× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সমুদ্র

মহাজাগতিক প্রান্তরে ছড়িয়ে পড়ার আহ্বান

আসিফ

প্রকাশ : ০৮ জুন ২০২৪ ১৬:৩৭ পিএম

সমুদ্রের প্রতি মানবিক বোধ নিয়ে তাকানোর সময় এসেছে। ছবি : সংগৃহীত

সমুদ্রের প্রতি মানবিক বোধ নিয়ে তাকানোর সময় এসেছে। ছবি : সংগৃহীত

মানব সভ্যতা, জীবন এবং পরিবেশের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে সমুদ্র। এর বিশালতা, বিপুল প্রাণিকুল আর বৈচিত্র্য-পূর্ণ পরিবেশ বৈজ্ঞানিক গবেষণার বিষয়। স্থলভাগের মতোই আমরা প্রতিনিয়ত নষ্ট করছি সমুদ্রের পরিবেশ। বিপন্ন করে তুলছি এখানকার প্রাণিকুলের জীবন। মানব সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে সমুদ্র সুরক্ষার বিকল্প নেই। আজ ৮ জুন বিশ্ব সমুদ্র দিবস। দিবসটি নিয়ে লিখেছেন আসিফ-

১৯৮৪ সাল। এ সময় আমার জীবনে প্রথম সরাসরি সমুদ্র দেখার সুযোগ ঘটে। জাদু দেখানো এক দলের (জাদুকর মির আহসান) সঙ্গে প্রথমে আমি বান্দরবান যাই। সেখান থেকে এক অবসরে আমাদের আটজনের দলটি কক্সবাজারের দিকে ছুটে যাই। লাবণি পয়েন্টটাই ছিল নিঃসীম এক প্রান্তর। ঝাউ গাছ আর কিছু শামুক-ঝিনুকের দোকানে ভরা ছিল। ধোঁয়াশাচ্ছন্ন এক জগৎ। দুপুরের রোদে ফেনায়িত ঢেউয়ের মাথা আর সমুদ্রের গর্জন। পুরো কক্সবাজারটাই ছিল স্বপ্নাচ্ছন্ন বেলাভূমি। তাতে সভ্যতার পঙ্কিলতা দ্বারা আচ্ছাদিত ছিল না। সাগরের বিশালতা অভিভূত করে রেখেছিল। সে সময়কার ছোট্ট জীবনে পড়া কতক বইয়ের সমুদ্রের প্রতি আহ্বান যেন মস্তিষ্কে জেগে উঠেছিল : হারম্যান মেনভিলের ‘মবিডিক’, জুলভার্নের টুয়েন্টি ‘থাউজ্যান্ড লিগস আন্ডার দ্য সি’, আলেকজান্ডার বেলায়েভের ‘উভচর মানুষ’, শাহরিয়ার কবিরের ‘নুলিয়াছড়ির সোনার পাহাড়’; আরও কত বইয়ে সমুদ্রে যাওয়ার হাতছানি।

সমুদ্রকে আমার মনে হয়েছিল মহাজাগতিক প্রান্তরে ছড়িয়ে পড়ার একটা আহ্বান। ১৯৮৬ সালে আমরা তিন সহযাত্রী (আমি, টুটুল, ইকবাল) সমুদ্রে গিয়েছিলাম। মনে আছে, বৌদ্ধ মন্দির থেকে সমুদ্রের ধোঁয়াশাচ্ছন্ন হাতছানি কেমন আনমনা করে দিচ্ছিল। আমরা ঝাউবনের মধ্যে বসে ঢেউয়ের শব্দে জীবনের গন্তব্য নিয়ে গভীর আলোচনায় মগ্ন ছিলাম। ১৯৯০-এর দিকে একটি বিশাল নীল তিমি নাকি এখানে মৃত অবস্থায় ভেসে এসেছিল। এরপর তিমিদের সম্পর্কে এমন কিছু জানি, যেখানেই মৃত তিমিরা ভেসে এসেছে, নিঝুম দ্বীপের দমার চর থেকে ভোলার চরফ্যাশন, কক্সবাজার, হিমছড়ি, পতেঙ্গাসহ বিভিন্ন জায়গায় ছুটে গিয়েছি অথবা কেউ আমার পক্ষ হয়ে গিয়েছে। সম্প্রতি মস্তিষ্কের আয়তনে মানুষের ছয় গুণ বড় স্পার্ম তিমিদের মধ্যকার যোগাযোগের ভাষাপদ্ধতির প্রাথমিক রূপরেখা উন্মোচনের প্রান্তে গবেষকরা। এ ভাষার প্রকৃতি মানুষের তৈরি মোর্স কোডের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, তিমির পূর্বপুরুষরা সেই ডেভোনিয়ান যুগে মাটিতে উঠে এলেও পরবর্তী সময়ে তারা আবার ফিরে গিয়েছিল পানিতে। বেশিরভাগ ডাঙার প্রাণী যখন বিবর্তনের পথ বেয়ে মাটির বুকে অভিযোজিত হয়েছে, তখন তিমির পূর্বপুরুষরা তাদের বহুদিন আগে ছেড়ে আসা আবাসস্থল সেই গভীর সমুদ্রই আবার বেছে নেয়; বিবর্তনের মহাযাত্রায় যেন উল্টোপথের যাত্রী তারা। হ্যাঁ, তাদের পূর্বপুরুষরা ছিল স্তন্যপায়ী; কিন্তু প্রায় ৫ কোটি বছর আগে জলহস্তীর মতো ডাঙার এক স্তন্যপায়ী প্রাণী থেকে ক্রমান্বয়ে বিবর্তিত হয়ে সমুদ্রের গভীরে জায়গা করে নেয় এ স্তন্যপায়ীরা, প্রায় দেড় কোটি বছর ধরে। এ ছাড়া মাছেদের শ্বাস নেওয়ার জন্য ফুলকা থাকে, কিন্তু তিমিরা শ্বাস নেওয়ার জন্য ফুসফুস ব্যবহার করে।

