× ই-পেপার প্রচ্ছদ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি ফিচার চট্টগ্রাম ভিডিও সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

হিমালয়ের চূড়ায় রোমাঞ্চকর অভিযান

বাবর আলী

প্রকাশ : ০৩ জুন ২০২৪ ১০:৪১ এএম

আপডেট : ০৩ জুন ২০২৪ ১৪:০২ পিএম

পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্টের  চূড়ায় বাবর আলী। ছবি : বাবর আলীর সৌজন্যে

পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্টের চূড়ায় বাবর আলী। ছবি : বাবর আলীর সৌজন্যে

১৯ মে ষষ্ঠ  বাংলাদেশি হিসেবে পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট জয় করেন বাবর আলী। এর দুই দিন পরই প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে তিনি জয় করেন চতুর্থ সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ লোৎসে। দেশে ফিরে মাউন্ট এভারেস্ট জয়ের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা ঘুরিয়ার পাঠকের জন্য লিখেছেন বাবর আলী

খুম্বু আইসফলে প্রথমবার

হাভিয়েরকে সকাল থেকে পইপই করে বুঝিয়ে দিয়েছিলাম রাত সাড়ে ১২টায় নাশতা, ১টায় বেরোনো। ব্যাটা বুঝেছে সাড়ে ১১টায় নাশতা। পেম্বা দাই (নেপালে বড় ভাইকে দাই বলা হয়) আমাদের প্যাকড লাঞ্চ গুছিয়ে আর কিচেন সারিয়ে সবে নিজের টেন্টের দিকে যাচ্ছেন, দেখেন হাভিয়ের ক্লাইম্বিংয়ের ধড়াচূড়া পরে ডাইনিং টেন্টে ঢুকছে। অবশ্য হাভিয়েরকে কোনো কিছু বুঝিয়ে বলতে সবাই আমার ওপরই নির্ভর করে।

হাস্যোজ্জ্বল বাবর আলী

সাড়ে ১২টায় থুকপা খেয়ে বেরোনোর পরিকল্পনা। পেম্বা দাই দুখানা ডিম সিদ্ধও খাইয়ে দিলেন। ব্ল্যাক কফি বানিয়ে নিয়ে ১টা নাগাদ পথে। চেনা পথ ধরে হাঁটা। আগের দিন যে জায়গায় ক্রাম্পন পরেছিলাম, তার বেশখানিকটা দূরে গিয়ে আজ ক্রাম্পন পরলাম। আমাদের সামনে বেশ কয়েকটা বৃত্তাকার হলদে আলোর সারি। পেছনেও রওনা হয়েছে বেশকিছু শেরপা। খুম্বুর গোলকধাঁধায় পথ দেখাচ্ছে শিরস্ত্রাণের ওপর বাঁধা কালো হীরক তথা ব্ল্যাক ডায়মন্ডের হেডল্যাম্প। সাদা খণ্ড খণ্ড হীরকের এই ভূখণ্ডে ৪৫০ লুমেন আলোর ব্ল্যাক ডায়মন্ডই ভরসা। নিজের পা ফেলার জায়গাটুকু পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। আমাদের দলের সবার সামনে থুলো ফুর্বা, তারপর ঊষাদি, আমি এবং শেষে হাভিয়ের। ক্রাম্পনে দিদি সড়্গড় না বলে চলার গতি কিছুটা ধীর। বীরে সঙ্গে থাকলে অনেকদূর এগিয়ে যাওয়া যেত।

