। হঠাৎই চোখের সামনে হাজির বিশাল পাথর ভেঙে গড়িয়ে পড়া উচ্ছল জলরাশি। এটাই নাফাখুম! সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ায় আমরা নাফাখুমের আসল সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারিনি। তাই সবাই রাত যাপন করি নাফাখুমপাড়ায়। প্রথম দিনের সমাপ্তি।
দ্বিতীয় দিন : গন্তব্য আমিয়াখুম হয়ে ভেলাখুম
সকালে ঘুম থেকে উঠে গরম খিচুড়ি খেয়ে নাফাখুমের ভয়ংকর সৌন্দর্য উপভোগ করি, রোমাঞ্চকর সে অনুভূতিটা বলে বোঝানোর মতো নয়। এবার গন্তব্য আমিয়াখুম জলপ্রপাত। আবারও ট্রেকিং শুরু। নাফাখুম পার হয়ে আমরা পৌঁছে গেলাম জিনাপাড়ায়। একটু বিশ্রাম করে পা চালালাম আমিয়াখুম দেখার উদ্দেশ্যে। জিনাপাড়া থেকে আমিয়াখুম যাওয়ার পথে কয়েকটি উঁচু পাহাড় ডিঙাতে হয়। আমিয়াখুম যাওয়ার রাস্তাটুকু আতঙ্কের, জীবনে কখনও এত খাড়া পাহাড়ি রাস্তা ধরে নামিনি। পুরো ৮৫ ডিগ্রি কোণে নামতে হচ্ছে প্রায় হাজার ফুটের পাহাড়! টানা ৪০-৫০ মিনিট থরথর করে কাঁপা পা নিয়ে পুরো খাড়া পাহাড় নেমে সমতলে এলাম।
অবশেষে ঝরনার রানী আমিয়াখুমের সৌন্দর্য প্রাণভরে উপভোগ করলাম। আমিয়াখুমের সৌন্দর্য বর্ণনা করা বেশ কঠিন। ক্ষণে ক্ষণে আপনাকে করবে মুগ্ধ। আমিয়াখুম থেকে এবার গন্তব্য ভেলাখুম। আমিয়াখুম থেকে ৫ মিনিট হাঁটা, এখানে বাঁশের ভেলায় উঠতে হয়। ভেলায় যেতে হয় একটু দূরে। ভেলাখুম ক্রস করে আমরা একটু সামনে দুপুরে লাঞ্চ শেষে ঝিরির পানিতে গোসল করে নিই। ২-৩ ঘণ্টা ট্রেকিং শেষে সন্ধ্যা নামার আগে বুলোংপাড়ায় পৌঁছাই। বুলোংপাড়া হচ্ছে একটি মুরুংপাড়া। রাতে জুম ভাত ও মুরগি দিয়ে পেট ভরে ভাত। আহা কী শান্তি। দ্বিতীয় দিনের সমাপ্তি।
তৃতীয় দিন : আনঅফিসিয়াল সর্বোচ্চ চূড়া সাকা হাফং
আমাদের রোমাঞ্চকর যাত্রা যেন আজ শুরু হলো।
খুব ভোরে উঠে সকাল ৬টায় জুমের চালের ভাত খেয়ে বেরিয়ে পড়ি। এ পাড়ার পাশেই আরেকটি পাড়া আছে, যেখানে বাঙালির যাওয়া নিষেধ। আমরা সকাল ৬টা ৩০-এ হাঁটা শুরু করি। পাড়া থেকে নামতে প্রায় ৩০ মিনিট লাগে। সবাই নিঃশব্দে হাঁটছি। কারণ যেন আরাকান বাহিনী অথবা আর্মি কোনো শব্দ না পায়। আমরা নেপিউ বন ও নেপিউ ঝিরি ধরে হাঁটতে থাকি। হঠাৎ দেখি দুটি লোক বন্দুক হাতে আমাদের দিকে আসে। আমরা কোনো কথা না বলে তার পাশ দিয়ে হেঁটে চলে যাই। হাঁটতে হাঁটতে ১২টা-১টার দিকে নেপিউপাড়া ও নেপিউ বিজিবি ক্যাম্পের কাছাকাছি চলে আসি। এ সময় জনি ভাই আমাদের রেখে প্রধান সড়কে উঠে বিজিবির টহল দেখে আবার নেপিউ ঝিরিতে নেমে আসেন। আমাদের বললেন, ‘এখন যাওয়া যাবে না।’ আমরা নেপিউ ঝিরিতে বসে খিচুড়ি রান্না করি। এখন অপেক্ষা কখন যাত্রা করা যায়। যেখানে রান্না করেছিলাম এটা বিজিবি ক্যাম্পের নিচেই ছিল। এ বনের মধ্যে রাত ৯টা পর্যন্ত বসে ছিলাম। কেউ কথা বললে ফিসফিস করে বলতে হচ্ছে। বনের মধ্যে কত ধরনের বিপদ থাকে। সাপ, জোঁক, ভল্লুক আরও কত কী থাকতে পারে। এসব তখন আমাদের মাথায় ছিল না। মাথায় একটাই পরিকল্পনাÑসাকা কীভাবে সামিট করা যায়। যা হোক, ভয়-উৎকণ্ঠা নিয়ে আমরা যাত্রা করি। যখন রাস্তায় উঠি, বিজিবি ক্যাম্পের সামনে দিয়ে যাবও তখনও দোকান খোলা। দোকানের পেছন দিয়ে একটা ঝিরিপথ খুঁজে নিই। আমরা নেপিউপাড়ার পেছন দিয়ে সবাই দ্রুতগতিতে হাঁটতে থাকি। হঠাৎ কুকুর ডাক দেওয়া শুরু করল। আমরা মনে করলাম এই বুঝি ধরা পড়েছি। যা হোক, ৩০-৪০ মিনিট একটা পাহাড়ে ওঠার পর একটি জুমঘরে আশ্রয় নিই। ওই জুমঘরে আমরা পৌঁছাই রাত ১১টা ৩০-এ। এখানে আমরা বিশ্রাম নিই। এখানে আমাদের তৃতীয় দিনের সমাপ্তি।

চতুর্থ দিন : সাকা হাফং সামিট
রাত ৩টায় ঘুম থেকে উঠতে হলো। সঙ্গে কিছু খেজুর, বাদাম আর পানি নিয়ে যাত্রা হলো। জুমঘরে আমাদের ব্যাগগুলো রেখে যাই। সাকা হাফংয়ে ওঠার সময় কী পরিমাণ বাঁশ সরিয়ে এগোতে হয় যারা যায় তারা জানে। ৫০ মিনিট পাহাড় ট্র্যাক করার পর এখন বিশ্রামের সময়। আগেই জেনেছি এ এলাকায় বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের ব্যপারে। তাই একরকম ভীত হয়েই এগোচ্ছিলাম। রাতের নির্ঘুম ট্রেকিংয়ে টর্চের আলো ফেলতে হচ্ছিল হিসাব করে। হাঁটতে হচ্ছিল যথাসম্ভব নিঃশব্দে, কথা বলা ছিল একদম বারণ। এই বুঝি আরাকান আর্মি দেখে ফেলল আমাদের!
কাঁধে ভারী ব্যাকপ্যাক, খাওয়াদাওয়ার ঠিক নেই, অন্ধকারে পাথরে হোঁচট খাওয়া, কখনও পাহাড় বেয়ে ওঠা, কখনও পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নামা, কখনওবা ঝিরি পার হওয়া, কখনও ঘন বাঁশঝাড়ের মধ্য দিয়ে যাওয়া, বার দুয়েক পথ হারিয়ে ফেলা, টেনশন, উৎকণ্ঠাÑএবার চূড়ান্ত পথ বাকি, অর্থাৎ বাঁশঝাড় বেয়ে ওপরে উঠতে হবে। বেশ খানিক ওঠার পর অবশেষে ফাঁকা জায়গার দেখা, মাঝখানে একটা গর্ত। এটাই সাকার চূড়া, সব পার করে চূড়ায় পৌঁছে দেশের সবচেয়ে উঁচু বিন্দুতে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় দেখার অভিজ্ঞতা কখনও ভুলব না। ২২ জানুয়ারি ভোর ৪টা ৫৫ মিনিটে সাকা হাফংয়ের চূড়া সামিট করেছি।
সকাল ৯টা ৩০-এ আমাদের ব্যাগ যেখানে রেখেছি সেই জুমঘরে ফিরে আসি। এখানে চাঁদের গাড়ির জন্য অপেক্ষা। গাড়ি আসার পর আমরা খুব দ্রুত গাড়িতে উঠে বসি। আমাদের গাড়ি তাজিংডংয়ের পাশে একটা পাড়া সিম্পতস্ন্যাম্পি পাড়ার কাছাকাছি নামিয়ে দিয়ে যায়। সিম্পতস্ন্যাম্পি পাড়ায় গিয়ে চা-বিস্কুট খাই। এরপর আবার ২ ঘণ্টা পর প্রায় ৪টার দিকে অফিসিয়ালি সর্বোচ্চ চূড়া তাজিংডং সামিট করি। সামিট করার পর প্রায় ২-৩ ঘণ্টা ট্রেকিং করে শেরকরপাড়ায় পৌঁছাই ৭টা ৩০-এ। পৌঁছানোর পর আমাদের এমন হয়েছে যে, নিজের নাম পর্যন্ত ভুলে গেছি। এখানেই আমাদের চতুর্থ দিনের সমাপ্তি। একই দিনে অফিসিয়াল ও আনঅফিসিয়ালি দেশের সর্বোচ্চ চূড়া সামিট করি।
পঞ্চম দিন : আমাদের ট্যুরের শেষ দিন
আজকের গন্তব্য শেরকরপাড়া থেকে বোডিংপাড়া হয়ে থানচি। খিচুড়ি খেয়ে ৭টার দিকে শেরকরপাড়া থেকে ট্রেকিং শুরু করি। প্রায় ৪০ মিনিট হাঁটার পর একটা জুমঘরে আশ্রয় নিয়ে হালকা খাবার খেয়ে পানি পান করে আবার ট্রেকিং শুরু করি।
সতর্কীকরণ