নীল তিমি, ফিনব্যাক তিমি, হাম্পব্যাক তিমি, ব্রাইডস তিমি; যাদের অনেকেই বাংলার এ বেলাভূমিতে মৃতাবস্থায় ভেসে এসেছে। শান্ত প্রকৃতির এ তিমিরা তাদের বাচ্চাদের স্তন্য পান করায়, লালনপালন করে। তাদের আছে দীর্ঘ শৈশবকাল, যে সময়ের মধ্যে পূর্ণবয়স্করা তরুণদের শিক্ষা দেয়। খেলাধুলা তাদের সাধারণ অবসর-বিনোদন। সাগর হলো ঝাপসা, প্রায় অন্ধকার একটা জায়গা। স্থলে প্রাণীদের ক্ষেত্রে দৃষ্টিশক্তি ও ঘ্রাণশক্তি যত ভালোভাবে কাজ করে, মহাসাগরের গভীরে তত ভালোভাবে কাজ করবে না। তিমিদের ওই পূর্বপুরুষরা, যারা ওই ধরনের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ওপর ভরসা করে তাদের বাচ্চা, সঙ্গী অথবা শত্রুর অবস্থান খুঁজে বের করত, তারা খুব বেশি বংশধর রেখে যেত না। সুতরাং বিবর্তনের মাধ্যমে অন্য একটি পদ্ধতির উদ্ভব ঘটেছিল। তিমিদের বোঝাপড়ার ক্ষেত্রে এটাই কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা শব্দ ইন্দ্রিয়ের। দুটি তিমি পৃথিবীর দুই প্রান্তে অবস্থান করেও পরস্পরের সঙ্গে ২০ হার্জ ফ্রিকোয়েন্সিতে যোগাযোগ করতে পারে, কথা বলতে পারে।

তিমিদের ইতিহাসের বেশিরভাগ সময় ধরে তারা হয়তো প্রতিষ্ঠা করে থাকতে পারে এ ধরনের বিশ্বজনীন যোগাযোগের জাল। পরস্পর থেকে তারা ১৫ হাজার কিলোমিটার দূরত্বে থাকলেও অতল গভীরতার মধ্য দিয়ে ভালোবাসার গানে পরিপূর্ণ কণ্ঠস্বর তারা পাঠাতে পারে। বিশালদেহী, বুদ্ধিমান ও যোগাযোগের ক্ষমতাসম্পন্ন এ প্রাণী প্রায় ১ কোটি বছর ধরে কোনো প্রাকৃতিক শত্রু ছাড়াই বিকশিত হয়েছিল। কিন্তু উনবিংশ শতাব্দীতে বাষ্পচালিত জাহাজের উন্নতির ফলে সাগরের পানিতে যুক্ত হয়েছিল অশুভ শব্দদূষণ এবং মনুষ্যপ্রজাতির দৈনন্দিনের প্রথম থেকে শুরু করে হাত ধোয়ার সামগ্রী ডিটারজেন্ট ব্যবহার পর্যন্ত সবকিছু সমুদ্রকে দূষিত ও বিষাক্ত করে তুলেছে। আমার কাছে মনে হয় মৃতাবস্থায় বাংলাদেশের উপকূলে ভেসে আসা এ তিমিরা যেন তারই প্রতিফলন।

তারা দৈর্ঘ্যে ৪০ থেকে ৭০ ফুট লম্বা এবং প্রস্থে ১৬ থেকে ১৮ ফুট ছিল। যেমন, ১৯৯১ সালে উখিয়ার ইনানি সৈকতে, ১৯৯৬ ও ২০০৮ সালে হিমছড়ি সৈকতে, ২০০৫ সালে ভোলার চরফ্যাশনে, ২০০৮ সালে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে মৃত তিমি ভেসে এসেছিল। শেষবার আমরা দেখেছি হিমছড়ি সমুদ্রসৈকতে ভেসে আসা দুটি মৃত তিমিকে। কেন তারা মৃতাবস্থায় ভেসে আসে? সম্ভবত মহাজাগতিক সীমানার শুরু এ বিশাল প্রান্তরকেও এ মনুষ্যপ্রজাতি এতটা পচিয়ে গলিয়ে ফেলেছে, যার ফলে এ প্রাণিজগতের কাছেও সমুদ্রটা বসবাসের জন্য অনুপযুক্ত হয়ে পড়েছে। অথচ সমুদ্র আমাদের বেঁচে থাকার ভিত্তি। যে বাতাসে আমরা শ্বাস নিই, খাবার গ্রহণ করি তার জোগান দেয় এ সমুদ্র।

এ সমুদ্রেই রয়েছে আমাদের জলবায়ু ও আবহাওয়ার নিয়ন্ত্রণ। আমাদের গ্রহের জীববৈচিত্র্যের সর্ববৃহৎ আধার এ সমুদ্র। বিশ্বব্যাপী অগণিত জনগোষ্ঠী, প্রভূত সমৃদ্ধি ও মানবস্বাস্থ্য দীর্ঘস্থায়ী করার ক্ষেত্রে অবদান রাখে সমুদ্রের বহুবিধ সম্পদ। মানব-প্রভাবিত জলবায়ু পরিবর্তন আমাদের গ্রহ তাপদগ্ধ করে তুলছে, জলবায়ুর চিরাচরিত ধরন ও সমুদ্রস্রোত বাধাগ্রস্ত করছে এবং সমুদ্রতলের পরিবেশব্যবস্থা ও এতে বসবাসকারী বিভিন্ন প্রাণীর জীবন বদলে দিচ্ছে। আর আমরা বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক পদার্থ, প্লাস্টিক ও মলমূত্র নিক্ষেপ করে সমুদ্রতীরবর্তী জলরাশি দূষিত করে চলেছি।

প্রায়ই বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূলে ভেসে আসে মৃত তিমি

সেই সমুদ্রের প্রতি কী মানবিক বোধ নিয়ে তাকাব, আমাদের জীবনযাপনে পরিবর্তন আনব। ভয়েজার মহাকাশযান ১৯৯০ সালের দিকে সৌরজগৎ ছাড়িয়ে নক্ষত্রের পথে চলে গেছে। সেখানে মানুষের ৫৫টি ভাষাসহ তিমির সম্ভাষণসূচক শব্দযুক্ত গোল্ডেন রেকর্ড রয়েছে। এর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, যদি বহির্জাগতিক সভ্যতা মহাকাশে এ মহাকাশযান খুঁজে পায়, তাহলে তারা বুঝতে পারবে মানুষ ছাড়াও বুদ্ধিমান প্রাণী পৃথিবীতে রয়েছে। উপযোগী অঙ্গপ্রতঙ্গের অভাবে তারা প্রাযুক্তিক সভ্যতা গড়ে তুলতে পারেনি।

প্রতিটি প্রাণীই বাস্তুসংস্থাগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাই শুধু মানুষের জন্য নয়, তিমি ও অন্যান্য প্রাণের সঙ্গে মানবিক আচরণ জরুরি। আমরা একই পৃথিবীর বুদ্ধিমান জীব। আজ পৃথিবীতে সহনশীলতা-নমনীয়তার প্রচণ্ড অভাব, রয়েছে পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে চলার অজ্ঞতা। তিমিদের সঙ্গে সহনশীল অভিজ্ঞতাই আমাদের শেখাতে পারে শুধু দুই জাতির মানুষ নয়, প্রজাতি নয়; দুটি সম্পূর্ণ আলাদা গোত্রের বুদ্ধিমান প্রাণীও একসঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে পারে। অথচ এ বুদ্ধিমান প্রজাতিসমূহের আধার সমুদ্রের প্রতি কত নির্মম আমরা! আর্দিয়ান বা পৃথিবীবাসী হিসেবে সমুদ্রের দিকে তাকাতে পারলেই আমরা মানুষ মহাজাগতিক প্রান্তরে হাঁটা শুরু করতে পারব।

  • বিজ্ঞান বক্তা, সম্পাদক, মহাবৃত্ত
শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা