বিশ্ব পরিবেশ দিবস
অহিদুর রহমান
প্রকাশ : ০৫ জুন ২০২৪ ১২:০৯ পিএম
মানুষের টিকে থাকার জন্যই প্রাণী, উদ্ভিদ, জল, বায়ু, মাটি প্রয়োজন। তাই টিকে থাকার জন্যই মানুষের উচিত তাদের প্রকৃতি সচল রাখা। প্রবা ফটো
মাটি-পানি-বায়ু-শব্দ দূষণের ভয়াবহতা সামনে রেখে আজ ৫ জুন পালিত হচ্ছে বিশ্ব পরিবেশ দিবস। এ বছরের প্রতিপাদ্য, ‘মরুকরণ ও ভূমি পুনরুদ্ধার এবং খরার বিরুদ্ধে অভিযোজন ক্ষমতা বাড়ানো’। বসবাসযোগ্য পৃথিবীর জন্য পরিবেশের ভূমিকা নিয়ে লিখেছেন অহিদুর রহমান-
প্রকৃতি ক্রমেই বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠছে মানুষের অবিবেচনাপ্রসূত কর্মকাণ্ডের কারণে। বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি, কম বৃষ্টিপাত, গরম ও শুষ্ক আবহাওয়া, এলনিনোর প্রভাব, ভূমিক্ষয়, অধিক জনসংখ্যা, রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় চাষাবাদ, বন উজাড়, ভূগর্ভের পানি মাত্রাতিরিক্ত উত্তোলন নিয়ে রাজনীতি, জলাভূমির বিলুপ্তির কারণে বাড়ছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মরুময়তা। সেই দুর্যোগের সঙ্গে দেশের মানুষ যুদ্ধ ও অভিযোজন করে টিকে আছে যুগের পর যুগ।

১৯৭৪ সাল থেকে বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালিত হয়ে আসছে। সে বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ছিল ‘একটি মাত্র পৃথিবী’। এরপর প্রতি ব্ছর বিভিন্ন প্রতিপাদ্যে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। ১৯৭৫ সালে দিবসটি প্রতিপাদ্য ছিল মানববসতি, ১৯৭৬ সালে জল জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ, ১৯৭৭ সালে ওজোন স্তর : পরিবেশগত উদ্বেগ, জমির ক্ষতি ও মাটির ক্ষয়, ১৯৭৮ সালে ধ্বংস ছাড়া উন্নয়ন, ১৯৭৯ সালে আমাদের শিশুদের জন্য একমাত্র ভবিষ্যৎ : ধ্বংস ছাড়া উন্নয়ন, ১৯৮০ সালে নতুন দশকের নতুন চ্যালেঞ্জ : ধ্বংস ছাড়া উন্নয়ন, ১৯৮১ সালে ভূগর্ভস্থ জল : মানব খাদ্যশৃঙ্খলে বিষাক্ত রাসায়নিক, ১৯৮২ সালে স্টকহোমের ১০ বছর পর (পরিবেশগত উদ্বেগের পুনর্নবীকরণ), ১৯৮৩ সালে বিপজ্জনক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং নিষ্পত্তি; অ্যাসিড বৃষ্টি ও শক্তি, ১৯৮৪ সালে মরুকরণ, ১৯৮৫ সালে যুব : জনসংখ্যা ও পরিবেশ, ১৯৮৬ সালে শান্তির জন্য একটি গাছ, ১৯৮৭ সালে পরিবেশ এবং আশ্রয় : ছাদের চেয়েও বেশি, ১৯৮৮ সালে মানুষ যখন পরিবেশকে প্রথম রাখবে, তখন উন্নয়ন স্থায়ী হবে, ১৯৮৯ সালে বৈশ্বিক উষ্ণতা, বৈশ্বিক সতর্কতা, ১৯৯০ সালে শিশু এবং পরিবেশ, ১৯৯১ সালে জলবায়ু পরিবর্তন; গ্লোবাল পার্টনারশিপের জন্য প্রয়োজন, ১৯৯২ সালে একটি মাত্র পৃথিবী : যত্ন নাও সহযোগিতা করো, ১৯৯৩ সালে দারিদ্র্য এবং পরিবেশ : দুষ্ট বৃত্ত ভাঙো, ১৯৯৪ সালে এক পৃথিবী এক পরিবার, ১৯৯৫ সালে আমরা জনগণ : বৈশ্বিক পরিবেশের জন্য একতাবদ্ধ, ১৯৯৬ সালে আমাদের পৃথিবী, আমাদের বসতি, আমাদের বাড়ি, ১৯৯৭ সালে পৃথিবী জীবনের জন্য, ১৯৯৮ সালে পৃথিবী জীবনের জন্য- আমাদের সমুদ্র বাঁচান, ১৯৯৯ সালে আমাদের পৃথিবী, আমাদের ভবিষ্যৎ, এটি সংরক্ষণ করুন, ২০০০ সালে পরিবেশ সহস্রাব্দÑকাজ করার সয়ম, ২০০১ সালে ওয়ার্ল্ডওয়াইড ওয়েব অব লাইফের সঙ্গে সংযোগ করুন, ২০০২ সালে পৃথিবীকে একটি সুযোগ দিন, ২০০৩ সালে পানির জন্য ২ মিলিয়ন মানুষ মারা যাচ্ছে, ২০০৪ সালে চেয়েছিলেন! সমুদ্র এবং মহাসাগরÑমৃত অথবা জীবিত, ২০০৫ সালে সবুজ শহর ও গৃহের জন্য পরিকল্পনা করো, ২০০৬ সালে মরুভূমি এবং মরুকরণ; শুষ্ক ভূমি মরুভূমি করবেন না, ২০০৭ সালে বরফ গলানোÑএকটি গরম বিষয়, ২০০৮ সালে অভ্যাসকে লাথি : একটি নিম্ন কার্বন অর্থনীতির দিকে অগ্রসর হও, ২০০৯ সালে আপনার গ্রহ আপনার প্রয়োজন : জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে একত্রিত হোন, ২০১০ সালে অনেক প্রজাতি এক গৃহ এক ভবিষ্যৎ, ২০১১ সালে বন : আপনার সেবায় প্রকৃতি, ২০১২ সালে সবুজ অর্থনীতি এটি কি আপনাকে অন্তর্ভুক্ত করে, ২০১৩ সালে ভাবুন, খাবেন, বাঁচান। আপনার ফুডপ্রিন্ট কমিয়ে দিন, ২০১৪ সালে আপনার আওয়াজ তুলুন; সমুদ্রের স্তর নয়, ২০১৫ সালে সেভেন মিলিয়ন ড্রিমন্স; এক গ্রহ : যত্নসহকারে শ্রবণ করুন, ২০১৬ সালে ‘বন্য প্রাণী ও পরিবেশ, বাঁচায় প্রকৃতি বাঁচায় দেশ, ২০১৭ সালে মানুষকে প্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত করা : শহরে এবং জমিতে, মেরু থেকে বিষুবরেখা পর্যন্ত, ২০১৮ সালে প্লাস্টিক দূষণকে পরাস্ত করুন, ২০১৯ সালে বায়ুদূষণ থামান, ২০২০ সালে প্রকৃতির জন্য সময়, ২০২১ সালে ইকোসিস্টেম পুনরুদ্ধার, ২০২২ সালে শুধু একটাই পৃথিবী, ২০২৩ সালে প্লাস্টিক দূষণের সমাধান, আমাদের একটাই পৃথিবী। এ গ্রহটাকে বাঁচানোর জন্য ১৯৭৪ সাল থেকে বিশ্ব পরিবেশ দিবস সামনে রেখে কত প্রতিপাদ্যই না চর্চা করছি আমরা। কোনো কিছুতেই পরিবেশের অনুষঙ্গগুলো সুস্থ রাখতে পারছি না।

পৃথিবীর ইতিহাসে দীর্ঘস্থায়ী খরা হয়েছিল চিলির ‘আতাকামা’ মরুভূমিতে। প্রাচীন অনেক সভ্যতা খরার কারণে ধ্বংস হয়ে গেছে এবং পৃথিবীতে খরায় অনেক প্রাণের বিলুপ্তি হয়েছে। খরার ফলে বাস্তুতন্ত্র নষ্ট হয়, বনে আগুন লাগে, খরাপীড়িত অঞ্চল উত্তপ্ত থাকে, প্রাণিসম্পদের খাদ্যের সংকট দেখা দেয়, দেখা দেয় পরিবেশগত বিপর্যয়, ভূগর্ভের পানির স্তর নিচে নেমে যায়, উদ্ভিদের স্বাস্থ্য খারাপ হয়, রোগের সৃষ্টি হয়, কীটপতঙ্গ বাড়ে, উৎপাদন খরচ বেশি হয়, উৎপাদন কমে যায় ফলে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। ১৯৭৮-১৯৭৯ সালে বড় খরা মোকাবিলা করে বাংলাদেশ। তখন ৪২% জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১৯৯৭ সালে দীর্ঘস্থায়ী খরায় ৫০ কোটি ডলারের বেশি ক্ষতি হয়। ১০ লাখ টন ধান ও ফসল নষ্ট হয়। আমরা মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত করে চলেছি আমাদের পরিবেশের প্রতিটি উপাদান। দিনদিন বাড়ছে এ মরুদুর্যোগ।
আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে বাংলাদেশে পরিবেশ সংরক্ষণে কিছু রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ শুরু হয়। ১৯৭২ সালে সুইডেনের স্টকহোমে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ সম্মেলনের পর সরকার ১৯৭৪ সালে ‘পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ বিভাগ’ গঠন করে এবং ১৯৭৭ সালে ‘পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ’ জারি করে। ১৯৮৯ সালে বাংলাদেশ বন বিভাগ এবং নতুন প্রতিষ্ঠিত পরিবেশ অধিদপ্তরসহ ‘পরিবেশ ও বন মন্ত্রণলায়’ গঠিত হয়। ১৯৯০ সালকে পরিবেশ বর্ষ ও ১৯৯০-২০০১ সালকে পরিবেশ দশক ঘোষণা করা হয়। বাংলাদেশ ১৯৯২ সালে ‘জাতীয় পরিবেশ নীতি’ এবং ১৯৯৫ সালে ‘বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন’ প্রণয়ন করে। ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনে ‘পরিবেশ সংরক্ষণকে’ সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত করে বাংলাদেশ পরিবেশবাদিতায় অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনে অনুচ্ছেদ ১৮-এর পর ‘পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের’ উক্ত নতুন অনুচ্ছেদ ১৮ক হিসেবে সন্নিবেশ করে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘রাষ্ট্র বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করিবেন এবং প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য, জলাভূমি, বন ও বন্য প্রাণীর নিরাপত্তা বিধান করিবেন।’

এত নিয়মনীতি থাকার পরও পরিবেশগত বিপর্যয় বাড়ছেই। দিনদিন কমছে নদী, হাওর, বিল, জলাশয়, খাল। বৃহৎ বাঁধ, সেতু, রেললাইন, সড়কপথ, অবকাঠামো, কারখানা স্থাপন, বর্জ্য নিষ্কাশন, বাণিজ্যিক কৃষি খামার, ইকো পার্ক, সামাজিক বনায়ন, আধুনিক কৃষি উন্নয়ন কর্মসূচি, সবুজ বিপ্লব, বিনোদন পার্ক ইত্যাদি দেশের মাটি, পানি, বায়ুসহ পরিবেশগত বিপর্যয় বাড়িয়ে তুলছে।
মানুষের টিকে থাকার জন্যই প্রাণী, উদ্ভিদ, জল, বায়ু, মাটি। তাই টিকে থাকার জন্যই মানুষের উচিত তাদের প্রকৃতি সচল রাখা। মূলত প্রতিটি সমাজব্যবস্থায় প্রতিবেশ, সমাজ-সংস্কৃতি ও অর্থনীতি সামাজিক বৈচিত্র্যের ওপর নির্ভর করেই গড়ে উঠেছে। আসুন আমরা কৃষক, জেলে, কামার, কুমার, পাহাড়ি, কবিরাজ সবাই মিলে রক্ষা করি জলাভূমি, নদীনালা, খাল-বিল, হাওর, জল-জলাশয়, পাহাড়, বন, গাছ, লতাপাতা, মাছ, পাখি, ব্যাঙ, প্রজাপতি ও সংস্কৃতি। শ্রদ্ধা জানাই আমাদের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের প্রতি। যে বৈচিত্র্যের ওপর ভর করে পারস্পরিক নির্ভরশীলতায় টিকে আছি আমরা।
আমাদের দেশে খরার প্রবণতা আছে কিন্তু মরুকরণ এখনও শুরু হয়নি। খরা, মরুময়তা ও মরুভূমি এক নয়। কিন্তু এসব এক কাতারে মিলিয়ে ফেলা হচ্ছে। সব শেষ হয়ে গেল, জ্বলেপুড়ে ছারখার হয়ে গেল, সব বিনাশ হয়ে গেল মানে ‘মরুভূমি হয়ে গেল এমন না’। হাজার বছর আগেও এ উপমহাদেশে খরা ছিল। খনার বচন তা-ই বলেÑ‘পাঁচ রবি মাসে পায়, ঝরায় কিংবা খরায় যায়’। বাংলা বর্ষপঞ্জিকায় যে মাসে পাঁচটি রবিবার থাকবে, সে মাসে প্রবল বৃষ্টি বা খরা হবে।

খরার জের টানলেই আমাদের সামনে ভেসে ওঠে দেশের বৃহত্তর উত্তরাঞ্চল বরেন্দ্র অঞ্চল। জলাভূমি অঞ্চল বলে খ্যাত হাওরাঞ্চলে তীব্র দাবদাহ ও পানিহীনতায় চারদিক রুক্ষ ও শুষ্ক হয়ে ওঠে। মাটি চৌচির হয়ে ফেটে যায়। নানা অসুখবিসুখ দেখা দেয়। শস্যফসল চাষে বিঘ্ন ঘটে। পার্বত্যাঞ্চল, পাহাড়েও খরা মৌসুম শুরু হয় ফাল্গুন-চৈত্র মাসেই। এখন খরার স্থায়িত্বকাল বেড়েছে। খরা অনিয়মিত হচ্ছে। এসব খরা ও মরুকরণ মোকাবিলায় আমাদের উদ্যোগ নিতে হবে।
১৯৭৫ সালে জাতিসংঘের সাধারণ সভায় মরুকরণের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী এক আহ্বান জানানো হয়। ১৯৭৭ সালে কেনিয়ার নাইরোবিতে জতিসংঘ বিশ্ব মরুকরণবিষয়ক সম্মেলন আয়োজন করে। ১৯৯৪ সালের ১৪ নভেম্বর জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক মরুকরণ প্রতিরোধ সনদ ঘোষণা করে। আমরা যদি এ মুহূর্তে সতর্ক হতে পারি তাহলে হয়তো বিপর্যয় কিছুটা ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব হতে পারে। এ ক্ষেত্রে আমাদের বেশ কিছু জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে। নদ-নদী দখল কিংবা জলাশয় ভরাটের ব্যপারে সতর্ক হতে হবে। কঠোর আইন প্রয়োগ করে বৃক্ষ নিধনসহ বন্য প্রাণী নিধন বন্ধ করতে হবে। বাস্তুতন্ত্র রক্ষায় সকল প্রাণের প্রতি সদয় হতে হবে। এ সত্য তথ্যটি মানুষকে জানাতে হবে, বোঝাতে হবে। মরুকরণ রোধে সকল প্রাণের অস্তিত্ব যে অপরিহার্য, তা জানতে হবে, সরকারকে উন্নয়ন পরিকল্পনায় পরিবেশকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করতে হবে।