জীবন মৃত্যুর এমন রুদ্ধশ্বাস মুহূর্তের মুখোমুখি হতে হয় অভিযাত্রীদের

খুম্বুর আইস পিনাকলগুলো এড়িয়ে আর বরফের চাঙ্গড় মাড়িয়ে পথচলা। ক্রাম্পনের আঘাতে চৌচির হচ্ছে বরফের চাঁইগুলো। শক্ত বরফ পরিণত হচ্ছে নরম তুষারে। পায়ের নিচে সেই খচরমচর, চেনা শব্দ। জুমারিং সেকশনে দিদির বেশখানিকটা বেগ পেতে হলো। অথচ সেদিন প্র্যাকটিস দারুণ করছিলেন। আর শক্ত বরফে দিদি কেমন যেন জড়োসড়ো। আমি পেছন থেকে বারবার বলছি, ‘Didi, Trust your crampons. You won't fall.’ কিন্তু ওনার না ক্রাম্পনকে বিশ্বাস হচ্ছে, না আমার অভয়বাণীকে! মাঝে একবার পানি পানের বিরতি। অবশ্য বিরতি না বলে গলা ভেজানো বলাই ভালো। যতই তৃষ্ণা থাকুক, গরম পানি একসঙ্গে বেশি গলায় উপুড় করা যায় না। আমি অবশ্য ন্যালজেনের বোতলে থাকা পাইনআপেল জুস গলাধঃকরণ করলাম। ঠান্ডার হাত থেকে বাঁচাতে ব্যাকপ্যাকের ভেতরে রাখা ছাড়াও একটা মোজা দিয়ে মুড়িয়ে নিয়েছি বোতলটা। সঙ্গের থার্মোসে গরম পানি তো আছেই।



পেছনে ফিরে একবার তাকাতেই দূরের বেসক্যাম্পের মিটিমিটি আলো চোখে পড়ল। সোলার প্যানেলের আলো জ্বলছে খুম্বুর পাদদেশে। দু-তিনজন শেরপা অতিক্রম করে গেল আমাদের। ওপর-নিচ থেকে কাশির শব্দ ভেসে আসছে মাঝেমধ্যেই। এই শুকনো কাশির হাত থেকে নিস্তার চাই আমি। কাউকে কাশতে দেখলেই তার ধারেকাছে ঘেঁষি না আমি। আমাদের চারজনের দলের মধ্যে অ্যান্ড্রু ডিংবোচে থেকে কাশি আমদানি করে নিয়ে এসেছে। যেহেতু একই ডাইনিংয়ে খেতে হয়, আমি ওর মুখোমুখি না বসে দূরের চেয়ারটায় বসি।

শুভ্র বরফ রাজ্যে হাস্যোজ্জ্বল বাবর আলী

‘এ দাদা, ফাটাফাটি হচ্ছে,’ পেছন থেকে বীরের গলার আওয়াজ। আমাদের পরে বেরিয়ে ঠিকই আমাদের ধরে ফেলেছে। তার অল্প পেছনে ভারী ব্যাকপ্যাক কাঁধে ফুর্বা অংডি। খুম্বুর গোলকধাঁধা ওদের কাছে হাতের তালুর মতো চেনা। লম্বা চুলের পাঙ্খা দাইকেও দেখা গেল অল্প নিচে। এক দফা কুশল বিনিময় শেষে ওরা এগিয়ে গেল। থুলো ফুর্বাকে এই রাতের আধাঁরেও অনেক শেরপা চিনছে। এটা-ওটা নিয়ে কথা বলা শেষে ফের পা চালানো।

চলছি আর ভাবছি প্রথম দিকের এভারেস্ট অভিযানগুলোর কথা। ১৯৫০ সালে প্রথম এই উপত্যকায় বিদেশিদের পা পড়ার পরপরই এদিক দিয়ে এভারেস্ট আরোহণের সম্ভাবনায় ব্রিটিশ আর সুইসরা ছুটে এসেছে। তখন না ছিল এখনকার মতো পরিকাঠামো, না ছিল পর্বতারোহণ সরঞ্জামের এমন রমরমা। খাড়া ঢাল বেয়ে উঠতে যে জুমারের সাহায্য পাচ্ছি আমরা, জুইসি এবং মার্টিন নামের দুই পক্ষী পর্যবেক্ষক জুমার আবিষ্কার করেছেন সেই ১৯৫০ সালেই। যুগের আর বিজ্ঞানের কত সুবিধা পাচ্ছি আমরা। সে তুলনায় সে যুগের অভিযাত্রীরা সরঞ্জামের দিক থেকে ছিলেন নিতান্তই অপ্রস্তুত। তবে ‘স্পিরিট অব অ্যাডভেঞ্চার’-এ পুরোপুরি বলীয়ান ছিলেন তারা।

অভিযাত্রীদের এমন প্রতিকূল পরিবেশে পাড়ি দিতে হয়

বিরামহীন পা চালানোর ইতি নেই। ফের ছোট্ট একটা খাড়া ঢাল এলো। আমরা সেফটি লাগিয়ে পার হলেও ঊষাদিকে করতে হলো জুমার। পুব আকাশে রঙ ধরতে শুরু করতেই হেডল্যাম্প নিভিয়ে দিলাম। পেছনে তাকাতেই হলদে ছোপ লাগা পুমোরির চূড়া দৃষ্টিগোচর হলো। হঠাৎ করেই পেছন থেকে শুনি, ‘হেই ফ্রেন্ড ফ্রম লবুচে, হাউ আর ইউ ডুয়িং?’ দেখি লবুচে আরোহণের সময় দেখা হওয়া এক ক্লাইম্বার। একে অপরকে শুভকামনা জানালাম।

পথের বর্ণনা একটু দিই। হরেক রকমের বরফের ভাস্কর্য। কোনোটা গম্বুজাকৃতি, কোনোটা চোখা পিনাকল। মাথায় টুপি নিয়ে মাশরুমের আকৃতি নিয়েছে কোনো বরফ। আবার কোনোটার সঙ্গে আমার চেনা জাগতিক কোনো কিছুর সাদৃশ্য নেই। কোনো দৈববলে উপস্থিত হয়েছে এই বরফ প্রপাতে। তবে বরফের আকৃতি যেমনই হোক, একটা জিনিস খুব কমন। বরফ প্রপাতজুড়ে হাজারো ফাটল। কোনোটা লম্বালম্বি, কোনোটা দিগন্ত অভিমুখী। শীতকালে ফাটলের জন্য বিখ্যাত আমার বাবার পায়ের গোড়ালিতেও এত ফাটল দেখিনি। ছোটগুলোকে লাফিয়ে আর বড়গুলোকে এড়িয়ে ক্রাম্পনের আঁচড় কেটে দিচ্ছি খুম্বু আইসফলে। বরফে ক্রাম্পনের ফ্রন্ট পয়েন্টের আঁচড় দেখলে মনে হয় হিংস্র কোনো শ্বাপদের নখ। পর্বতের এহেন উচ্চতায় রাজত্ব শুধু শীত আর শীতের। সঙ্গে বিশাল সব বরফের চাইয়েরও রাজত্ব। আট-দশজন মানুষ সমান উচ্চতার এক বিশাল বরফের ভাস্কর্যের মুখোমুখি হলাম ভোরের আলো খুম্বু আইসফলে পড়তেই। অবাক বিস্ময়ে দেখলাম খানিকক্ষণ।

হিমালয়ের নয়নাভিরাম ল্যান্ডস্কেপ

ফুর্বা দাই বলল আমাদের সঙ্গে চললে তোমার অনেক দেরি হবে। তুমি এগোতে থাক। ঊষাদিও বলল, ‘I am too slow. You go ahead. Don't spoil your normal pace.’ আমিও অনেকক্ষণ ধরেই ভাবছিলাম। ফুর্বা দাইয়ের সংকেত পেয়ে এবার একাই পা বাড়ালাম। এবার খানিকটা বরফের মাঠের মতো জায়গা। তবে চড়াই আছে বেশ। সেফটি লাগিয়ে বেশ কজনকে অতিক্রম করলাম। নিজের গতিতে চলার আনন্দই আলাদা। বেশ কয়েকটা আইস পিটন-সমৃদ্ধ অ্যাংকর অতিক্রম করলাম বেশ হেলেদুলে। এরপর একটা সমতল জায়গা। শেরপা আর কয়েকজন ক্লাইম্বার এখানে ঝাঁকিয়ে বসেছে। সত্যি বলতে রাত থেকে এখন অবধি পুরো আইসফলে এই একটা সুন্দর সমতল জায়গা পেলাম। পুমোরির পাশাপাশি সকালের সোনালি রোদ পড়েছে লিংট্রেনের গাত্রেও। আমিও গলায় পানি ঢেলে খানিক বিশ্রাম নিয়ে পরের অংশ বাওয়া শুরু করলাম। লম্বা একটা জুমারিং ফেস। সেটা শেষ হতেই পথে পড়ল বিশাল সব পিনাকলের মধ্য দিয়ে এক গলি। পুরান ঢাকার গলিগুলোর চেয়েও সংকীর্ণ এক গলি। কসরত করে গা এলিয়ে বেরোতে হয়। শুধু পুরান ঢাকার মতো নোংরা নয়ানজুলি নেই এই শক্ত বরফের রাজ্যে। হাভিয়েরও দেখলাম পিছু পিছু আসছে। খুম্বু আইসফলের জঠরে ওর সুন্দর একখানা ছবি তুলে দিলাম। এই সংকীর্ণ পথ শেষ হতেই পথ আগলাল লম্বা এক জুমার ফেস। যতদূর জানি, এবারই পথে যুক্ত হয়েছে এই জুমার ফেস।

শুভ্র বরফ রাজ্যে বাবর আলী

সামনে মানব ট্রাফিক-ফাঁস। ওভারহ্যাং এই ফেসে শেরপাদেরও দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তার ওপর সবার কাঁধে জগদ্দল সাইজের বোঝা। আর বরফের এই ঢালটা সাধারণ বরফ নয়; রীতিমতো স্বচ্ছ ও শক্ত বরফ। ক্রাম্পনের ফ্রন্ট পয়েন্ট সহজে আটকাতে চায় না। আর জুমারিং ফেসের ঠিক আগে আছে খানিকটা বড় সাইজের ক্রেভাস। সেটা সাবধানে পেরিয়ে এক ইতালিয়ান ক্লাইম্বারের পেছনে দাঁড়ালাম। খানিক বাদে এলো হাভিয়েরও। অপেক্ষা করতে করতে ফুর্বা দাই ও ঊষাদিও চলে এলো। আমাকে ডিঙিয়ে ফুর্বা দাই এগিয়ে গেল। পরের রোপ ফাঁকা পেতেই আমি ক্রাম্পনের ফ্রন্ট পয়েন্ট বসিয়ে দিলাম বরফ গাত্রে। সহজে কি আর বসতে চায় ইস্পাতের চোখা পাত দুটো। কিন্তু এত কাল ধরে প্র্যাকটিস করে আসা ফ্রন্ট পয়েন্টিংয়ের এমন সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়াও-বা করি কেমনে। নির্মল, কাচের মতো বরফে পা দিয়ে আঘাত করতে কর‍তে উঠে এলাম ওপরে। উঠেই সেফটি অ্যাংকর লাগিয়ে শ্বাস স্বাভাবিক হতে মিনিট কয়েক লাগল।

প্রতি পদে পদে মৃত্যুফাঁদ অপেক্ষা করছে অভিযাত্রীদের জন্য

ফের চলা শুরু। ফুর্বা দাই পেছন থেকে বললেন, ‘সামনে ল্যাডার-ক্রসিং আছে। তোমার জন্য অসুবিধা হবে না। তুমি এগোতে থাকো।’ শুনেছি এবার পথ অনেক লম্বা হলেও তুষার ফাটল পারাপারের ল্যাডারের সংখ্যা কম। আমি অবশ্য ল্যাডার ক্রসিং করেছি বেশ অনেক দিন হলো। ধীর পায়ে এগোতেই দেখলাম আইসফলের মাঝে গা এলিয়ে আছে এক তুষার ফাটল। পারাপারের জন্য রাখা আছে অ্যালুমিনিয়াম ল্যাডার। আমার সামনেই এক শেরপা খুব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে পেরোল ল্যাডার। NIM-এ শেখানো বিদ্যা আর সদ্য শেখা শেরপা-বিদ্যা সম্বল করে পেরোলাম ল্যাডার। সিঁড়ির প্রথম ধাপে পা দিয়ে অবশ্য বুক কেঁপেছিল। নিচে আমাকে গিলতে হাঁ করে আছে বিশাল এক ফাটল। একবার সে ফাটলের হাড় কাঁপানো শীতের রাজ্যে গিয়ে পড়লে ছবিতে মালা পরার সমূহসম্ভাবনা। সামান্য ভুলচুকও করা যাবে না। অবশ্য প্রথম ল্যাডার হার হতেই পরের দুটো খুব একটা মুশকিল মনে হলো না। এরপরের ল্যাডারটা দিয়ে আড়াআড়ি পার নয়, উঠতে হবে সোজাসুজি। আগেরগুলো পেরোনোর সাহসের পুঁজি সম্বল করেও অপেক্ষাকৃত লম্বা এই ল্যাডার পেরিয়ে গেলাম। মনে বেশ আনন্দ; কারও সাহায্য ব্যতিরেকেই ল্যাডার-পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলাম। খুম্বু আইসফল হলো সাপলুডু খেলার ছক। সিঁড়ি যেমন আছে, তেমনি সাপের লকলকে কী হওয়ার মতো উদ্যত তুষার ফাটল কিংবা তুষারধসের শিকার হলে সোজা নিচে পড়ে যেতে হবে! কিংবা কে জানে ওপরে পৌঁছে যেতে হবে!

মৃত্যুফাঁদ পাড়ি দিয়ে অভিযাত্রীদের পৌঁছাতে হয় কাঙ্খিত লক্ষ্যে

সিঁড়ির রাজ্য শেষ করতেই সেফটি অ্যাংকর লাগিয়ে শক্ত তুষারের রাজ্যে পথচলা। আধা ঘণ্টার মতো পথ চলতেই দূরে উঁকি দিল হলদে টেন্ট। আহা! কী সুন্দর দৃশ্য। ওই কয়েক বর্গফুটের আশ্রয়স্থলটাকে কী যে আপন মনে হলো। কিন্তু যাকে আপন ভাবছি, সে কি আসলেই আপন! অন্য কোনো এজেন্সির তাঁবু হওয়ার সম্ভাবনাই যে বেশি। তাতে কী, গন্তব্য পাওয়া গেছে। এবার গন্তব্যের সঙ্গে দূরত্ব কমিয়ে আনার পালা। সেটাই করে যাচ্ছি শক্ত বরফের ওপর ক্রাম্পনের ধাতব আঁচড় ফেলে। একসময় কমে এলো দূরত্ব। তাঁবুর গায়ে যথারীতি অন্য এজেন্সির নাম। এটাই ভবিতব্য। ক্যাম্প-১ জায়গাটা ছড়ানো-ছিটানো। এখানে কিছু তাঁবু, ওই দূরে আর কিছু তাঁবু। তাঁবু ছাড়িয়ে নজর গেল সেই সুদূরে। এখান থেকে অনেক তফাতে পিঁপডের ন্যায় কিছু মানুষকে চলতে দেখা যাচ্ছে। খোদা! ক্যাম্প-১ কি ওই অবধি ছড়ানো নাকি? আমাদের তাঁবু কি ওখানে? আশঙ্কা ঝেড়ে ফেলতে 8K-এর তাঁবুর সারির পাশে বসে পড়লাম। পানির সঙ্গে স্নিকার্সে কামড় দিলাম। স্নিকার্স তো নয় যেন ঝামা ইট! বহু কষ্টে দাঁত বাঁচিয়ে ওই ঝামা ইট পেটে চালান দিলাম।

খানিক বসে চারপাশে চোখ বোলালাম। সামনে যত দূর চোখ যায়, শক্ত বরফের রাজত্ব। তবে অনেক বেশি চড়াই নয়। ঘড়ি বলছে এটাই ক্যাম্প-১। স্নোয়ি হরাইজনের তাঁবুর উদ্দেশ্যে এদিক-ওদিক চোখ ঘোরালাম। মিলল না কিছু। শেষে সাতোরি অ্যাডভেঞ্চারের তাঁবু দেখে মনের কোণে জমা হওয়া শক্ত বরফ গলল। স্নোয়ির তাঁবু আশপাশেই থাকার কথা। পরের ঢালু অংশে ঠিক ঠিক স্নোয়ির দুখানা তাঁবুর দেখা মিলল। খানিকটা পেছনের তাঁবুর সামনে গিয়ে ক্রাম্পন-হারনেস খুলে খানিক বসলাম। সামনের তাঁবুটা ঊষাদি আর ফুর্বার জন্য রাখলাম। ঊষাদি খুব শ্রান্ত তজাকবে স্বাভাবিক। ওই মিটার দশেক পথ আর নাই-বা হাঁটালাম। বরফের ওপর বসেই কুক পেম্বার দেওয়া প্যাকড লাঞ্চের বেশিরভাগের শ্রাদ্ধ করলাম। চিজ, বিস্কুট আর কেকের গতি করতে পারলেও অসুবিধায় পড়লাম সিদ্ধ ডিম নিয়ে। খোসা ছাড়াতেই দেখি ডিমের সাদা অংশের ওপর শক্ত বরফের আবরণ! রোদ থাকায় তাঁবুর পাশে ওটাকে শুকাতে দিলাম। যদি বরফ গলে আর কী!

বিপজ্জনক বরফ ফাঁটল

স্প্যানিশ মানসানা তথা আপেল পরে খাব ঠিক করলেও ২৫০ মিলি কোক নিয়ে কী করব সেটা নিয়ে পড়লাম দোটানায়। সফট কিংবা হার্ড কোনো ড্রিংকস প্রীতি নেই আমার। শেষ কোক খেয়েছিলাম আমার দাবলাম সামিটের পর। চূড়া আরোহণ শেষে বেসক্যাম্পে নামতেই লাল সিং এমনভাবে হাতে কোক তুলে দিয়েছিল, যেন এটা মহার্ঘ বস্তু। না খেলে অসম্মান করা হতো ওই কার্বোনেটেড বেভারেজ।

যাহোক, খানিক ধাতস্থ হতে নয়টা নাগাদ তাঁবুতে সেঁধিয়ে পড়লাম। শক্ত বরফের ওপর একপাশ ঢালু। এসব নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় নেই। ব্যাকপ্যাকের ওপর থেকে স্লিপিং ম্যাট আর কন্দর থেকে স্লিপিং ব্যাগ বের করে লম্বা হলাম তাঁবুর ভেতরে। ঘুমানোর ইচ্ছে নেই। তবে শরীরটাকে ঢিলে দেওয়া দরকার। ঘণ্টা দুয়েক বাদে হাভিয়ের, ঊষাদি আর ফুর্বা দাই এলো। ওরা অবাক আমি কীভাবে সঠিক তাঁবু খুঁজে পেলাম। সাতোরি নিয়ে আমার পূর্বানুমান বললাম। বেসক্যাম্পে আমাদের পাশেই সাতোরির ক্যাম্প। এ ছাড়া আমাদের কুক পেম্বার দুই ভাই সাতোরির কুক। পরিবারের সন্তানের অনুক্রম হিসেবে পেম্বাকে ডাকা হয় মাইলা (চতুর্থ সন্তান) নামে। জ্যাঠা (বড় সন্তান) আর সাইলা (তৃতীয় সন্তান) কাজ করে সাতোরির কুক হিসেবে।

অভিযাত্রীদের ক্যাম্প

১টা নাগাদ ঊষাদি আমাদের তাঁবুতে চলে এলো। সবাই মিলে গপ্পো করাই উদ্দেশ্য। ততক্ষণে ফুর্বা দাই তুষার গলিয়ে পানি করে এনেছে। সঙ্গে কফির স্যাশে। পানি আর কফি খেয়েও তৃষ্ণা না মেটায় হাত বাড়ালাম কোকের পানে। ২৫০ মিলিলিটারের কোক ২টায় খাওয়া শুরু করে শেষ করলাম পাঁচটা নাগাদ। হিসাবটা করেছে ঊষাদি। এর মধ্যে বেড়েছে হাওয়ার তাবড়। একবার তাঁবু থেকে বেরিয়ে আশপাশে খানিক হাঁটলাম। সাতোরির ইন্ডিয়ান NRI জাফর ভাইকে দেখলাম। ওর সঙ্গে কথা বলতে বলতেই পেছন থেকে ‘ও বাবর আলী’ বলে ডাক! খানিক এগোতেই দেখি চেনা মুখ পেম্বা ছিরিং শেরপা। একসঙ্গে CCKN আর শিবা অভিযানে গিয়েছিলাম। ও কাজ করে সেভেন সামিটের হয়ে। থাকে দার্জিলিংয়ে। বাতাসের দাপট বাড়তেই ফের তাঁবুতে। পাগলাটে হাওয়ার দিকের কোনো ঠিক নেই। বেদিশার মতো চারদিক থেকে তাঁবুর গায়ে তার আঁচড় ফেলছে। উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিম কোনদিক থেকেই খ্যামা নেই। এমন পাগলাটে হাওয়া জীবনে দেখিনি। ক্ষণে ক্ষণে মনে হচ্ছে এই বুঝি তাঁবুসুদ্ধ ওড়ে যাব। ক্যাম্প-১ হাওয়া হয় জানতাম, কিন্তু এমন কিছু দূরতম চিন্তায়ও ছিলাম না।

পৃথিবীর চতুর্থ সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ লোৎসে চূড়ায় বাবর আলী

ফুর্বা দাইয়ের গলানো পানিতে কর্ন ফ্লেক্স চুবিয়ে ছয়টা নাগাদ ডিনার। এখানে যেহেতু আমরা শুধু এক রাতই থাকব, তাই শুকনো ধরনের খাবারই আছে খালি। প্রিঙ্গলস চিবোতে চিবোতে শুয়ে পড়লাম হাভিয়ের আর আমি। সঙ্গী হলো হাভিয়েরের প্রিয় স্প্যানিশ পাংক মিউজিক।


তীব্র তুষারঝড়ে আড়াইঘণ্টা

চোখে-মুখে বাতাস আর তুষারের যুগপৎ ঝাপটা। পোলারাইজড চশমার কালো কাচ গুঁড়ো গুঁড়ো তুষারে শুভ্র হয়ে উঠছে। চশমার সুক্ষ্ম ফাঁকফোকর দিয়ে আঘাত হানতে চাইছে চোখ দুটোতে। আমাদের অবস্থান এভারেস্টের ব্যালকনির কিছুটা ওপরে। নেপাল স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ২০ মিনিটে পৃথিবীর সর্বোচ্চ স্থান ছুঁয়ে নামতে শুরু করেছি অনেকক্ষণ হলো। এক ভারতীয় ক্লাইম্বারের অসাড় আঙুলে র‍্যাপেল (দড়ির সাহায্যে নিচে নামা) করতে অসুবিধা হচ্ছিল দেখে ওনাকে সাহায্য করতে দাঁড়িয়েছিলাম। গণ্যমান্য না হই, মানুষ হিসেবে একেবারে নগণ্যও তো নই। কাউকে বিপদে পড়তে দেখলে দাঁড়িয়ে পড়ি; পার্বত্য ভ্রাতৃত্বের টানেই। এরপরই শুরু এই তাণ্ডব। ক্ষণে ক্ষণে তীব্রতায় বাড়ছে এই তুষারঝড়। তাড়াতাড়ি কোনো আড়াল খুঁজে নিতে জানান দিচ্ছে মস্তিষ্ক। কিন্তু এই গিরিশিরায় আশ্রয় নেওয়ার মতো তেমন পাথরের আড়াল কই!



ব্যালকনির ওপর একটা উন্মুক্ত গিরিশিরাতে আমাদের অবস্থান। পর্বতে তুষারঝড়ের মুখোমুখি হওয়ার জন্য সবচেয়ে নাজুক অবস্থানে আছি আমরা। বারবার মনে হচ্ছিল এই বুঝি আমাদের অবাঞ্ছিত বস্তু মনে করে পাহাড়ের গা থেকে উপড়ে ফেলবে হিমালয়ের বাতাস। প্রকৃতির এই রুদ্ররোষের কাছে নিজেদের অসহায় আত্মসমর্পণ করে বসে আছি। ঘাড় গুঁজে মৌনীবাবার মতো এই ঝড় থামার জন্য অপেক্ষা ছাড়া উপায় নেই। বাতাসের তীব্রতা বাড়ে, হাওয়ায় উড়ে আসা তুষারকণাও সংখ্যায় পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে। আর মনের কোণে স্তূপাকৃতি হতে থাকে শঙ্কা। অক্ষত অবস্থায় ফিরতে পারব তো? আরোহণের সময় দেখা ব্যালকনির ঠিক পাশেই বসে থাকা মঙ্গোলিয়ানের পরিণতি বরণ করতে হবে না তো? শক্তি-সামর্থ্য কোনো অংশেই কম ছিল না ওই মঙ্গোলিয়ানের। কিন্তু প্রতিকূল প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধে যাবে এমন সাধ্য কার! মাত্র চার দিন আগেই এই পাতলা বাতাসের রাজ্যে তার শেষ তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলেছেন উনি। নাকি তুষারক্ষতে হাত-পায়ের ডগা হারিয়ে বসতে হবে? বীরে পাশে বসে সেই আশঙ্কাই করছিল।


আর কিছুক্ষণ এই ঝড় চলতে থাকলে সঙ্গে থাকা অতি উচ্চতার উপযোগী সরঞ্জামগুলোর উপযোগিতাও হুমকির মুখে পড়বে। হাতের আঙুলগুলো খানিকটা অসাড় হতে শুরু করেছে। পর্বতে চলতে থাকলে হৃৎপিণ্ড থেকে সবচেয়ে দূরে অবস্থিত হাত আর পায়ের ডগাগুলোও থাকে সচল অবস্থায়। নিশ্চল হয়ে বসে পড়লেই মুশকিল এই পাতলা বাতাসের রাজত্বে। অবশেষে দীর্ঘ আড়াই ঘণ্টা পর অকস্মাৎ থামল এই তুষারঝড়। আমরাও বাঁচলাম হাঁফ ছেড়ে। ব্যালকনি থেকে পরের শীর্ষারোহণ শিবিরের পরের পথটুকু অবশ্য কঠিন পরীক্ষাই নিল। হঠাৎ চলে আসা তুষারঝড়-প্রসূত হাঁটু অবধি তুষারকাদা মাড়িয়ে এবার এগিয়ে চলে ক্যাম্পের নিরাপদ আশ্রয়ে। মাথাটা গোঁজা আর গলায় উপুড় করার মতো পানি- এই দুটো জিনিসই শুধু ভাসছে চোখে। পর্বতে তো আর কিছু চাওয়া নেই। ‘মিনিমালিস্ট’ হওয়ার শিক্ষা প্রতিবার পর্বত থেকেই যে নিয়ে যাই আমি।

ছবি : বাবর আলীর সৌজন্যে

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০১৭১২০৩৩৭১৫ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা